বাংলাদেশ

বৃহত্তর নোয়াখালীর লোকসাহিত্য

বৃহত্তর নোয়াখালীর লোকজ ধারা
– জাহাঙ্গীর আলম শোভন

নোয়াখালী বাংলাদেশের একটি উপকূলবর্তী জেলা। এ অঞ্চলের ভূমি নতুন পলিমাটিতে গঠিত হলেও এখানকার মানুষের জীবনধারায় সাগরের প্রভাব বহু পুরনো এবং গভীর। এ জেলার সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা গঠনে চারটি বিষয় বড় ভূমিকা রেখেছে—সমুদ্র, মৎস্য আহরণ, কৃষিকাজ এবং ধর্মবিশ্বাস। এই উপাদানগুলো ছাড়া বৃহত্তর নোয়াখালীর জীবন ও সাহিত্য কল্পনাও করা কঠিন।

সাগরপাড়ের মানুষদের স্বভাবগত সাহস এবং দুরন্ত মনোভাব তাদের দূরদেশে পাড়ি জমানোর প্রেরণা জুগিয়েছে। বঙ্গোপসাগরের অনুপ্রেরণায় নোয়াখালীর লোকেরা দূরদেশে পাড়ি জমিয়েছে জীবিকার খোঁজে কিংবা স্রেফ দুঃসাহসী অভিযানে। ঐতিহাসিকরা বলেন, এ অঞ্চলের মানুষরাই বাংলাদেশে প্রথম প্রবাসে যাওয়া শুরু করে। রেঙ্গুন, কলকাতা, দিল্লি, আগ্রা, মুম্বাই, করাচি ছাড়াও তারা পৌঁছে যায় সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড পর্যন্ত। তাদের এই যাত্রার কথা জানা যায় বিভিন্ন পরিবারিক ইতিহাস থেকে। বর্তমানেও বিশ্বের নানা প্রান্তে এই এলাকার মানুষের বিস্তৃতি রয়েছে, কেউ কেউ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন বিদেশে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ব্রিটিশ নৌবাহিনীতে নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের অনেক সৈনিক অংশ নিয়েছিল—এমন প্রমাণ রয়েছে বিভিন্ন প্রামাণ্য নথিতে।

জাতিগতভাবে বৃহত্তর বাঙালি জাতির অংশ হলেও এ অঞ্চলের মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতিতে কিছু স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। নোয়াখালী অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা বাংলা ভাষার একটি বৈচিত্র্যময় রূপ। যদিও এর কিছু মিল চট্টগ্রামের ভাষার সঙ্গে আছে, তথাপি এতে আরাকানি প্রভাব নেই। সিলেটি ভাষার মতো এর মূল বাংলার সঙ্গে দূরত্বও অতটা নয়। চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট ও নোয়াখালীর ভাষায় টান ভিন্ন হলেও তারা একই মূলধারার অন্তর্ভুক্ত। বরিশাল ভৌগোলিকভাবে কাছে হলেও নৌ-ভৌগলিক দূরত্বের কারণে ভাষাগত পার্থক্য রয়েছে। পুরান ঢাকার কথ্য ভাষার তুলনায় নোয়াখালীর ভাষা অনেকটাই স্বতন্ত্র।

এ এলাকার পুরুষেরা মাছধরা ও কৃষিকাজ ছাড়াও বিদেশে যাওয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন দীর্ঘদিন ধরে। অন্যদিকে, নারীসমাজ তুলনামূলকভাবে গৃহকেন্দ্রিক থেকে গেছে ধর্মীয় বা সামাজিক কারণে। মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে পরিবারেরা সচরাচর স্থানীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে, যা আজও আংশিকভাবে প্রচলিত।

নোয়াখালী বলতে সাধারণত আমরা বর্তমান নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরকে বুঝি। তবে এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বলয় আরও বিস্তৃত। যেমন—চট্টগ্রামের মিরসরাই, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম ও লাঙ্গলকোট এলাকাও নোয়াখালী সংস্কৃতির ছায়ায় রয়েছে। এখানকার ভাষা ও লোকাচার এতটাই মিলে যায় যে, অনেকে এসব এলাকাকে “নোকল্যান্ড” নামে ডাকেন। দেশের ভেতরে এই জনগোষ্ঠীকে নিয়ে নানা কৌতুক বা বিদ্রূপ থাকলেও, বাস্তবতা হলো—বিদেশে এবং দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার দক্ষতায় নোয়াখালীবাসীর আলাদা খ্যাতি রয়েছে।

ধর্ম দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলের মানুষের মনোজগত এবং সমাজজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। অতীতে অজ্ঞতাপূর্ণ ধর্মীয় বিশ্বাস থাকলেও পরবর্তীকালে পীর-ফকির-মোল্লাদের মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষার বিস্তার ঘটে। এই শিক্ষাবিস্তারে নোয়াখালীর মানুষ ছিল অগ্রণী। মসজিদ, মাদ্রাসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এই অঞ্চলের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। সুফী দরবেশদের প্রভাবে এখানকার মানুষ ধর্মে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছে, যা চট্টগ্রামের সঙ্গে সাংস্কৃতিক যোগসূত্র তৈরি করেছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক শিক্ষার প্রসারের ফলে অনেকটাই পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে নোয়াখালী অঞ্চলে ধর্মীয় গোড়ামির তুলনায় ধর্মীয় সহনশীলতা এবং মুক্তচিন্তার চর্চা লক্ষ করা যায়। হিন্দু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এখানে বিরল নয়। যদিও অনেক মসজিদ ও মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে, তথাপি উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর তৎপরতা নেই বললেই চলে। তবে জলদস্যুতা ও রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে ফেনী ও লক্ষ্মীপুর কিছুটা নেতিবাচক আলোচনায় এসেছে।

লোকগান, কবিতা, ছড়া ও খেলা এই অঞ্চলের সংস্কৃতির প্রাণ। কৃষকদের ধান রোপনের সময় লম্বা সুরে গাওয়া গান কিংবা পালাগান, গীতিকাব্য ইত্যাদি লোকজ সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে। একসময় ঘরে ঘরে কবিতার আসর, গানের সভা আর পুঁথিপাঠ হতো। এখানে আঞ্চলিক ভাষার পাশাপাশি সাধু ও চলিত বাংলা ভাষার ব্যবহার ছিল। গান গাওয়ার সময় শুদ্ধ ভাষার দিকে ঝোঁক ছিল, কারণ ধর্মীয় গানের ক্ষেত্রে পীর-দরবেশরা সাধারণত আঞ্চলিক শব্দ এড়িয়ে চলতেন।

এই অঞ্চলের গানের ধারা গীতিকা, পালাগান, বিয়ের গান, প্রেম-বিরহগান, গজল ও সুফীসংগীত পর্যন্ত বিস্তৃত। সুফীবাদের ছোঁয়া পাওয়া যায় ভান্ডারী গানে, যা এখানে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কবিতা রচনায় চারণ কবিদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা সমাজের ঘটনাবলি নিয়ে কবিতা লিখে গান আকারে পরিবেশন করতেন গ্রামেগঞ্জে।

বিশেষ কোনো ঘটনা ঘটলে তা নিয়ে কবিতা রচনার চল ছিল। যেমন ক্ষুদিরামের ফাঁসি, কারবালার ঘটনা, আবদুল কাদের জিলানির জীবন, মুনীর চৌধুরীর ফাঁসি কিংবা সালমান শাহর মৃত্যু—সবই কবিতায় এসেছে। কখনো কখনো এসব কবিতা বই বা চটি আকারে বাজারে বিক্রিও হতো। যেমন:

“তোমার মামার হাতের আংটি তোমার হাতে কেন দেখিরে,
পাগল করলো ভাগিনারে
তোমার মামার গায়ের গামছা তোমার হাতে কেন দেখিরে,
পাগল করলো ভাগিনারে।”

এমন প্রেম কাহিনির কবিতা গান আকারে টেপে বাজারজাত হতো।

ছড়ার ক্ষেত্রেও নোয়াখালী সমৃদ্ধ। শিশুদের খেলার ছড়া, ঘুমপাড়ানি গান, ধাঁধা বা ঘটনার ছড়া ছড়িয়ে রয়েছে গ্রামেগঞ্জে। লোকজ খেলার মধ্যে রয়েছে হাডুডু, দড়ি লাফ, বউছি, কানামাছি ইত্যাদি—যা আজও কোনো কোনো জায়গায় টিকে আছে শিশুদের আনন্দের খোরাক হয়ে।

সব মিলিয়ে বৃহত্তর নোয়াখালীর লোকজ সংস্কৃতি তার নিজস্বতায় অনন্য। জীবন ও সাহিত্যের সব শাখায় তাদের অবদান স্বতঃসিদ্ধ। অতীতের সেই চারণভিত্তিক কবিতা কিংবা ধানের মাঠে গাওয়া সুর আজও স্মৃতির পাতায় জীবন্ত হয়ে আছে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply