মুসলিম উত্তরাধিকার আইন (ফারায়েজ)
মুসলিম পারিবারিক আইন ইসলামী শরিয়াহ ভিত্তিক হওয়ায় এটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস, অনুশাসন ও পারিবারিক মূল্যবোধের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার, ভরণপোষণ ইত্যাদি বিষয়ে শরিয়াহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবনযাপন মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন ব্রিটিশ আমলের আইন “Muslim Personal Law (Shariat) Application Act, 1937” এবং “Muslim Family Laws Ordinance, 1961” অনুসারে পরিচালিত হয়। পারিবারিক আইনের মাধ্যমে নারীর মহর, নাফকা (ভরণপোষণ), তালাকের অধিকার, এবং সন্তানের হেফাজতের মতো বিষয়গুলো নির্ধারিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি নারী অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
১. উত্তরাধিকার বণ্টনের পূর্বশর্ত
মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের আগে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো পরিশোধ করতে হয়:
-
সৎকার ব্যয়
-
দেনা (ঋণ)
-
দেনমোহর (যদি বাকি থাকে)
-
ওসিয়তের অংশ (সর্বোচ্চ মোট সম্পত্তির ১/৩ অংশ)
২. উত্তরাধিকারীদের শ্রেণি
-
আসাবা: পিতৃসূত্রে উত্তরাধিকারীরা।
-
জুল-ফারায়েজ: নির্ধারিত অংশপ্রাপ্ত উত্তরাধিকারীরা।
-
মাওলা: মুক্তিপ্রাপ্ত দাস বা তাদের উত্তরাধিকারীরা।
ক. শেয়ারার (সুনির্দিষ্ট অংশভাগ পায়):
-
পিতা, মাতা
-
স্বামী, স্ত্রী
-
কন্যা
-
দাদা-দাদি (বিশেষ ক্ষেত্রে)
খ. আসাবা (বাকি অংশ পায়):
-
পুত্র
-
ভাই
-
চাচা
-
পিতামহ
-
4-উত্তরাধিকার বণ্টনের মূলনীতি
-
পুরুষ ও নারীর অংশ: পুরুষের অংশ নারীর দ্বিগুণ।
-
অংশ নির্ধারণ: মৃত ব্যক্তির সন্তান, পিতা-মাতা, স্ত্রী/স্বামী ইত্যাদির অংশ নির্ধারিত।
-
একজন পুরুষ মারা গেলে তার স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে থাকলে, সম্পত্তি বণ্টনের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
-
স্ত্রী ১/৮, পিতা ১/৬, ছেলে ও মেয়ে বাকি অংশ ভাগ করে নেবে।
-
5. ভাগ-বণ্টনের সাধারণ নিয়মাবলি
-
পুত্র কন্যা পাবে: ছেলে দ্বিগুণ পায় কন্যার তুলনায়। মানে বোন পাবে ভাইয়ের অর্ধেক। যদি সব সন্তান ছেলে হয় তারা সমান ভাগ পাবে। অবশ্য অন্য দাবীদার থাকলে তাদের
-
স্ত্রী পাবে: সন্তান থাকলে রেখে যাওয়া স্ত্রী পাবে ১/৮ বা মোট সম্পত্তির ৮ ভাগের ১ভাগ। আর সন্তান না থাকলে স্ত্রী পাবে ১/৪ বা মোট সম্পত্তির ৪ ভাগের ১ভাগ।
-
স্বামী পাবে: মৃত স্ত্রীর সম্পত্তিতে স্বামীর অধিকার থাকে। যেমন তাদের সন্তান থাকলে স্বামী পাবে ১/৪ অংশ বা মোট সম্পত্তির ৪ ভাগের ১ভাগ। আর তাদের কোনো সন্তান না থাকলে ১/২ অংশ বা মোট সম্পত্তির অর্কধেক বা ৫০%।
উদাহরণস্বরূপ বণ্টন
উদাহরণ: মৃত ব্যক্তি রেখে গেছেন স্ত্রী, ১ পুত্র, ২ কন্যা, ও মা।
➤ মা: ১/৬
➤ স্ত্রী: ১/৮
➤ বাকি অংশ পুত্র ও কন্যাদের মধ্যে ২:১ অনুপাতে ভাগ হবে।
স্বামী
-
১/২: যদি কোনো সন্তান না থাকে।
-
১/৪: যদি সন্তান থাকে।
স্ত্রী (একাধিক হলেও সমভাবে ভাগ পাবে)
-
১/৪: যদি সন্তান না থাকে।
-
১/৮: যদি সন্তান থাকে।
পিতা
-
১/৬ + বাকি অংশ রেসিডুয়ারী হিসাবে পেতে পারে যদি ছেলে না থাকে।
-
শুধুমাত্র ১/৬: যদি ছেলে থাকে।
দাদা
-
পিতা না থাকলে দাদা পাবে: ১/৬ + রেসিডুয়ারী।
মা
-
১/৩: যদি সন্তান না থাকে এবং ভাইবোন না থাকে।
-
১/৬: যদি সন্তান থাকে বা ভাইবোন থাকে।
পুত্রের কন্যা
-
১/২: একমাত্র হলে, এবং পুত্র/কন্যা না থাকে।
-
২/৩: একাধিক হলে।
আপন বোন / বৈমাত্রেয় বোন
-
১/২: একমাত্র হলে।
-
২/৩: একাধিক হলে।
তবে যদি পুত্র, পুত্রের পুত্র, পিতা বা দাদা থাকে, তাহলে এই অংশ পাবে না।
ভাই / বোন (পৈত্রিক)
-
তারা উত্তরাধিকারী হবে না যদি পিতা, পুত্র, পুত্রের পুত্র ইত্যাদি জীবিত থাকে|
উত্তরাধিকার বণ্টনের বিশেষ পরিস্থিতি
-
বিশেষ পরিস্থিতি: যদি মৃত ব্যক্তির পিতা না থাকেন, তাহলে দাদা উত্তরাধিকারী হবেন।
ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইন অনুসরণ করার সুযোগ দেয়ায় সমাজে অস্থিরতা কম হয় এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো নিজেদের মূল্যবোধ বজায় রেখে জীবন পরিচালনা করতে পারে।বাংলাদেশ ও ভারতের পারিবারিক আদালতগুলো ধর্মীয় আইন অনুযায়ী রায় প্রদান করে। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী বিচার কাজ পরিচালনার জন্য আলাদা পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ও ভারতবর্ষে মুসলিম পারিবারিক আইন একদিকে যেমন ধর্মীয় অধিকার ও বিশ্বাসের ভিত্তি রক্ষা করে, অন্যদিকে এটি নারী অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও আইন সংস্কারের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব বহন করে। তাই এই আইন সমাজে ধর্মীয় সহনশীলতা ও পারিবারিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়।

