Politics, Vote
এক ভোটে ইতিহাস

রাজনৈতিক সংগঠন আইন কেন নেই?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগঠন আইন: প্রয়োজনীয়তা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

— জাহাঙ্গীর আলম শোভন

বাংলাদেশে প্রধানত এই ৩ ধরনের অলাভ সংগঠন রয়েছে সামাজিক সংগঠন, বাণিজ্য সংগঠন ও রাজনৈতিক সংগঠন। বাংলাদেশে সামাজিক ও অলাভজনক সংগঠন এর জন্য সামাজিক সংগঠন আইন রয়েছে, বাণিজ্য সংগঠনের জন্য বাণিজ্য সংগঠন আইন রয়েছে।  কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো রাজনৈতিক সংগঠন আইন নেই।

বাংলাদেশে সামাজিক ও বাণিজ্যিক সংগঠনের জন্য যথাক্রমে সামাজিক সংগঠন আইন এবং বাণিজ্য সংগঠন আইন রয়েছে। এসব আইন সংগঠনগুলোর কাঠামো, কার্যক্রম ও দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য কোনো আলাদা আইন নেই। অথচ রাজনৈতিক দল ও সংগঠনই একটি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা, নীতি-নির্ধারণ ও জনগণের ভাগ্য নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক সংগঠন আইন না থাকায় এ খাতে নানা অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও গুণগত মানের সংকট দেখা দিচ্ছে। তাই সময় এসেছে রাজনৈতিক সংগঠন আইন প্রণয়নের বিষয়ে জাতীয় বিতর্ক ও উদ্যোগ শুরু করার।

সামাজিক সংগঠন আইন

বাংলাদেশে “সামাজিক সংগঠন আইন” বলতে মূলত স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থা (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৬১ , সমবায় সমিতি আইন, ২০০১, এবং যুব সংগঠন (নিবন্ধন এবং পরিচালনা) আইন, ২০১৫ বোঝানো হয়। এই আইনগুলো সামাজিক সংগঠনগুলো কীভাবে গঠিত, নিবন্ধিত ও পরিচালিত হবে তার কাঠামো নির্ধারণ করে। সাধারণত, সমাজসেবা অধিদপ্তর (DSS) এই সংস্থাগুলির নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকে। সমিতি আইন, ১৮৬০ এটিও কিছু নির্দিষ্ট ধরনের সংগঠন নিবন্ধনে ব্যবহৃত হয়।

এই আইনগুলো বাংলাদেশের সামাজিক সংগঠনগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। 

বাংলাদেশে সামাজিক সংগঠন আইন মূলত স্বেচ্ছাসেবী ও অলাভজনক সংগঠনগুলোর কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ ও স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য প্রণীত। এই আইনের আওতায় নিবন্ধিত সংগঠনগুলো সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, মানবাধিকার ও সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত থাকে। আইনের মাধ্যমে সংগঠনের গঠনপ্রণালী, সদস্যপদ, আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নির্ধারিত হয়। এর ফলে সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা পায়।

কোম্পানী আইন

কোম্পানী আইন মূলত লাভজনক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির নিবন্ধন, পরিচালনা ও কাঠামো নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রযোজ্য। এর আওতায় একটি কোম্পানি কীভাবে গঠিত হবে, এর পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব, শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার এবং আর্থিক প্রতিবেদন দাখিলের নিয়মাবলী নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশে ১৯৯৪ সালের কোম্পানী আইন এ ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ন্ত্রক আইন হিসেবে কার্যকর। এই আইনের মাধ্যমে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো একটি বৈধ কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়, বিনিয়োগকারীর অধিকার সুরক্ষিত হয় এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।

বাণিজ্য সংগঠন আইন

বাণিজ্য সংগঠন আইন মূলত ব্যবসায়ী ও শিল্প খাতভিত্তিক সংগঠনগুলোর নিবন্ধন, কাঠামো ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি। এই আইনের আওতায় চেম্বার অব কমার্স, ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠন নিবন্ধিত হয়ে থাকে। আইনটি নিশ্চিত করে যে এসব সংগঠন নির্দিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা, বাজার উন্নয়ন, নীতি প্রণয়নে অংশগ্রহণ ও সদস্যদের সেবা প্রদানে সক্রিয় থাকবে। একইসঙ্গে সংগঠনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামো বজায় রাখার বিষয়টি আইন দ্বারা বাধ্যতামূলক করা হয়।

 রাজনৈতিক সংগঠন আইন না থাকার কারণে কি কি সমস্যা হচ্ছে? কি কি সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছে না। রাজনীতিতে মান ও গুন না থাকায় এর ভূমিকা কতটুকু? কেন রাজনৈতিক সংগঠন আইন দরকার। এই আইনের আওতা ও পরিধি কতটা হবে? কি সুবিধা হবে। রাজনীতিতে গুনগত মান ও শৃংখলা আনতে এই আইন কতটা ভূমিকা রাখতে পারে। এই বিষয়ে এই লেখায় পয়েন্ট টু পয়েন্ট আলোচনা করা হলো।

রাজনৈতিক সংগঠন আইন না থাকার কারণে সৃষ্ট সমস্যা

১. অগণতান্ত্রিক দলীয় কাঠামো: রাজনৈতিক দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নেই। সিদ্ধান্ত অনেক সময় একক নেতৃত্বের হাতে থাকে, ফলে গণতন্ত্র চর্চা বাধাগ্রস্ত হয়।
২. অর্থনৈতিক স্বচ্ছতার অভাব: রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয়। এর ফলে অবৈধ অর্থ রাজনীতিতে প্রবেশ করছে।
৩. সদস্যপদ ও কার্যক্রমে অনিয়ম: কাদের সদস্য করা হচ্ছে, কীভাবে নেতৃবাচন হচ্ছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট আইনগত কাঠামো নেই।
৪. সহিংসতা ও সন্ত্রাসীকরণ: রাজনৈতিক সংগঠনগুলো আইনবিহীন অবস্থায় অনেক সময় সহিংস কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, যার জবাবদিহিতা নেই।
৫. জনআস্থার সংকট: জনগণ মনে করে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে কাজ করছে, ফলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানুষের আস্থা কমছে।

কোন কোন সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছে না

  • দলীয় অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ: দলগুলো কোন উৎস থেকে অর্থ পাচ্ছে, সেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

  • দলীয় অভ্যন্তরীণ নির্বাচন: গণতান্ত্রিক কাঠামো না থাকায় অধিকাংশ দল অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের অনুশীলন করে না।

  • দলীয় সহিংসতা দমন: রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর আইন না থাকায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা কঠিন।

  • দলীয় দায়বদ্ধতা: কোনো রাজনৈতিক দল যদি সংবিধানবিরোধী বা নাগরিক অধিকারবিরোধী কার্যক্রমে জড়ায়, তার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।


রাজনীতিতে মান ও গুণ না থাকার ভূমিকা

রাজনীতিতে গুণগত মান না থাকায়—

  • যোগ্য, সৎ ও শিক্ষিত মানুষ রাজনীতিতে আসতে নিরুৎসাহিত হয়।

  • দলগুলো অনেক সময় অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের জায়গা দেয়, যারা রাজনীতিকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে।

  • রাজনীতি সেবা ও নেতৃত্বের জায়গা না হয়ে ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে পড়ে।

কেন রাজনৈতিক সংগঠন আইন দরকার

  • দলীয় কাঠামোতে শৃঙ্খলা আনার জন্য।

  • অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য।

  • রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতান্ত্রিক নীতিমালার আওতায় রাখার জন্য।

  • সহিংসতা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড কমানোর জন্য।

  • জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য।

রাজনৈতিক সংগঠন আইনের আওতা ও পরিধি

রাজনৈতিক সংগঠন আইনে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত—
১. দল গঠন ও নিবন্ধন: কীভাবে একটি দল নিবন্ধিত হবে, তার স্পষ্ট নিয়ম।
২. অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র: নিয়মিত সম্মেলন, নির্বাচন ও সদস্য অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা।
৩. অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা: দলের অর্থায়নের উৎস প্রকাশ ও নিরীক্ষার ব্যবস্থা।
৪. আচরণবিধি: দলীয় কর্মকাণ্ড যেন সংবিধান ও নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন না করে, তার নিশ্চয়তা।
৫. শাস্তিমূলক ধারা: আইন ভঙ্গ করলে দল ও ব্যক্তিকে কী ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
৬. নারী ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব: রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

রাজনৈতিক সংগঠন আইন প্রণীত হলে কী সুবিধা হবে

  • রাজনীতিতে শৃঙ্খলা, গুণগত মান ও স্বচ্ছতা আসবে।

  • অর্থ, পেশিশক্তি ও দুর্বৃত্তায়ন কমবে।

  • সৎ ও যোগ্য মানুষ রাজনীতিতে আগ্রহী হবে।

  • জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণ বাড়বে।

  • গণতন্ত্রের ভিত্তি হবে আরও দৃঢ়।

রাজনীতিতে গুণগত মান ও শৃঙ্খলা আনতে এই আইনের ভূমিকা

রাজনৈতিক সংগঠন আইন কার্যকর হলে—

  • দলগুলোকে বাধ্য হয়ে গণতান্ত্রিক চর্চা করতে হবে।

  • রাজনীতিতে প্রভাবশালী দুর্বৃত্ত ও অযোগ্য নেতৃত্বের জায়গা সংকুচিত হবে।

  • রাজনৈতিক সহিংসতা ও স্বেচ্ছাচারিতা কমে আসবে।

  • যোগ্য নেতৃত্বের বিকাশ ঘটবে, যা জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

 

রাজনৈতিক সংগঠন বিধিমালা

রাজনৈতিক সংগঠন আইনের অধীনে যে রাজনৈতিক সংগঠন বিধিমালা থাকবে, তা মূলত রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম, কাঠামো ও দায়িত্ব নির্ধারণের জন্য নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে। এই বিধিমালার মাধ্যমে প্রতিটি দলকে নিবন্ধন, অভ্যন্তরীণ নির্বাচন, নেতৃত্বের দায়িত্ব, সদস্যপদ এবং অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া দলীয় সহিংসতা, সংবিধানবিরোধী কার্যক্রম বা নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শাস্তিমূলক ধারা থাকবে। বিধিমালা অনুসরণে রাজনীতিতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে এবং রাজনৈতিক দলের জবাবদিহিতা সুদৃঢ় হবে।

এই বিষয়ে আমার আরেকটি লেখা পড়তে পারেন। সেখানে- রাজনৈতিক সংগঠন বিধিমালা খসড়া আকারে উপস্থাপন করেছি।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার মূল শক্তি। কিন্তু রাজনৈতিক সংগঠন আইন না থাকায় এগুলো কাঠামোগতভাবে দুর্বল, জবাবদিহিতাহীন ও অনেক ক্ষেত্রে অগণতান্ত্রিক। তাই একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সংগঠন আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এই আইন শুধু রাজনীতিকে শৃঙ্খলিত করবে না, বরং জাতিকে একটি সুশাসিত, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কারণ একটি জাতির রাজনীতি যেমন হবে, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও তেমন হবে।