মাথার খুলি দিয়ে পিরামিড গড়েছিলেন সম্রাট তৈমুর লঙ
ইতিহাসের পাতায় অনেক সম্রাটের নাম খোদাই হয়ে আছে তাঁদের বীরত্বগাথা কিংবা সাম্রাজ্য বিস্তারের কারণে। তবে এর বাইরে এমন কিছু নামও আছে যাদের কুখ্যাতি এসেছে নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার জন্য। তেমনি একজন ছিলেন মোঙ্গল সম্রাট তৈমুর লঙ (Timur Long, ১৩৩৬–১৪০৫)। তিনি ছিলেন দুর্ধর্ষ সেনাপতি, চেঙ্গিস খানের বংশধর, এবং মধ্য এশিয়ায় এক বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু তাঁর পরিচিতি কেবল সাম্রাজ্য বিস্তারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইতিহাস তাঁকে মনে রাখে রক্তপাত, হত্যাযজ্ঞ ও নৃশংসতার জন্য।
নির্মমতার চরম রূপ
তৈমুর লঙ যে শহর দখল করতেন, সেখানে মৃত্যু নেমে আসত অজস্র মানুষের উপর। তিনি ধ্বংস করে দিতেন পুরো নগরী। নিরপরাধ নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু—কারো প্রতিই কোনো দয়া দেখাতেন না। ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁর হত্যাযজ্ঞের উদ্দেশ্য সব সময় রাজনৈতিক ছিল না; বরং নিষ্ঠুর মানসিকতা প্রকাশ করাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। অনেক সময় আনন্দের জন্যই তিনি অকারণে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করতেন।
এমনকি তাঁর নিষ্ঠুরতা এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে, কথিত আছে—তিনি ঘোড়ায় চড়ে পোলো খেলতেন মানুষের কাটা মাথা দিয়ে। এই নির্মম খেলাই যেন ছিল তাঁর পৈশাচিক মানসিকতার প্রতিচ্ছবি।
নরমুণ্ডের পিরামিড
শুধু হত্যা নয়, তিনি নিহতদের মাথার খুলি জড়ো করে বানাতেন ভয়ঙ্কর “নরমুণ্ডের পিরামিড”। ইতিহাসে অন্তত তিনটি এমন পিরামিডের বর্ণনা পাওয়া যায়।
-
ইস্পাহান (Isfahan): এখানে তিনি প্রায় ৭০,০০০ মাথার খুলি দিয়ে একটি সুউচ্চ পিরামিড গড়েন। পুরো শহরের মানুষকে হত্যা করে এভাবে চিহ্ন রেখে যান তিনি।
-
বাগদাদ: দ্বিতীয় ভয়াবহ পিরামিডটি তৈরি হয় বাগদাদে। এখানে ব্যবহৃত হয় প্রায় ৯০,০০০ মানুষের খুলি।
-
দিল্লী: সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় ১৩৯৮ সালে দিল্লী আক্রমণের সময়। শহর দখলের পর সৈন্যদের দিয়ে পরিচালিত হয় ব্যাপক লুটপাট, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড। ইতিহাস বলে, শুধু দিল্লীতেই তিনি হত্যা করেছিলেন লক্ষাধিক মানুষকে। নিহতদের মাথার খুলি জড়ো করে শহরের উপকণ্ঠে বানানো হয় তিনতলা ভবনের সমান উঁচু এক বিশাল পিরামিড, যেখানে ব্যবহৃত হয়েছিল প্রায় এক লক্ষ খুলি।
নামের পেছনের কাহিনি
তৈমুরের আসল নাম ছিল কেবল “তৈমুর”। শৈশবে যুদ্ধে একটি পায়ে তীরবিদ্ধ হয়ে চিরস্থায়ী খোঁড়াভাব তৈরি হয়। সেই থেকেই তিনি পরিচিত হন “তৈমুর লঙ” বা “তৈমুর ল্যাংড়া” নামে।
ইতিহাসের শিহরণ
তৈমুর লঙ শুধু একজন সাম্রাজ্য বিস্তারকারী সম্রাটই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম হত্যাকারীদের একজন। তাঁর তৈরি নরমুণ্ডের পিরামিডগুলো শুধু স্থাপত্যের অদ্ভুত কাহিনি নয়, বরং মানব ইতিহাসে নৃশংসতার এক চরম প্রতীক। আজও এই কাহিনি পড়লে শিহরণ জাগে, কীভাবে এক শাসক রক্তপাত ও মৃত্যুকে নিছক বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

