মানুষ কেন বুড়িয়ে যায়: বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা ও রহস্য
মানুষ বুড়িয়ে যায়—এ কথা যেমন সত্যি, তেমনি একেবারে সরলভাবে বলা যায় না। বয়স বাড়লে বার্ধক্য আসবেই, এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু সবার ক্ষেত্রে বার্ধক্য সমানভাবে ধরা দেয় না। কারো ষাট বছর বয়সেও তাকে তরুণ মনে হয়, আবার কারো চল্লিশেই বুড়িয়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যায়। এ কারণেই বিজ্ঞানীরা বলেন, বয়সের পাশাপাশি আসল বিষয় হলো বায়োলজিক্যাল এজ বা জৈব বয়স।
ধীরে ধীরে আসে বার্ধক্য
বার্ধক্য কখনো হঠাৎ নেমে আসে না। এটি ধীরে ধীরে শরীরে বাসা বাঁধে। আমাদের শরীরের টিস্যু বা কলা সারাজীবন ধরে গড়ে ওঠে এবং নষ্ট হয়। যৌবনে ক্ষতি পূরণ হয়ে যায় সহজেই, কিন্তু বয়স বাড়লে সেই ঘাটতি আর পূরণ হয় না। ফলে ধীরে ধীরে দেহ দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে টিস্যুর ক্ষয় সমানভাবে ঘটে না, আর সেটিকে নিয়ন্ত্রণও করা সম্ভব।
পরীক্ষায় টিস্যুর দীর্ঘায়ু
২০শ শতকের শুরুর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রকফেলার ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ক্যারেল এক চমকপ্রদ পরীক্ষা চালান। তিনি মুরগির ভ্রূণের হৃৎপিণ্ডের টিস্যুকে জীবাণুমুক্ত পুষ্টিকর দ্রবণে রেখে নিয়মিত খাবার সরবরাহ করেন এবং অপ্রয়োজনীয় অংশ অপসারণ করেন। আশ্চর্যজনকভাবে টিস্যুটি বেঁচেছিল দীর্ঘ ৩৪ বছর, যেখানে একটি মুরগির আয়ু সর্বোচ্চ ১২ থেকে ১৩ বছর। এই পরীক্ষার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা বার্ধক্যের সংজ্ঞা দেন: “বার্ধক্য হলো জীবদেহের পুনরুজ্জীবনের অক্ষমতা।”
শরীরে ঘটে রাসায়নিক পরিবর্তন
বার্ধক্যের সঙ্গে সঙ্গে দেহের জৈববস্তু কমে আসে। ইন্দ্রিয়শক্তি দুর্বল হতে থাকে, টিস্যু শুকিয়ে আসে। তবে সবক্ষেত্রে কার্যক্ষমতা একসাথে হ্রাস পায় না। যেমন, বৃদ্ধ মানুষের চোখ দুর্বল হলেও চোখের যন্ত্রাংশ অক্ষত থাকে। এ কারণে বৃদ্ধ মানুষের চোখ তরুণের শরীরে প্রতিস্থাপন করলে তা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্রে বার্ধক্যে তেমন পরিবর্তন হয় না, তবে এনজাইমের কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করে। ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ থেকেই এনজাইম তৈরি হয়, কিন্তু বার্ধক্যে কেন তা দুর্বল হয়ে যায়—এ রহস্য এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে অমীমাংসিত। ধারণা করা হয়, বয়স বাড়লে শরীরে ক্যালসিয়াম, আয়রন, প্রোটিন এবং ভিটামিন এ ও বি কমে যায়। তাই বার্ধক্যে সুষম আহার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
বার্ধক্য ঠেকাতে গবেষণা
আজকাল বার্ধক্য ঠেকাতে অ্যান্টি-এজিং ওষুধ নিয়ে গবেষণা চলছে। মানুষের শরীরে স্বাভাবিকভাবে থাকা এক হরমোন ডিহাইড্রোপিয়ান্ডোস্টেরোন (DHEA) আয়ু বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন। তবে এটি কিভাবে কাজ করে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
মস্তিষ্ক ও বার্ধক্য
বয়স বাড়লে অনেক সময় মস্তিষ্কে এনজাইম জমে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়। আবার কারো ক্ষেত্রে সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম ভাইরাস আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বৃদ্ধ মানুষের মস্তিষ্কে অ্যালুমিনিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকে, যা প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থির বিকৃতি ঘটায়।
বিজ্ঞানীদের আশা, যদি বার্ধক্যের রাসায়নিক কারণগুলো পুরোপুরি বোঝা যায়, তবে একদিন হয়তো বার্ধক্যকে ঠেকানো সম্ভব হবে। সেই দিন হয়তো আর বেশি দূরে নয়।
নখ কাটার দিনক্ষণ: কুসংস্কার নাকি পরিচ্ছন্নতা?

