ব্যবসায়ের ১০টি সাধারণ ভুল ও তা এড়িয়ে চলার উপায়
আমাদের দেশে পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি সমাজব্যবস্খা কোনোটাই ব্যবসায়িক মানসিকতা তৈরী করে না। ফলে আমরা সহজে ব্যবসার কথা ভাবি না। যখন ভাবি তখন অনেক কিছু বুঝে উঠতে পারি না। আর যখন কিছু বুঝতে পারি তখন নানারকম ভুল করি। আর যখন ভুল করি তখন তার প্রতিকার খুজে পাই না।
আজকে আমরা আপনাদের কাছে এই বিষয়টি তুলে ধরব। তবে আমি যে ব্যবসা বুঝি সেরকম নয়। আমি হয়তো নিজের অভিজ্ঞতা ও লেখাপড়া করে কিছু ভুল খুঁজে বের করেছি। হয়তো আমার এমন ভুল আছে। যেগুলো আমি জানি না। এই বিষয়ে লেখাটি লিখেছে- জাহাঙ্গীর আলম শোভন
ব্যবসা মানেই ঝুঁকি, কিন্তু সেই ঝুঁকি যদি অজ্ঞতা, অবহেলা বা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে হয়, তবে সেটি সহজেই এড়ানো যেত। ব্যবসায়ীরা বিশেষত যারা নতুন উদ্যোক্তা, তারা অনেক সময় কিছু সাধারণ কিন্তু মারাত্মক ভুল করে বসেন, যার ফলে সম্ভাবনাময় উদ্যোগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এই লেখায় তুলে ধরা হলো ব্যবসার এমন ১০টি প্রচলিত ভুল এবং সেইসঙ্গে কিছু কার্যকর পরামর্শ যা আপনাকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে।
১. পর্যাপ্ত গবেষণা বা তথ্য ছাড়া ব্যবসা শুরু করা
অনেকেই ভাবেন একটি ভালো আইডিয়া মানেই সফল ব্যবসা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি ভালো আইডিয়াকেও বাজারের প্রেক্ষাপটে বিচার করতে হয়। বাজারে চাহিদা, প্রতিযোগিতা, টার্গেট গ্রাহক, মূলধন ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে গবেষণা না করে ব্যবসা শুরু করলে ব্যর্থতার সম্ভাবনা থাকে বেশি। একজন স্বপ্নবাজ তরুন হয়তো অনেক নতুন আইডিয়া নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু সেটা আসলে গ্রাহকের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে অথবা কিভাবে সেটা বাজারে চালানো যাবে সেটাও জানা থাকা দরকার।
প্রতিকার: ব্যবসা শুরুর আগে বাজার বিশ্লেষণ করতে হবে।SWOT বিশ্লেষণ ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো জানা থাকতে হবে। এছাড়া সম্ভাব্য গ্রাহকদের অভিমত নিতে হবে। পরীক্ষামূলক করার থাকলে আগে পরীক্ষামূলক ব্যবসা করা যেতে পারে।
২. বাজেট ও খরচে নিয়ন্ত্রণ না রাখা
অনেক নতুন উদ্যোক্তা অফিস সাজানো, দামি যন্ত্রপাতি কেনা, লোকবল নিয়োগ ইত্যাদিতে শুরুতেই অতিরিক্ত ব্যয় করেন। এতে কিছুদিন পরই মূলধনের সংকটে পড়েন। এ ধরনের ঘটনা হামেশাই দেখা যায়। তারা শুরুতে বড়ো ও নামকরা কোম্পানীকে ফলো করতে চায়। কিন্তু মনে রাখা উচিৎ তারা কি প্রথমে এভাবে শুরু করেছিল?
প্রতিকার: বাজেট তৈরি করুন এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় খরচে সীমাবদ্ধ থাকুন। ‘Lean Startup’ মডেল অনুসরণ করুন।
৩. অদক্ষ বা ভুল দল গঠন করা
একটি ব্যবসার সাফল্যের পেছনে দক্ষ একটি টিমের অবদান অনস্বীকার্য। ভুল লোককে দায়িত্ব দেওয়া মানে নিজের পায়ে কুড়াল মারা। আমাদের দেশে এটা খুব কমন সমস্যা। দেখাগেল ৩ বন্ধু মিলে ব্যবসা শুরু করল। যেটা বুঝে সেটা ৩ জনই বুঝে। যেটা বুঝে না সেটা কেউ বুঝে না। আবার দেখা গেল আত্মীয় নিয়োগ দিল যে বিষয়টা জানেও না এবং জানার কোনো আগ্রহও নেই।
প্রতিকার: দক্ষতা, সততা ও দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দিয়ে টিম গঠন করুন। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ দিয়ে টিমকে গড়ে তুলুন।
৪. গ্রাহকসেবা উপেক্ষা করা
বিক্রির পরে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়াটা এক ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। অনেক সময় সেবা-পরবর্তী সাড়া না পেলে একজন অসন্তুষ্ট গ্রাহক বহু নতুন গ্রাহককে দূরে সরিয়ে দেয়। কিছু মানুষ থাকে যারা প্রত্যেক পণ্যে প্রতিদিন লাভ করতে চায়। সহজ কথা নগদ লাভ বুঝেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা করার জন্য খুশি ক্রেতা এবং পূনরায় ক্রেতা দরকার সে বিষয়টা তারা উপেক্ষা করেন।
প্রতিকার: গ্রাহকের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে শুনুন, দ্রুত সমাধান দিন এবং বিশ্বাস গড়ুন।
৫. একসাথে অনেক কিছু করতে চাওয়া
সব সেবা বা পণ্য একসাথে চালু করার প্রবণতা অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। এতে ফোকাস হারিয়ে যায় এবং একটাও ঠিকমতো গড়ে তোলা যায় না। এটা খুব কমন সমস্যা। অনেকের এরকম হয়। মানুষের অনেক স্বপ্ন থাকতে পারে। অনেক কিছু করার ইচ্ছাও থাকতে পারে। আবার অনেক আইডিয়া থাকতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে একজন মানুষ অনেক কিছু একসাথে করতে পারে না। আমাদের চোখ দিয়ে আমাদেরকে অনেক কিছু শেখার আছে। আমাদের চোখ ২টা হলেও আমরা একসাথে ২দিকে তাকাতে পারি না। আমাদেরকে যেকোনো ১ দিকে ফোকাস করতে হয়।
প্রতিকার: একটি পণ্যে বা সেবায় ফোকাস করুন। সেটি সফল হলে ধীরে ধীরে পরিসর বাড়ান। যারা একাধিক ব্যবসার মালিক তারা একটা সফল হওয়ার পর অন্যটি নিয়ে কাজ করেছে।
৬. ভুল দামে পণ্য নির্ধারণ করা ও লাভ লোকসান হিসেব করতে না পারা
অনেকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে লাভের নিচে গিয়ে দাম নির্ধারণ করেন, আবার কেউ কেউ অতিরিক্ত লাভের আশায় উচ্চমূল্য নির্ধারণ করেন—যার ফলে দুই ভাবেই গ্রাহক হারান। কেউ যেমন বেশী দামে পণ্য বিক্রি করে ক্রেতা হারান কেউ আবার নিজের উৎপাদিত পণ্যের দাম ঠিক করতে গিয়ে ভুল হিসেবে কম দাম হিসেব করেন। পরে দেখা যায় যে, সিস্টেম লস ও অন্যান্য খরচ ধরা হয়নি। যে দামে বিক্রি হয়েছে সেটা লোকসান হয়ে গেছে।
প্রতিকার: বাজার বিশ্লেষণ করে, কস্টিং ও কাস্টমার ভ্যালু বুঝে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। কখনো কম দামে বিক্রি করলে সেটাও সচেতন ভাবে কত কম? কেন কম? সে কমটা কোথা থেকে ব্যালেন্স হবে? সেটা কি প্রমোশনাল খরচের মধ্যে হিসেব হবে সেটা বিবেচনা করে দাম ঠিক করতে হবে।
৭. ভুল মার্কেটিং কৌশল ব্যবহার করা
মার্কেটিং মানেই বিজ্ঞাপন নয়। গ্রাহকের সঙ্গে সংযোগ, বিশ্বাস গঠন, কনটেন্ট তৈরি—এসব বিষয়েও নজর না দিলে প্রচার কার্যকর হয় না। আমাদের দেশে একজনের দেখে আরেকজন নকল করে। খবরও নেয়না তার কৌশল কি সফল হয়েছে কিনা? আবার একজনের কৌশল যদি সফল হয় তাহলেতো কথাই নেই। সব কৌশল যে সবার ক্ষেত্রে সব সময় কাজ করবে বিষয়টা তেমনও নয়।
প্রতিকার: টার্গেট মার্কেট ঠিক করে সেই অনুযায়ী কনটেন্ট ও ক্যাম্পেইন তৈরি করুন। ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং, ভিডিও মার্কেটিং বা ব্লগের সাহায্য নিন।
৮. ব্যর্থতা থেকে শেখার মানসিকতা না থাকা
ব্যর্থতা আসবেই—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অনেকে ভুল করে ব্যর্থতা মানেই পরাজয় ধরে নেন এবং হাল ছেড়ে দেন। সবচেয়ে ভাল হয় অন্যের ভুল থেকে শেখা আরো ভাল হয় ভুল হওয়ার আগে শেখা। তবে নিজের ভুল থেকে শিখেও মানুষ এগিয়ে যেতে পারে। তবে যারা ভুল থেকেও শেখে না তাদের জন্য আর কোনো উদ্ধারের সূত্র নেই তাদের পতন অনিবার্য।
প্রতিকার: প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুনরায় চেষ্টা করুন। সফল উদ্যোক্তারা বারবার ব্যর্থ হয়েছেন কিন্তু থেমে যাননি।
৯. আইনগত ও নীতিমালার প্রতি উদাসীনতা
বাণিজ্য লাইসেন্স, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন, ট্রেডমার্ক কিংবা ই-কমার্স নীতিমালা অনেকেই গুরুত্ব দেন না। আমাদের দেশে কেনা বেচা আর লাভ এটা ছাড়া আর কিছু বুঝতে চায়না। কিন্তু আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদী এবং পেশাদার ব্যবসায়ী হোন আপনাকে একসাথে না হোক ধাপে ধাপে এগুলোর মধ্যে আসতে হবে।
প্রতিকার: সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স ও অনুমোদন সংগ্রহ করুন। আইনজ্ঞানসম্পন্ন পরামর্শক রাখুন, এবং সরকারি নীতিমালা সম্পর্কে আপডেট থাকুন। নিজে অনলাইন সার্রাচ দিয়ে বেসিক জিনিসগুলো জেনে নিন। কি পড়বেন বুঝতে না পারলে প্রতিদিন সকালে ১ ঘন্টা বা ৩০ মিনিট কোনো বিজনেস বই বা ব্লগ পড়ুন।। দৈনিক ১টা ব্লগ পড়লে ৪০ দিন পর বোঝার চেষ্টা করুন নতুন কিছু শিখেছেন কিনা? ১০০ দিন পর নিজেকে মুল্যায়ন করুন যে, আপনার কতটা অগ্রগতি হয়েছে।
১০। প্রযুক্তির সুফল ভোগ করুন
ডিজিটাল যুগে অনলাইন উপস্থিতির সুযোগ নিন। ই-মাধ্যম ব্যবহার করে ক্রেতার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করুন। প্রযোজ্যক্ষেত্রে পণ্য সেবা ক্রেতার দোরগোড়ায় পৌছে দিন। আজ ব্যবসা চললেও ২ দিন পর ঠিকই হোচট খাবেনঅ
প্রতিকার: আপনি চুপ থাকলেও কেউ না কেউ ঠিকই ডিজিটাল সেবা দিবে। তখন আপনি পিছিয়ে পড়বেন তারচেয়ে আগে থেকে এগিয়ে থাকুন।
ধন্যবাদ

