‘‘কেন শ্রীলংকা নেপালে বিপ্লবীরা পারলো বাংলাদেশে জেএনজিরা পারলো না। ’’
মূল প্রশ্ন: বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র জনতা নিজেদেরকে রাজনৈতিক দল গঠন করে নির্বাচনের মাঠে প্রমাণ করে ভাল ফলাফল লাভ করতে পারেনি। তারা ৩০ আসনে প্রার্থী দিয়ে ৬টিতে জিতেছে মানে ২০%। অন্যদিকে নেপালেও একটি অভ্যুত্থানে সরকারের পতন হলে পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে তরুন তুর্কীরা। কেন নেপালে নতুন প্রজন্ম সফল হলো বাংলাদেশে হলো না। শ্রীলংকাতেও নতুন প্রজন্ম নেতৃত্বে এসেছে।
শ্রীলংকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক বিন্যাস ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামো:
শ্রীলংকায় ১৫২ বছর ব্রিটিশ শাষন থাকলেও। শ্রীলঙ্কায় ধীরে ধীরে সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনা হয়। ১৯৩১ সালে ‘ডনমোর কমিশন’ এর সুপারিশে শ্রীলঙ্কায় সর্বজনীন ভোটাধিকার চালু করা হয়, যা এশিয়ার মধ্যে ছিল অন্যতম প্রথম। বাংলাদেশের মতো সেখানে বিপ্লব দমনের কৌশল, কিংবা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা দ্বিজাতি তত্বের মতো বিষয়গুলো ছিলনা যা মানুষের মননকে প্রভাবিত করে নানা বিভক্তি ও বিভ্রান্তি তৈরী করে।
নেপালের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক বিন্যাস ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামো:
নেপাল সরাসরি কখনোই ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল না। দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ হলেও নেপাল তার স্বাধীনতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। তবে ব্রিটিশদের সাথে তাদের একটি বিশেষ ও জটিল রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল। নেপাল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন দেশ থাকলেও ১৮১৪-১৮১৬ সালের অ্যাংলো-নেপালি যুদ্ধের পর স্বাক্ষরিত সুগৌলি চুক্তির মাধ্যমে নেপালের ওপর ব্রিটিশ প্রভাব তৈরি হয়। এই চুক্তির ফলে:নেপাল তার এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড ব্রিটিশদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় (যা বর্তমানে ভারতের সিকিম, কুমায়ুন এবং গাড়ওয়াল অঞ্চল)। কাঠমান্ডুতে একজন ব্রিটিশ প্রতিনিধি (Resident) নিয়োগ করা হয়। নেপালের পররাষ্ট্রনীতিতে ব্রিটিশদের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো নেপালের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো ব্রিটিশদের তৈরী করা নয় বা আইনগুলো তৈরীতে মানুষের অধিকার হরণ বা ব্রিটিশদের অসীম ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি।
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক বিন্যাস ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামো:
মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের মানুষের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে উঠে ১৭৫৭ সালে স্বাধীনতাহরণ ও তার পরবর্তী ১৭৭০ সালের দূর্ভিক্ষের পরে। একশ বছর লড়াইয়ের পর ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ সরকার যখন ভারতীয় উপমহাদেশকে গ্রহণ করে তখন তারা আইন ও প্রশাসনকে এমনভাবে সাজায় যাতে এখানে যত বিপ্লব বিদ্রোহ হোক আসল ক্ষমতা আমলাদের হাতে থাকে কারণ তারা ব্রিটিশ রাজের প্রতিনিধি। ফলে তারা বিভিন্ন আইন কানুন সেভাবে প্রণয়ন করে। যাতে কোনো জবাবদিহিতা রাখা হয়নি। আর অবাক করা ব্যাপার হলেও সত্য যে, সে ১৮৬১ সালের পেনাল কোড এখনো বাংলাদেশের আইনের ভিত্তি। এবং আজ পর্যন্ত সকল আইন তার সাথে সমন্বয় করা। এতে যত প্রাণ দিক ঘুরে ফিরে একই ব্যাপার।
অন্যান্য কারণ
রাজনীতির মেরু
বাংলাদেশে বিগত ১৭ বছর একটি রাজনৈতিক দল এতবেশী খুন, গুম, হত্যা, হামলা, মামলা আর লুট করেছে যে, বাংলাদেশের মানুষের সে দলটি থেকে মুক্তির বিষয়টি প্রাধান্য ছিল। ফলে পুরনো অন্যান্য দলের ভোটব্যাংক তৈরী হয়ে যায়।
নেপালে ব্যাপারটা তার উল্টো। নেপালের মানুষ পুরনো সব রাজনৈতিক দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
মাঠ দখলের রাজনীতি বনাম সমর্থনের হিসাব
বাংলাদেশে রাজনীতি হলো মাঠ দখলের রাজনীতি। এখানে দলগুলোর পাড়া মহল্লা কমিটি থাকে, থাকে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। জনবিরোধী রাজনীতির কারণে ১টি দলের পতন হলেও বাকী দলগুলোর প্রভাবের কাছে নতুন রাজনৈতিক দল ঠিকমতো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি।
নেপালে রাজনীতি জনগনের নিরপ সমর্থনের উপর গঠিত। সেখানে রাজনীতিতে ‘‘চর দখল’’ এর সংষ্কৃতি নেই।
নির্বাচনের আগে সরকারের অংশ ও বিতর্ক
নেপালের বিপ্লবী তরুনরা অন্তবর্তী সরকারে না এসে। তারা নির্বাচনের জন্য মাঠ প্রস্তুত করেছে। বাংলাদেশে অভ্যুত্থানকারীরা প্রথমত অন্তবর্তী সরকারে এসে বিতর্কিত হয়। তাদের প্রতিপক্ষ ও পতিতদের পোষা মিডিয়া সারাক্ষণ তাদেরকে বিতর্কিত করার চেষ্টায় রত ছিল। এছাড়া বাংলাদেশে তরুনদের মধ্যে নানা বিভক্তি থাকলেও নেপালে বিপ্লবীদের মধ্যে ঐক্য ছিল এবং একক একজন যোগ্য নেতাও তারা পেয়েছে। যেটা বাংলাদেশের তরুনদের মধ্যে ছিল না।
জোট নেতৃত্ব
নেপালে যে জোট গঠিত হয়েছিল তার নেতৃত্বে ছিল তরুন আন্দোলন সফলকারীরা আর বাংলাদেশে তরুনরা অন্য একটি দলের নেতৃত্বে জোট গঠন করেছিল।
অন্যদের জন্য দরজা
নেপালে তরুনদের নতুন দল ও জোটে অন্য রাজনৈতিক দলের নবীন প্রবীন নেতারা যোগদান করেছে। যেমন—-। অন্যদিকে বাংলাদেশের তরুনদের যে দল, তাদের কাছে শত শত গ্রহণযোগ্য ও ইমেজসম্পন্ন এমনকি পরামর্শ দিয়ে তাদেরকে উন্নত স্তরে নিয়ে যেতে পারতো এমন লোক যারা গিয়েছিল। তাদেরকে তারা ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। তাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের তারা জেলা কমিটিতে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়ে নিরুৎসাহিত করেছিল। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠাতারা পদগুলো আঁকড়ে রেখেছিল। তাদের ভয়ছিল এসব লোক তাদের কাছ থেকে দল ছিনিয়ে নিবে বা তাদেরকে অপাংতেয় করে ফেলবে। ফলাফল তারা দল হিসেবে ছোট ও দূর্বল হয়ে পড়েছে।
দলীয় কাঠামো
সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তরুনরা নতুন দল গঠন করলেও এবং তাদের আদর্শ, উদ্দেশ্য ও উপস্থাপনা ইতিবাচক হলেও তাদের দলীয় কাঠামো বাংলাদেশের অন্যান্য ও পুরনো দলগুলোর মতোই। এখানে কমিটি ভোটের মাধ্যমে হয়না। বরং নেতাদের সিলেকশানের মাধ্যমে হয়। ফলে তরুনরা তাদের ডাকে আন্দোলনে সাড়া দিলেও ভোটে সাড়া দেয়নি। কারণ বাংলাদেশের মানুষ এটা আশা করেনি। তারা নতুন কিছু চেয়েছিল। কিন্তু নতুন কিছু না পাওয়াতে একদিকে তরুনদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অন্যদিকে জনগনও কিছুটা মুখ ফিরিয়ে পুরাতন দলের দিকে গেছে। কারণ নতুন পুরাতন যদি একই কাঠামো হয় তাহলে পুরাতনদের অন্তত অভিজ্ঞতা থাকবে। হয়তো ভোটাররা এমনটা ভেবেছিল।
পেশীশক্তি ও অর্থভক্তির রাজনীতি
বাংলাদেশের রাজনীতি হলো পেশীশক্তি আর অর্থের রাজনীতি। কাগজে কলমে একজন এমপির খরচ ২৫ লাখ টাকা হলেও বাস্তবে এখানে একেকটি আসনে শতকোটি টাকা খরচ হয়। যা তরুন ও ছোটদলের পক্ষে সম্ভব হয় না তখন তারা পিছিয়ে পড়ে। এই কারণে শুধু ছাত্রদের দল নয়। ছোটখাটো আদর্শিক দলগুলোও কখনো ভাল ফল করতে পারে না। অধিকন্তু সেসব টাকার কুমিরেরা বুর্জোয়া দলগুলোর পেছনে পয়সা ঢালে তারাও মাঠে নানাভাবে সক্রিয় থাকে।
এসব কারণে বাংলাদেশ ও নেপালের রাজনীতি, প্রেক্ষাপট ও ফলাফল আলাদা হয়েছে।
তবে সমালোচকেরা বাংলাদেশের নির্বাচন পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালে নির্বাচনে ভোটগ্রহণ সুস্থ্য ও শান্তিপূর্ণ হলেও ফলাফল নিয়ে বির্তক রয়েছে। হাজার হাজার ফলাফল শীটে নানারকম ত্রুটি, ভুল, অসঙ্গতি সামাজিক মাধ্যমে ছবিসহ প্রকাশিত হয়েছে। যদিও আমরা তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই যে, নির্বাচনের ফলাফলে কোনো কারচুপি হয়েছে তবুও এটা মানতে হবে জয়ীরা এগিয়ে ছিল বলে জয় পেয়েছে। তা না হলে কোনোভাবে জয় পাওয়া সম্ভব হতো না।
অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশ বাহ্যিকভাবে ভোট ও নির্বাচন যাই হোকনা কেন, মূল ক্ষমতা হলো আমলাদের হাতে তাই যেকোনো পরিবর্তন তারা প্রতিহত করতে কাজ করে।
আবার কেউ মনে করেন এই অশুভ শক্তির সাথে রয়েছে ভারতীয় যোগসাজেশ। ভারতের নীতি নির্ধারকেরা মনে করে বাংলাদেশ উন্নত হলে তাদের বিভিন্ন রাজ্যে স্বাধীনতা সংগ্রাম মাথাছাড়া দিয়ে উঠবে। তাই তারা বাংলাদেশকে অবদমিত রাখতে নানা তৎপরতা চালু রাখে।
এখন দেখার বিষয় হলো ভবিষ্যতে রাজনীতি কোন পথে যায়? আর বিগত দিন থেকে তরুনরা কি শিক্ষা গ্রহণ করে?
– জাহাঙ্গীর আলম শোভন

