স্বাধীনতা

লক্ষ্মীপুর জেলার খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাগণ

লক্ষ্মীপুর জেলার খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাগণ

খসড়া

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন নোয়াখালী জেলার অংশ (বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলা) একটি সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল। জেলার মুক্তিকামী মানুষ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং মুক্তিবাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে। লক্ষ্মীপুরের অবস্থান ছিল মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর নং ২ (মেজর খালেদ মোশাররফ ও পরে মেজর এটিএম হায়দারের অধীন) এবং সেক্টর নং ৩ (মেজর কে এম শফিউল্লাহ্-এর অধীন) এর সংযোগস্থলে।

মেঘনা নদী ও ডাকাতিয়া নদীর তীরবর্তী এই অঞ্চল নৌপথে যোগাযোগের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মার্চ-এপ্রিল ১৯৭১, স্থানীয় ছাত্র-যুবক, পুলিশ ও ইপিআর সদস্যরা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেক্টরভিত্তিক যুদ্ধ: স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা নোয়াখালী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম সেক্টরের বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নেয়। গেরিলা আক্রমণ, সেতু উড়িয়ে দেওয়া ও শত্রুর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা ছিল মূল কৌশল।

সম্মুখযুদ্ধ:  রায়পুর, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর সদরসহ বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সম্মুখ সংঘর্ষ হয়। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ: জেলার মানুষ খাবার, আশ্রয় ও তথ্য সরবরাহ করে মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করে। অনেক পরিবার শরণার্থী হিসেবে ভারতেও যায়।

এই অঞ্চল থেকে ৩ জন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা (১ জন বীর উত্তম ও ২ জন বীর বিক্রম) এবং হাজারো অগণিত  মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ তাদের জীবন উৎসর্গ করেন।

ডিসেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণের সময় লক্ষ্মীপুরের মুক্তিযোদ্ধারা স্থানীয় অভিযানে অংশ নিয়ে জেলাকে শত্রুমুক্ত করতে ভূমিকা রাখে। জেলার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ, গণকবর ও জাদুঘর রয়েছে, যা সেই সময়ের ত্যাগ ও বীরত্বের সাক্ষ্য দেয়।

 খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা হলেন:

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অতুলনীয় বীরত্ব, সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ এবং সাহসিকতার স্বীকৃতি স্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চারটি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদান করে। ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর এই খেতাবগুলো গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। এই চারটি খেতাব মর্যাদা অনুসারে ক্রমান্বয়ে হলো: ক্রম খেতাবের নাম মোট সংখ্যা (সর্বশেষ গেজেট অনুযায়ী) মর্যাদার স্তর ১ বীরশ্রেষ্ঠ (Bir Sreshtho) ৭ জন সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব ২ বীর উত্তম (Bir Uttom) ৬৭ জন ২য় সর্বোচ্চ খেতাব ৩ বীর বিক্রম (Bir Bikrom) ১৭৪ জন ৩য় সর্বোচ্চ খেতাব ৪ বীর প্রতীক (Bir Protik) ৪২৪ জন ৪র্থ সর্বোচ্চ খেতাব মোট খেতাবপ্রাপ্ত ৬৭২ জন।

লক্ষ্মীপুর জেলার খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেওয়া হলো। বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম এবং বীর প্রতীক—এই চারটি খেতাবে লক্ষ্মীপুর জেলার যে বীর মুক্তিযোদ্ধারা ভূষিত হয়েছেন, তাঁদের সংখ্যা ও পরিচিতি তালিকা আকারে প্রকাশ করা হলো।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুর জেলায় মোট ৪ জন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন:

  • বীর বিক্রম: ১ জন

  • বীর প্রতীক: ৩ জন

  • বীর উত্তম ও বীরশ্রেষ্ঠ: এই দুটি খেতাবে লক্ষ্মীপুর জেলার কোনো মুক্তিযোদ্ধা নেই।


️ লক্ষ্মীপুর জেলার খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা

খেতাবের নাম সংখ্যা নাম সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
বীর বিক্রম ১ জন এম. এ. আউয়াল তিনি ছিলেন একজন বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধে তিনি ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করেন এবং সাহসিকতার জন্য ‘বীর বিক্রম’ খেতাব লাভ করেন।
বীর প্রতীক ৩ জন ১. মো. শাহজাহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের জন্য সরকার তাঁকে এই খেতাবে ভূষিত করে।
২. মো. মফিজ উল্লাহ মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণের জন্য তিনি ‘বীর প্রতীক’ খেতাব পান।
৩. মো. নুরুন নবী স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ‘বীর প্রতীক’ উপাধি দেওয়া হয়।

বীর বিক্রম মো. ছানাউল্লাহ,  বীর প্রতীক তোফায়েল আহমেদ হলেন লক্ষ্মীপুর জেলার অন্যতম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা।  সংগ্রামের নোটবুক এবং উইকিপিডিয়া অনুসারে, মো. ছানাউল্লাহ এবং তোফায়েল আহমেদ (লক্ষ্মীপুর) লক্ষ্মীপুর জেলার খেতাবপ্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন।  নোয়াখালী জেলার ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের অনলাইন ভাণ্ডার হিসেবে নোয়াখালী পিডিয়া (Noakhali Pedia)  মুক্তিযুদ্ধের খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব পূরণে, বিশেষ করে লক্ষ্মীপুর জেলার খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সংহত ও সংক্ষিপ্ত তালিকা ইন্টারনেটে সহজলভ্য না থাকার যে শূন্যতা ছিল, তা নোয়াখালী পিডিয়া প্রথমবার পূরণ করল।

লক্ষ্মীপুর জেলার মোট খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা: ৩ জন (বীর উত্তম: ১ জন, বীর বিক্রম: ২ জন, বীর প্রতীক: ০ জন) ১.

বীর উত্তম (১ জন)

নাম: মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন আহমেদ (শাহাবুদ্দিন আহমেদ) খেতাব: বীর উত্তম (মরণোত্তর) পদবী: ক্যাপ্টেন (সেক্টর-২ এবং ৩)

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ ১৯৭১ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মেলাঘর (কুমিল্লা) এবং নবীনগরসহ বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। বিশেষত, ১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চ সিলেটের মালিখানা ক্যান্টনমেন্টে বিদ্রোহ করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি নভেম্বর মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার গোয়াল নগর যুদ্ধে শহীদ হন। তার অসামান্য সাহসিকতা ও নেতৃত্বের জন্য তাকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়।

 বীর বিক্রম (২ জন)

১। নাম: মোঃ ফজলুল হক (বীর বিক্রম) খেতাব: বীর বিক্রম পদবী: সুবেদার (সেক্টর-২ এবং ৩)

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: সুবেদার মোঃ ফজলুল হক ১৯৭১ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে মেলাঘর, নবীনগর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য তাকে বীর বিক্রম খেতাব দেওয়া হয়।

২। নাম: সিরাজুল ইসলাম (বীর বিক্রম) খেতাব: বীর বিক্রম পদবী: সিপাহী (গেরিলা যোদ্ধা, সেক্টর-২ এবং ৩) সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: সিপাহী সিরাজুল ইসলাম ১৯৭১ সালে মুক্তিবাহিনীর একজন গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে তৎকালীন নোয়াখালী (বর্তমানে লক্ষ্মীপুর অঞ্চল) এবং কুমিল্লা সেক্টরে অপারেশন পরিচালনা করেন। তিনি শত্রুর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা, সরবরাহ লাইন আক্রমণ এবং গুপ্তচর বৃত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার সক্রিয় ও সাহসী ভূমিকার স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে বীর বিক্রম খেতাব প্রদান করা হয়।

  ৩. বীর বিক্রম মো. ছানাউল্লাহ: লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার গঙ্গাপুর গ্রামের বাসিন্দা।

বীর প্রতীক ৩ জন

 ১. মো. শাহজাহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের জন্য সরকার তাঁকে এই খেতাবে ভূষিত করে।

২. মো. মফিজ উল্লাহ মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণের জন্য তিনি ‘বীর প্রতীক’ খেতাব পান।

৩. মো. নুরুন নবী স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ‘বীর প্রতীক’ উপাধি দেওয়া হয়।

৪. ম. এ. আউয়াল বীর প্রতীক

৫. গোলাম মোস্তফা। বীর বিক্রম

৬. মীর্জা আফতাবুল কাদের বীর ‍উত্তম

৭. এসআইএস নুরুন্নবী খাত বীর উত্তম, রামগঞ্জ

আরো যাদের নাম পেয়েছি বিস্তারিত তথ্য পাইনি বা তারা খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা কিনা নিশ্চিত হতে পারিনি। তারা হলেন-

মোহাম্মদ উল্লাহকে বীর বিক্রম

বীর বিক্রম ১ জন এম. এ. আউয়াল

শহীদ সিপাহী আবু তালেব, বীর উত্তম

শহীদ সিপাহী আবু তালেব, বীর উত্তম: তিনি ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে লক্ষ্মীপুরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য বীরত্ব ও আত্মত্যাগের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply