Probashi

কবে ঘোষণা করা হবে রেমিটেন্স যোদ্ধা দিবস

প্রবাসীর অবদানে স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধাঞ্জলি : একটি দিবসের প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড প্রবাসী বাংলাদেশীরা। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সর্ববৃহৎ উৎস, যা জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ জোগান দেয়। শুধু অর্থনীতি নয়, বৈদেশিক সম্পর্ক থেকে শুরু করে দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নেও তাঁদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অথচ এই ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের’ প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এখনো পূর্ণাঙ্গতা পায়নি। তাঁদের আত্মত্যাগ ও অবদানকে সম্মান জানাতে একটি নির্দিষ্ট দিবস পালন এবং ঢাকায় একটি প্রবাসী সম্মেলন আয়োজনের প্রয়াস সময়ের দাবি।

কেন একটি বিশেষ দিবস প্রয়োজন?

বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ দিবস পালিত হলেও, এটি একটি নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রস্তাব করা হচ্ছে ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা দিবস’—যা হবে আরও অর্থবহ, গভীর আবেগের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং তা হবে একজন প্রবাসীর জীবনগাঁথার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইতোমধ্যে একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধার মৃত্যু নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি বা ডকু-ফিকশন নির্মিত হয়েছে। সেই মর্মান্তিক মৃত্যুর দিনটিকে বেছে নেওয়া যেতে পারে এই দিবস হিসেবে। এতে বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটবে—যেখানে আমরা শুধু রেমিট্যান্সের অঙ্ক নয়, একজন মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও বলিদানকেও শ্রদ্ধা জানাবো। এটি প্রবাসীদের মধ্যে একটি আত্মিক সংযোগ তৈরি করবে এবং দেশবাসীকে মনে করিয়ে দেবে যে, তাঁরা শুধু ‘অর্থ প্রেরক’ নন, বরং দেশের অগ্রযাত্রার সহযোদ্ধা।

ঢাকা প্রবাসী সম্মেলন : একটি মিলনমেলা

দিবসটির মূল অনুষ্ঠান হিসেবে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘প্রবাসী সম্মেলন’ আয়োজন করা যেতে পারে। এই সম্মেলন হবে শুধু অনুষ্ঠান নয়; এটি হবে একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে প্রবাসীরা তাঁদের মতামত, সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা সরাসরি সরকার ও নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরতে পারবেন। সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত সম্ভাব্য প্রবাসী, ফেরত আসা প্রবাসী, নারী প্রবাসী, এবং বিভিন্ন পেশার প্রবাসী অংশগ্রহণ করবেন।

সম্মেলনের এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে:
১. ইনভেস্টমেন্ট প্রমোট: প্রবাসীদের বিনিয়োগে দেশীয় শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন।
২. কনস্যুলার সার্ভিস: পাসপোর্ট, এনআরবি সেবা ও আইনি জটিলতা নিরসনে এক-ছাতের অধীনে সেবা।
৩. ফেরত প্রবাসীদের পুনর্বাসন ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ।

বিশ্বব্যাপী প্রবাসী সেবা মাস

শুধু একটি দিবস নয়, এই উদ্যোগকে মাসব্যাপী কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। দিবসটিকে কেন্দ্র করে পরবর্তী এক মাসকে ‘প্রবাসী সেবা মাস’ ঘোষণা করা যেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো এ সময় বিশেষ সেবা ক্যাম্প পরিচালনা করবে। দূতাবাসগুলোতে সাধারণ পাসপোর্ট, নাগরিকত্ব, নোটারি ও অন্যান্য কনস্যুলার সেবা দ্রুততম সময়ে এবং জটিলতা ছাড়াই প্রদান করা হবে। পাশাপাশি, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, আইনি সহায়তা ও আর্থিক পরামর্শ প্রদানের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

এছাড়া, এই মাসে দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে প্রবাসীদের সন্তানদের জন্য বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি শিক্ষা, দেশের উন্নয়ন প্রকল্পে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা এবং দেশে বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে।

প্রস্তাবিত দিবসের তাৎপর্য

যে দিনটি প্রস্তাব করা হচ্ছে—যেদিন একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা প্রাণ হারিয়েছেন, সেদিনটি বেছে নেওয়ার মাধ্যমে আমরা কেবল একজন ব্যক্তিকেই স্মরণ করছি না; বরং প্রতীকীভাবে সেই সব প্রবাসীকে সম্মান জানাচ্ছি যারা অনিশ্চিত পথে পাড়ি জমিয়ে, দীর্ঘ কর্মঘণ্টায় ক্লান্ত হয়েও দেশের জন্য স্বপ্ন বুনে যান। ডকুমেন্টারি বা ডকু-ফিকশন সেদিনটিকে ইতোমধ্যে জনমানসে তুলে ধরেছে। সেই দিনটিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালন করলে এটি প্রবাসী সম্প্রদায়ের কাছে ‘আমাদের কষ্ট বোঝা যায়’—এই বার্তা পৌঁছে দেবে।

শেষ কথা

প্রবাসীরা দেশের ‘অদৃশ্য স্থপতি’। তাঁদের জীবনবোধ ও অর্থনৈতিক অবদানকে শুধু পরিসংখ্যানের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া এখন জরুরি। রেমিট্যান্স যোদ্ধা দিবস পালন এবং ঢাকা প্রবাসী সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে আমরা তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি তাঁদের অধিকার ও কল্যাণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারবো। সরকারের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষ, বেসরকারি সংস্থা ও মিডিয়ার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই উদ্যোগকে সফল করে তোলা সম্ভব।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply