Psychodrinks

বিতাড়িত নেতা কি আদৌ ফিরবেন?

ফাঁপা’র মনস্তত্ত্ব, প্রতিহিংসা ও রাজনৈতিক সমীকরণ

শেখ হাসিনা রাজনীতিতে আর ফিরবেন কি ফিরবেন না—এ নিয়ে নানামুখী আলোচনা ও বিতর্ক চলছে। তবে আসল প্রশ্ন হলো: তিনি যে নিজের দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কোনো আগাম নির্দেশনা বা বার্তা না দিয়ে হুট করে দেশ ছেড়ে চলে গেলেন, আবার বারবার “আসছি আসছি” করেও আসছেন না—এর পেছনে মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কারণটি কী?

আসুন, কিছু ঐতিহাসিক তথ্য ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই সমীকরণটি মেলাবার চেষ্টা করি।

১. ঐতিহাসিক ক্ষোভ ও শেখ হাসিনার মনস্তত্ত্ব

  • ১৯৭৫ সালের নিরপেক্ষ বাস্তবতা: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর জানাজায় মাত্র ২৫ থেকে ৩৫ জন লোক অংশ নিয়েছিলেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তৎকালীন সাধারণ মানুষ ঘটনাটি একপ্রকার মেনে নিয়েছিল; অনেকে প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া দেখায়নি এবং কেবল হাতেগোনা কিছু মানুষ প্রতিবাদ করেছিল।

  • সংসদ ও দলীয় ক্ষোভ: শেখ হাসিনা পরবর্তী সময়ে একাধিকবার সংসদে ও দলের ভেতর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন—“আমার বাপের জানাজায় আপনারা যাননি, আমি মরে পড়ে থাকলেও কেউ আসবেন না; আপনাদের আমি চিনি।” অর্থাৎ, ১৫ আগস্টের পর নিজ দলের নেতাকর্মীদের নিষ্ক্রিয়তা ও নীরবতার ওপর তাঁর একটা দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক ক্ষোভ সব সময়ই বজায় ছিল।

  • প্রতিশোধ ও পকেটে পুরার নীতি: এই ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে তিনি দুটি রাজনৈতিক কৌশল বেছে নেন।

    • যাদের তিনি প্রয়োজন মনে করেছেন (যেমন: মতিয়া চৌধুরী, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন)—তাদের পকেটে পুরেছেন ও ক্ষমতা ভাগ করেছেন।

    • অন্যদিকে, মূল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অর্থাৎ বিএনপি, জামায়াত এবং তৎকালীন সেনাবাহিনীর একটি অংশের প্রতি বজায় রেখেছেন তীব্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।

২. রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও নেতাকর্মীদের প্রতি আক্রোশ

  • বিএনপির জন্ম ও প্রেক্ষাপট: ১৯৭৫ সালে বিএনপির জন্মই হয়নি। তা সত্ত্বেও জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানের প্রতি তাঁর চরম রাজনৈতিক আক্রোশ পরিলক্ষিত হয়েছে। কারণ হিসেবে দেখা যায়, জিয়া পরিবার শেখ হাসিনার দৃষ্টিতে তৎকালীন বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি নমনীয় ছিল।

  • নিজের দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আক্রোশ: এখন প্রশ্ন ওঠে—যে নেতা বিরোধী দলের প্রতি এতটা আক্রোশ প্রকাশ করতে পারেন, তিনি কি ১৯৭৫ সালের পর নিষ্ক্রিয় থাকা, গা ঢাকা দেওয়া বা সুবিধাভোগী নিজস্ব দলের নেতাকর্মীদের মন থেকে ক্ষমা করতে পেরেছেন?

  • লীগ দিয়ে লীগ দমন: গত ১৬ বছরের দিকে তাকালে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিজ দলের নেতাকর্মী হত্যার ঘটনাগুলোর খুব কমই বিচার হয়েছে। উল্টো দেখা গেছে, মোহাম্মদপুরের যুবলীগ নেতা ইব্রাহিম হত্যার পর অভিযুক্তদের রাজনৈতিকভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এটিও ছিল নিজ দলের সেই ঐতিহাসিক নীরবতার প্রতি এক ধরনের সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক আক্রোশ বা শাস্তি।

৩. ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং রহস্যজনক প্রস্থান

১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর শেখ হাসিনা দলের নেতাকর্মীদের অর্থ উপার্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অপরাধ করার বহু সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যখন ছাত্র-জনতার আন্দোলন তুঙ্গে উঠল এবং ৮০০ থেকে ১৪০০ মানুষ জীবন দিল, তখন ৩ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের তৃণমূলের বিপুল নেতাকর্মী রাজপথ ছেড়ে দেয়।

এখানে দুটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে:

প্রশ্ন ১: চলে যাওয়ার সময়ের আচরণ

তিনি কি পারতেন না গোপনে বা আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের দলের নেতাকর্মীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দিতে? কিংবা ৫ ঘণ্টা পর দেশ ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে কর্মীদের আত্মরক্ষার সুযোগ দিতে? তৎকালীন বিভিন্ন ফোনালাপ ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী—৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার মুহূর্তে বা তার আগে শেখ হাসিনা কিংবা তাঁর পরিবারের সদস্য (যেমন: সজীব ওয়াজেদ জয় বা শেখ রেহানা)—কারো মুখ থেকেই নিজ দলের কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো গভীর উদ্বেগের কথা শোনা যায়নি।

প্রশ্ন ২: ফিরে আসার নামে নতুন ফাঁদ?

বর্তমানে তিনি যেভাবে কর্মী ও সমর্থকদের মাঠে নামার উসকানি দিচ্ছেন বা ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা করছেন, তার পেছনে রাজনৈতিক লক্ষ্য কী? ১৭ বছরের ক্ষোভ এবং জুলাই গণহত্যার পর সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তিনি নিশ্চয়ই অবগত। তাহলে কি নেতাকর্মীদের আবার রাজপথে ঠেলে দিয়ে দুটি উদ্দেশ্য হাসিল করা হচ্ছে?

  1. তৃণমূলের ওপর প্রতিশোধ: ১৯৭৫ সালে চুপ থাকা এবং ২০২৪ সালে রাজপথ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মাশুল হিসেবে কর্মীদের আবার বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া।

  2. লাশ নিয়ে রাজনীতি: নতুন করে সহিংসতা ও লাশের সংখ্যা দেখিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বা রাজনৈতিক ময়দানে ফায়দা লোটার চেষ্টা করা। যেমন—জুলাই গণহত্যার সরকারি ও বেসরকারি হিসাব ঢাকতে পুলিশ মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়ে উপস্থাপনের একটি প্রয়াস দেখা গেছে।

৪. আওয়ামী লীগ কি রাজনৈতিক দল নাকি সন্ত্রাসী সংগঠন?

রাজনৈতিক বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, দু-একটি অপরাধের জন্য পুরো দলকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলা যায় না। কিন্তু যখন কোনো সংগঠনের:

  • শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ বা মদদ দেয়;

  • অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো (যেমন: ছাত্রলীগ ও যুবলীগ) বছরের পর বছর অস্ত্র হাতে সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হয়;

  • এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও আত্মগোপনে থেকে হত্যার হুমকি বা নাশকতার পরিকল্পনা চালায়—

তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, দলটির চরিত্র আসলে কী?

৫. বর্তমান পরিস্থিতি ও আমাদের ভবিষ্যৎ ভাবনা

  • ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো: অতীতে যেভাবে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর পূর্ববর্তী শাসনকালের অপরাধ ঢাকতে নতুন প্রশাসন বা রাজনীতিকে ঘোলাটে করার চেষ্টা করা হতো, এবারও সাইবার জগতে ও মাঠে একই ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

  • জনগণের জাগ্রত অবস্থান: সাধারণ মানুষ পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা, পরপর তিনটি দিনের ভোটহীন নির্বাচন কিংবা ব্যাংক লুটের মতো ঘটনায় অনেক সহ্য করেছে। কিন্তু যখন রাজপথে নির্বিচারে শিশুদের ওপর গুলি চালানো হলো, তখন দল-মত নির্বিশেষে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল।

  • উন্নতি ও সামাজিক পুনর্বাসন:

    • অপরাধীর বিচার: যারা সরাসরি হত্যা, গুম ও ব্যাংক লুটের সাথে জড়িত, তাদের বিচার হতেই হবে। কোনোভাবেই রাজনৈতিক উদাসীনতা দেখানো যাবে না।

    • সাধারণ কর্মীদের পুনর্বাসন: যারা সরাসরি অপরাধে জড়িত নয়, তবে রাজনৈতিক অন্ধত্ব বা বিভ্রান্তিতে ছিল, তাদের ঢালাওভাবে ফাঁদে ফেলে চাঁদাবাজি করা বন্ধ হওয়া উচিত। সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থেই সাধারণ সমর্থকদের মানসিক শোধনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।

উপসংহার

যে বিচারে বিচারক মায়াশূন্য হয়ে কেবল প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে রায় দেন—তা ন্যায়বিচার নয়, বরং প্রতিশোধ। আবার যে বিচারে অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হয়—তা পক্ষপাতিত্ব।

তাই আজকের বাংলাদেশে প্রয়োজন প্রকৃত ন্যায়বিচার। যারা রক্ত ঝরিয়েছে, তাদের আইনের মুখোমুখি করতেই হবে। অন্যদিকে, রাজনীতিকে আবার সংঘাত, সহিংসতা ও সাইকোপ্যাথিক প্রতিহিংসার বৃত্তে ফেরাতে না দেওয়াটাই হবে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আসল সাফল্য।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply