বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে বিভিন্ন দল ও বিভাজনের সৃষ্টি বহু শতাব্দী ধরে বহুল আলোচনা ও গবেষণার বিষয় হয়ে আছে। এই বিভাজনগুলোর মূল কারণ ছিল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, মনোভাব ও ধর্মীয় নিয়মাবলীর পার্থক্য, পাশাপাশি সমাজ ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা। বৌদ্ধধর্মের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রধান দুটি শাখা হলো থেরবাদ এবং মহায়ান বৌদ্ধধর্ম। এই দুটি প্রধান শাখার মধ্যেও নিজস্ব ভেঙে-বিভাজন রয়েছে, যা তাদের ধ্যানপদ্ধতি, ধর্মতত্ত্বের ব্যাখ্যা এবং আচার-অনুষ্ঠানের তফাৎ থেকে জন্ম নিয়েছে।
বৌদ্ধধর্মের প্রথম বড় বিভক্তি ঘটে বুদ্ধের মৃত্যুর পর তিনটি সিনড্রমিক সমাবেশের সময়। প্রথম সমাবেশের পর নিষেধ পালনের বিষয়ে মতবিরোধের কারণে সঙ্গহী ও মহাসঙ্গহী নামে দুটি বড় গোষ্ঠীতে বিভক্তি হয়। এরপরে, সময়ের স্রোতে ভিন্ন ভিন্ন দার্শনিক ও আচারিক পার্থক্যের কারণে আরও বিভিন্ন সম্প্রদায় ও মঠের সৃষ্টি হয়। থেরবাদ বৌদ্ধধর্ম মূলত বুদ্ধের মূল শিক্ষাকে কঠোরভাবে অনুসরণ করে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ যেমন থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও মায়ানমারে ব্যাপক জনপ্রিয়। অপরদিকে, মহায়ান বৌদ্ধধর্মে নতুন ধর্মীয় দর্শন, ধর্মগ্রন্থ ও বোধিসত্ত্ব ধারণার প্রচলন ঘটে, যা পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যেমন চীন, জাপান, কোরিয়া ও তিব্বতে ব্যাপকভাবে পালিত হয়।
বিভাজনের পেছনে শুধু ধর্মতাত্ত্বিক পার্থক্যই নয়, রাজনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিভিন্ন সময়ে শাসকরা নিজেদের শাসন ও ক্ষমতা বিস্তারের জন্য এক বা একাধিক বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পক্ষে সমর্থন প্রদান করে বিভাজনকে আরও বৃদ্ধি দিয়েছেন। ফলে ধর্মীয় মতবৈচিত্র্যের সাথে রাজনৈতিক বিভাজনও জটিলতা বৃদ্ধি করেছে।
যদিও বৌদ্ধধর্মের মধ্যে কোনও সামরিক সংঘর্ষ ঘটেনি, তথাপি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিরোধ থেকে সামাজিক অবক্ষয়, ধর্মীয় আচার বন্ধ হয়ে যাওয়া, মন্দির ভাঙচুর এবং বিশ্বাসঘাতকতার মতো ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ভারতবর্ষে ইসলামিক বিজয় এবং হিন্দু শাসনসময়ের মধ্যে বৌদ্ধধর্মের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে ধর্মের প্রভাব কমে গিয়েছিল।
তবে নানা বিভাজন ও মতভেদের মধ্যেও বৌদ্ধ ধর্মের মূল শিক্ষা আর আদর্শ আগের মতোই অটুট থেকে গেছে। আধুনিক যুগে এই বিভাজনগুলোকে দূর করে বৌদ্ধ সম্প্রীতির বার্তা বহাল রাখার প্রচেষ্টা চলছে, যা সমগ্র মানবতার জন্য শান্তি এবং সহযোগিতার বাতাবরণ সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন শাখা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রার্থনার মাধ্যমে ধর্মের বোধগম্যতা ও গভীরতা আরও বৃদ্ধি করেছে, যা বিশ্বজনীন মানবজীবনের উন্নতি ও প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ায় সহায়তা করছে।
সার্বিকভাবে, বৌদ্ধধর্মের বিভাগ এবং দলগুলোর জন্ম মূলত তাত্ত্বিক পার্থক্য ও রাজনৈতিক প্রভাবের ফলস্বরূপ হলেও যুগান্তরে ধর্মের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার শক্তিকে কমিয়ে দেয়নি।
এসব বিভাজন ধর্মীয় শৃঙ্খলা ও সামাজিক ঐক্য ক্ষুন্ন করলেও, যুগে যুগে ধর্মের মৌলিক আদর্শ ও শিক্ষা টিকে আছে এবং তা বর্তমান সমাজে সমৃদ্ধি ও শান্তির উৎস হয়ে আছে।

