বাংলার লোকজ দর্পণ
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতিসত্ত্বার বিকাশের যে ইতিহাস সেটা ঐতিহাসিক এবং ভৌগলিক দুই কারনেই ভিন্ন। সভ্যতার ইতিহাসের সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে, সম্পর্ক রয়েছে যে ভুখন্ডের সাথে তার সম্পৃক্ততা তার সাথেও এবং সম্পর্ক রয়েছে বিভিন্ন ভূখন্ডে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন মূল বিশ্বাস নিয়ে গড়ে উঠা আজ অবধি টিকে থাকা ও না থাকা ধর্মীয় ধারণাসমূহের সাথে। প্রতিটি বিষয় স্ব স্ব জাতির সত্ত্বার বিকাশ ও বিবর্তনে অবদান রেখেছে।
জাতি সত্ত্বার বিকাশ বলতে আমরা আজ যা বুঝি সে অর্থ সব সময় একটাই ছিল তা কিন্তু নয়। হয়তো আগামীতে এর নতুন সজ্ঞায়নও হতে পারে। যেখানে নীতি নৈতিকতা এবং কখনো কখনো হিতাহিতের ওলটপালট হয়েছে, সেখানে বিকাশ-প্রকাশের অর্থ বদল হতে পারে বৈকি? হাজার বছরের ইতিহাসে আজ যাকে ববর্রতা বলছি একসময় এমন অনেক কিছুই ছিল নিছক বনিকবৃত্তি, যেমন ক্রীতদাস প্রথা। আজ যাকে বলছি অমানবিক তা হয়তো ছিল ধর্মযোজন যেমন বলীপ্রথা, সতিদাহ ইত্যাদি। আজ যাকে বলছি কুসংস্কার তা হয়তো ছিল তীর্থকর্ম, আজ যা বলছি ‘অসভ্য’ তা হয়তো লোকেদের নিত্য লোকাচার কোনো যুগে বা কোনো দেশে। আবার আজ যা বলছি ‘‘তথাস্তু’’, ‘‘মারহাবা’’ কাল হয়তো সেটাকে বলবো ‘‘দূর হটো’’ বা ‘‘ছ্যা ছ্যা’’। তাই সে সত্ত্বাকেন্দ্রীক বিকাশ, আত্মশ্লাঘার বির্নিমাণ এবং আত্মপরিচয়ের যে জাতকীয় পরিচয়ের কথা বলছি সেটা যৎকিঞ্চিৎ বদলে যেতেও পারে।
আজকের মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক আদর্শ, ধর্মাগত চেতনা, আত্মীক আত্মমূল্যায়ন ও মনস্তাত্তিক গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তই আমরা ধরে নিতে পারি মূল্যবোধের মাপকাঠিরুপে। তাই কিছু ইতিবাচক আশা, মনোসামাজিক ঘটনা, সর্বজনীন হিতকর উদ্যোগ এবং মনোজয়ী ও সময়দখলি কিছু নেতৃত্ব এই বিকাশের নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে শত শত বছর ধরে।
তারই আলোকে আমরা বলতে পারি। একটি জাতির যা কিছু দীর্ঘদিনের আচারিত সামাজিকতা, যা কিছু তার একান্ত নিজের সম্পদ, যা কিছু নিজেদের ভেতর থেকে প্রয়োজনে বা স্বআয়োজনে চর্চিত, পর্বিত ও গর্বিত হয়ে আসছে তাই তার শেকড়ের সন্ধান দেবে এক আত্মপরিচয় গাঁথা আমলনামায়।
তাহলে একটি জাতির সে সম্পদ যা তার ভেতর থেকে উৎসারিত, অন্যদের চেয়ে আলাদা যা তার জীবন ও বিশ্বাসের মিথে বীজতলিত তাই তার নিজস্ব সত্ত্বা। এই নিজস্ব সত্ত্বাকে ধারণ করা তাকে বহিসঙ্করায়নের হাত থেকে দূরে রাখা সর্বোপরী নতুন আচার ও চর্চার ফোঁকরে তাকে টিকিয়ে রাখা, এখন দারুন এক বাজি।
বৈদেশিক পন্যসামগ্রী, আচার অনুষ্ঠান ও শিল্প সংস্কৃতির ব্যাপারে বাঙালীর একটা উৎসুক্য রয়েছে। এর পরিধি সে সীমা পর্যন্ত নয় যে সীমা পর্যন্ত তাকে হৃদয়ঙ্গম করা যায় বরং এটা সে সীমা পর্যন্ত যে সীমা পর্যন্ত তাকে আত্মীকরণ করা যায়। তাই বাঙালীর রক্তে যেমন মিশেছে ডাচ, ওলন্দাজ, ফরাসি. পারসিক, ইংরেজ, আরব্য খুম তেমনি ভাষাতেও তেল-জলের মতো মিশে আছে সংস্কৃত, গুজরাটি, আরবি, ফারসী ও ইংরেজী ভাষার শব্দ ও শব্দাংশ। বাঙালীর হাজারো বছরের কৃষ্টি কালচারের যোগ হয়েছে ফার্সী রস, আরব্য চরণ, সর্বভারতীয় আচরণ, ইউরোপীয় আনুষ্ঠানিকতার রেশ।
বাঙালীর সহস্রাব্দের পুরনো সামাজিক আচারে মিশ্রিত হয়েছে সূফীজমের জজবা, ইসলামিক জীবনের সামাজিকতা, ভারতবর্ষীয় সংস্কৃতির পারিবারিক আচার এবং পশ্চিমা সমাজের কিছু অনুকরণ। বাঙালীর সাহিত্য সংস্কৃতিও এর বাইরে নয়। শেতাঙ্গ সাহিত্যের ধারা, পশ্চিম এশিয়ার মাত্রা এবং সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক সংস্কৃতির আবহে তা দিনকে দিন আড়মোড়া ভেঙ্গে প্রাচীন খোলস ছেড়ে নব নব প্রত্যয়ে প্রভাতিব হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
বাঙালীর যে নিজস্ব বলে একটা কিছু আছে, শেকড়ের সন্ধান বলে একটা সূর আছে, অন্যদের থেকে আলাদা বলে একটা জিনিস আছে, নিজেদের জন্য, নিজেদের জীবন থেকে, নিজেদের প্রাণরস সূধামন্ডিত যে ব্যাপারটা সেটা বাঙালী কিন্তু হারায়নি।
বলছি বাংলার লোকসাহিত্যের কথা। আর সেটা বিলীন হয়ে যায়নি বলেই বাঙালী রক্তে, শর্তে, অর্থে, বিত্তে এমনচি চিত্তে মিশ্রণ ঘটিয়েও বাঙালীর জাতিসত্ত্বা আজো অমলিন এবং অক্ষয়। এত ধারা এবং এত সারার মিশ্রণ সত্বেও আমরা আজো বাঙালী হিসেবে পরিচিত। আমাদের অন্য পরিচয় সেটা বাংলাদেশী বা ভারতীয় বাঙালী, কিংবা বাঙালী মুসলমান অথবা বাঙালী হিন্দু কিংবা বাঙালী বৌদ্ধ এসবের চেয়ে ঢের বেশী পোক্ত পরিচয় হয়েছে ‘‘আমরা বাঙালী’’ এটা ভালো কি মন্দ? পাপ কি পূণ্য? সে প্রশ্ন নয় বরং এটা বাস্তবতা নাকি কল্পনা? সে প্রশ্নই সার।
এর একটা কারণ হতে পারে যে, বাঙালীদের একটা অংশ যাদের বেশীরভাগ আবার বাঙালী মুসলিম তারা নেতৃত্ব দিয়ে নিজেদের জন্য আলাদা একটা দেশ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। এখানে বাঙালী হিন্দুর অবদান কিছু কম নয়, বরং ত্যাগের আনুপাতিক হারে তারা এগিয়ে থাকবেন। এমনকি এই বাঙালী মুসলিমরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে নেতৃত্ব দিয়েছিল।
হাজার বছরের বাঙালীর সফলতার খতিয়ানে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এক বিশাল জয়মাল্য। এতে করে আরেকটা সংকট থেকেও বাঙালী মুসলমানেরা বেরিয়ে এসেছে। বিশেষ করে যারা নিজেদেরকে বাঙালী ভাবার চেয়ে আরবাগত কোনো জাতির অংশ ভাবতে পারলে খুশি হতো। সে প্রবণতাও এর মাঝে বিলুপ্ত হয়েছে বৈ কি! বাঙালী হিন্দু বা বৌদ্ধরা একসময় নিজেদের জন্য বাংলার চেয়েও পালি কিংবা সংস্কৃতকে বেশী সম্পর্কিত মনে করতো, সে ধাপ তারা পেরিয়েছে তারও আগে।
বাঙালী হিন্দুও সগৌরবে বাঙালী কেননা প্রাচীন এক শাস্ত্রীয় মানসিকতা সংস্কৃত ভাষাকে মহিয়ান আর গরিয়ান করে বাংলাভাষাকে নিচু জাতের ভাষা বলার যে সে প্রাচীন যুগের রীতি তা থেকে তারা এখন বহুদূরে। বাঙালী বৌদ্ধের পাশাপাশি বাঙালী হিন্দুও তার শেকড় চিনে নিয়েছে বাংলার মধ্যে।
এই প্রবণতা শেষে এসে ঠেকেছিল বাঙালী মুসলিম সমাজে। বাংলা ভাষাকে ছোট আর হিন্দুর ভাষা বলে অপবাদ দিয়ে এর উপর আরবি, ফার্সি, কিংবা উর্দু অথবা অসমিয়া ছাপিয়ে দেয়ার তাবত রাজদন্ডকে বাঁকিয়ে কখনো জীবনের বিনিময়ে বাঙালী প্রমাণ করেছে বাংলার মহত্ব, ভাষার মহত্ব, সেটা বাঙালী সংস্কৃতিকেও দিয়েছে গৌরব। রক্তত্যাগী ভাষা সংগ্রাম বাঙালীকে দিয়েছে মর্যাদা ও গৌরব।
একবার নয়, দু-দুবার এমন রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের স্বাক্ষর রেখে বাঙালী প্রমাণ রেখেছে কোনো সরল রেখায় বাঙালীর বিচার সঠিক হবেনা। প্রথমবার ১৯৫২ ভাষা আন্দোলনে ঢাকাতে। দ্বিতীয় বার আসামে ১৯৬১ সালে। আজ বাঙালীর ভাষার জন্য আত্ম-ত্যাগের দিনটি আন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাঙালী তার ভাষাকে আন্তজাতিক পরিমন্ডলে নিয়ে গেছে। চাইলে সংস্কৃতিকেও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। ভারতে এখন হিন্দির পরই সবচেয়ে বেশী মানুষ বাংলাভাষায় কথা বলে।
বাংলা আমাদের ভাষা, বাঙ্গালা আমাদের সংস্কৃতি। সেটা এক ভিন্ন শিখরে অধিষ্ঠিত অন্যসব কিছুর সাথে মিশ্রণ হওয়ার পরও সেগুলোকে পাশ কাটিয়েও সগৌরবে দন্ডায়মান। এর মধ্যে তিনটি ধারা একেবারেই এর ভেতরে বাহিত যা থেকে আর আলাদা করার অবকাশ নাই। যেমন সনাতন বাঙালী সংস্কৃতি, বাঙালী মুসলমানদের মূল বিশ্বাসের সাথে যুক্ত হয়ে সুফীজম থেকে আসা কতিপয় সাংস্কৃতিক পর্ব এবং বিগত কয়েকশ বছরে বাঙালী সংস্কৃতির নিজস্ব আদলের ভেতর থেকে বের হয়ে আসা কিছু অকৃত্রিম উপাদান। যেমন পূঁথিসাহিত্য, বাউলগান, গম্বীরা, যাত্রাপালা আরো অনেক।
আজ বাঙালীর এই সত্ত্বার গৌরবময় অধিষ্ঠানের পেছনে যে ঐতিহাসিক ঘটনা সবচেয়ে বেশী ভার নিয়েছে তা হলো বাংলাদেশের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ। তা না হলে ওরাতো বাঙালীর ভাষা সংস্কৃতির উপর চরম আঘাত হেনেছিল বার বার। সংযুক্ত পাকিস্তান বাংলা ও বাঙালীর পরিচয়কে হয়তোবা মুছে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বহি:আবরণ মেনে নেয়া বাঙালীও সেদিন ঘুরে দাঁড়িয়েছিল তার সে সত্ত্বা ও পরিচয়ের আদলে এক রক্তপণ লড়াইয়ের জন্য। আদতে বাঙালী লড়াকু জাতি নয়, নিজের পরিচয় হারিয়ে বেঁচে থাকাও বাঙালীর ধাতে নেই, সেটাও প্রমাণ হলো, তাও আবার তিরিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে।
অবশ্য এসবের পিছনে আরো কিছু ধারা কাজ করেছিল। বিশ শতকের প্রথমদিকে বাঙালী মধ্যবিত্ত শ্রেনীর বিকাশ বাঙালীকে তার নিজস্ব পরিচয়ে পরিচিত হতে প্ররোচনা জাগিয়েছে। যে সময় বিশ্বজুড়েই সবাই নিজেরে পরিচয়ে মাথা তুলে গৌরব করার রীতি রপ্ত করছিল। সে ইংরেজ হোক, এমনকি তামিল, মারাঠি বা সর্বভারতীয় চেতনা হোক। যদিও গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাঙালী মুসলমান পরিচয় সমধিক প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল এই বাংলায়।
সাম্প্রদায়িক পরিচয়ে দেশ ও প্রতিষ্ঠান সুবাদে নিখিল ভারত বিভক্ত হওয়ার মাত্র ২৪ বছরের মাথায় মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার আদলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ধারণা চরমভাবে ব্যর্থ হলো। পাকিস্তানের নীতিহীনতা আর নির্যাতনতা বাঙালীকে তার শেকড়ের দিকে ফিরে আসতে অনুপ্রাণীত করলো।
বাংলার হিন্দু, বাংলার মুসলিম, বাংলার বৌদ্ধ ও বাংলার খ্রিষ্টান সবাই এক রশির সমান্তরাল ধারায় বাঙালী হিসেবে স্বাধীন দেশে নিজেদের ধর্ম, পারিবারিক আচার কৃষ্টি কালচার নিজেদের মতো আবার সবার সাথে ভাগাভাগি করে সর্বজনীন এবং সার্বজনীন ভাবে তাদের সাংস্কৃতিক ধারাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। বাংলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্টিগুলো এই ধারায় কতটা সম্পৃক্ত হতে পেরেছে সে প্রশ্ন আসতেই পারে। তবে তাদের গৌরব হলো নিজেদের সংস্কৃতি ধরে রাখার বেলায় তারা নিজেদের প্রমাণ করতে পেরেছে। তাদের নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতির চর্চা স্বাধীন ও অবাধভাবে বাঁচিয়ে রেখে আগামী দিনের সমৃদ্ধি বাংলাদেশ গঠনই এখানে মূখ্য। বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐহিত্য ও সম্পদকে সমৃদ্ধ করছে তাদের ভিন্নতর সংস্কৃতির রঙীন আবেশ। কারণ আজকের বিশ্বের কাছে আমার রাজনৈতিক পরিচয় আমি বাংলাদেশী। একজন ভারতের বাঙালী নাগরিক শত বছর ধরে তার জাতীয়বাদী ভারতীয় পরিচয় কিংবা ধর্মীয় হিন্দু পরিচয়ের সাথে এটা গর্ব করেই বলে ‘‘আমি বাঙালী’’।

