মাছের উচ্ছিষ্ট থেকে হাজার কোটি টাকার রপ্তানি ব্যবসা!
মাছের উচ্ছিষ্ট রপ্তানির বিষয়টি আমি প্রথম শুনি ২০০৬ কি ৭ সালে। একজন লোকের সাথে পরিচিত হলাম। যিনি বাজার থেকে মাছের ফোকনা বা ফুসফুস বা বেলুন সংগ্রহ করে পরে বিদেশে রপ্তানী করতেন। এটা কি কাজে লাগে জানতে চেয়ে অবাকই হলাম। মাছের ফোকনা দিয়ে এক ধরনের জৈবসূতা তৈরী করা হয়। যাতে মানুষের শরীরের ভেতরে কোনো সেলাই বা অপারেশন করা লাগলে। পরে আর সেলাইটি কেটে সূতা বের করতে হয় না। যদিও বিষয়টি বিস্তারিত আর জানা হয়নি।
অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া মাছের উচ্ছিষ্ট (Fish Waste) আজ ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের একটি রপ্তানি পণ্য। হাঁ ঠিক শুনেছেন মাছের মাথা, চামড়া, পাখনা, নাড়িভুঁড়ি ও আঁশ থেকে উৎপাদিত ফিশ মিল, ফিশ অয়েল, কোলাজেন, চিটোসান ও অন্যান্য মূল্যবান পণ্য বিশ্বজুড়ে ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি করেছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পেরু, চীন ও থাইল্যান্ড থেকে মাছের উচ্ছিষ্টকে যাচ্ছে শিল্পোন্নত দেশ চীন, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে।
একটি সূত্র বলছে, বিশ্বব্যাপী মাছের উচ্ছিষ্ট শিল্পের বাজার পরিসংখ্যান (২০২৪-২৫)
• মোট বাজার মূল্য: ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
• বছরে উৎপাদিত মাছের উচ্ছিষ্ট পরিমাণ: ২০-৩০ মিলিয়ন টন
• প্রধান উৎপাদনকারী দেশ: পেরু, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম
• প্রধান আমদানিকারক দেশ: চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপের দেশসমূহ
মাছের উচ্ছিষ্ট থেকে উৎপাদিত পণ্যের বাজার মূল্য
• ফিশ মিল (Fish Meal): ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৫.৮%)
• ফিশ অয়েল (Fish Oil): ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৬.৩%)
• কোলাজেন ও জেলাটিন: ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৭.২%)
• চিটোসান (Chitosan): ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৮.১%)
• অ্যাকুয়াকালচার ফিড: ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৬.৫%)
২. মাছের উচ্ছিষ্ট থেকে উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি বাজার
(১) ফিশ মিল (Fish Meal) রপ্তানি
• ব্যবহার: মাছ ও পোলট্রি খাদ্য
• প্রধান রপ্তানিকারক দেশ: পেরু, চীন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ
• প্রধান আমদানিকারক দেশ: চীন, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র
• রপ্তানি মূল্য (প্রতি টন): ১২০০-২০০০ মার্কিন ডলার
(২) ফিশ অয়েল (Fish Oil) রপ্তানি
• ব্যবহার: ওষুধ, স্বাস্থ্য পণ্য
• প্রধান রপ্তানিকারক দেশ: নরওয়ে, পেরু, চীন
• প্রধান আমদানিকারক দেশ: ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান
• রপ্তানি মূল্য (প্রতি লিটার): ২০-৮০ মার্কিন ডলার
(৩) কোলাজেন ও জেলাটিন রপ্তানি
• ব্যবহার: প্রসাধনী, ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প
• প্রধান রপ্তানিকারক দেশ: ভারত, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড
• প্রধান আমদানিকারক দেশ: ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান
• রপ্তানি মূল্য (প্রতি কেজি): ১০-২০০ মার্কিন ডলার
(৪) চিটোসান রপ্তানি
• ব্যবহার: কৃষি, ঔষধ ও পানিশোধন শিল্প
• প্রধান রপ্তানিকারক দেশ: চীন, ভারত, থাইল্যান্ড
• প্রধান আমদানিকারক দেশ: যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান
• রপ্তানি মূল্য (প্রতি কেজি): ২০-১০০ মার্কিন ডলার
বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার (২০২৪-২৫)
• বাংলাদেশে বার্ষিক মাছের উচ্ছিষ্ট উৎপাদন: ৬-৮ লাখ টন
• বাংলাদেশের বার্ষিক ফিশ মিল উৎপাদন: ১০,০০০-১৫,০০০ টন
• প্রধান রপ্তানি বাজার: চীন, থাইল্যান্ড, ভারত
• বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি মূল্য (প্রতি টন): ১৩০০-১৭০০ মার্কিন ডলার
(১) কাঁচামাল সংগ্রহ ও প্রসেসিং প্ল্যান্ট
• মাছের বাজার, প্রসেসিং কারখানা ও ট্রলার থেকে মাছের উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ
• উন্নত মানের প্রসেসিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফিশ মিল, ফিশ অয়েল ও অন্যান্য পণ্য তৈরি
(২) আন্তর্জাতিক মানের শংসাপত্র সংগ্রহ
• HACCP (Hazard Analysis and Critical Control Points)
• ISO 22000 (Food Safety Management System)
• GMP (Good Manufacturing Practice)
• EU Health Certificate
(৩) রপ্তানি প্রক্রিয়া ও মার্কেটিং
• আন্তর্জাতিক বায়ার ও ট্রেডিং কোম্পানির সঙ্গে সংযোগ
• Alibaba, TradeIndia, ExportHub, Global Sources প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বায়ার খোঁজা
• রপ্তানি অনুমোদনের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে আবেদন করা
৫. মাছের উচ্ছিষ্ট রপ্তানির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
চ্যালেঞ্জ:
• আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা
• কাঁচামালের প্রাপ্যতা ও মৌসুমী সীমাবদ্ধতা
• পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়াকরণ নিশ্চিত করা
সুযোগ:
• বিশ্বব্যাপী অ্যাকুয়াকালচার ও পশুখাদ্য শিল্পের চাহিদা বৃদ্ধি
• নতুন বাজার যেমন মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় প্রবেশের সুযোগ
• ই-কমার্স ও অনলাইন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি রপ্তানি
তবে শুধু রপ্তানি নয় উচ্ছিষ্ট ভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠা করে ফিড তৈরী ও রপ্তানির মাধ্যমে আরো বেশী লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে। বিশেষ করে ফিসফিড, পাকির খাবার, পোষাপ্রাণীর খাবার এবং বিভিন্ন ধরনের জৈব সার উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশে এখন ফিডের বাজার অনেক বড়। কারণ আমাদের আমিষের চাহিদার বড় একটি অংশ এই মুহুর্তে পূরণ করা হয় বাণিজ্যিক চাষের মাধ্যমে। এসব গরু, মুরগী, হাসের ও মাছের খামারে নানারকম ফিড দরকার হয়।
