বাংলার লোকজ খেলাধুলার রকমফের
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
এদেশের লোকজ সংস্কৃতির হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্যের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে দেশীয় সংস্কৃতির নানা উপাদান। আবহমানকাল থেকে আমোদপ্রিয় এই জাতি জীবনের পরতে পরতে হাসি-কান্নার মিশেল মুহূর্তগুলো বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানে ভরে তুলেছে। বিনোদনের শত উপাচার দিয়ে বাংলার মানুষ সাজিয়েছে বার্ষিক জীবনের পঞ্জিকা। লোকজ গান, রুপকথা, খনার বচন এগুলো নিয়ে আমরা অনেক কথা শুনলেও লোকজ ক্রীড়া নিয়ে তেমন কিছু শুনি না বললেই চলে। অথচ বাংলাদেশের লোকজ খেলাধুলায় সমৃদ্ধ জগৎ নিয়ে ভরপুর হয়ে আছে গোটা বাংলা। এ দেশের প্রতিটি অঞ্চলেই রয়েছে লোকজ ক্রীড়ার অস্তিত্ব। এসব খেলাগুলো চিত্তাকর্ষক। খেলা হিসেবে যেমনি আনন্দদায়ক তেমনি স্বাস্থ্যের জন্য সুফলদায়ক।
শত শত খেলা আজো এই বাংলায় গ্রামীণ শিশু-কিশোরদের বেড়ে ওঠার সঙ্গী হিসেবে টিকে আছে। ড. আশরাফ সিদ্দিকী তার বাংলার মুখ গ্রন্থে দেড়শ খেলার কথা বলেছেন। অধুনালুপ্ত ও অধুনাযুক্ত খেলা মিলে বাংলার গ্রামীণ খেলার সংখ্যা আধা সহস্রের মতো হয়ে থাকবে বিশেষকরে অঞ্ছলভেদে কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত খেলাসহ। এসব খেলা বিভিন্ন দিক থেকে নানা বৈচিত্রে ভরা। সেসব দিক বিচারে বাংলার লোকজ ক্রীড়া ও খেলাসমূহকে কয়েকটি ভাগ করে দেখানো যায়।
কিছু খেলা রয়েছে ঘরের বাইরে গিয়ে খেলতে হয় আবার কিছু খেলা ঘরে বসে খেলা যায়। ষোলঘুটি, গর্তাছি, হাতবদল, দোক্কাতেক্কা, চোর-ডাকাত এসব খেলা ঘরে বসে খেলা যায়। ঘরের বাইরেও খেলার শেষ নেই। বিভিন্ন রকমের খেলা এক্ষেত্রে। কুতকুত, হা-ডু-ডু, দাড়িয়াবান্ধা এসব খেলার জন্য মাঠেতে ছক করতে হয়। কুতকুত এবং কাবাডির জন্য মুখে বোল নিতে হয়। কুত কুত, চিত কিত, ডু ডু বা কাবাডি কাবাডি এসব। আবার কোনো কোনো খেলায় মজার ছড়া কাটতে হয়- বৌছি, গোল্লাছুট, পুতুল চুরি, মাকড়সার জাল ইত্যাদি। সহজ কথা আমরা ইংরেজীতে যেমন বলি ইনডোর গেমস ও আউটডোর গেমস। বাংলার খেলাগুলোও সেরকম বরং এখানে আরো ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা যোগ হতে পারে। এখানে কিছু সামাজিক খেলাও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা শাইখ সিরাজের কৃষকের ঈদ আনন্দ অনুষ্ঠান দেখে তার আঁচ পেতে পারি।
বাংলাদেশের লোকজ খেলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ লোকজ ছড়া। লোকজ ছড়া শুধু খেলার নয় বাংলার লোক সাহিত্যের এক দিকবাহন। এ্ই খেলার বোল বা ছড়াগুলোর চরিত্র অনেকটা লোকজ ছড়ার মতোই। কখনো খেলার বোলকে লোকজ ছড়া হিসেবে পাওয়া যায়। কখনো বা লোকজ ছড়াকে খেলার বোল হিসেবে দেখতে পাই।
এসব ছড়াও খুব মজার। যেমন-
‘ছি গো হরি অংক করি, অংকের বদল খেল না করি’, ‘মোর বাড়ি ঢাকা, ঘরখানা পাকা, ঘরে থাকে আলমারী, সকাল-বিকাল কিল মারি’।
এগুলোর শিল্পমূল্যও কম না। আবার জীবন ঘনিষ্ঠতার দিকে থেকেও এগুলো মোটেই পিছিয়ে নেই। এসব খেলায় আবার দল গঠনের বিভিন্ন নিয়ম রয়েছে। গোল্লাছুট, নামডাকা ইত্যাদি খেলায় সমান সংখ্যক দুটি দলের সাথে প্রতিযোগিতা হয় আবার দেখা যায় বুড়ির পুকুর, ইসপির, নামতা বোলসহ কিছু খেলা রয়েছে যাতে একজনকে সবার বিপরীতে খেলতে হয়। কে হবে এই একজন তা নিয়ে আবার সুন্দর নির্বাচন পদ্ধতি আছে। অপু, দশ, বিশ, …… একশ আম, জাম, ফুল, ফুটে, পান। পান শব্দটি কার ভাগে পড়বে সে হবে একজন। কোনো ক্ষেত্রে এই একজনের নাম হতো ‘‘বগি’’। সে জয়ী ওয়ে আরেকজনকে বগি বানাতে। এসব শব্দ বা নাম অঞ্চলভেদে আলাদাও হয়ে থাকে।
গ্রাম-বাংলার খেলার প্রাণের উচ্ছাস আছে। কিছু কিছু খেলায় আবার উপকরণ প্রয়োজন হয় যেমন ডাংগুলি, সাতঝিক, রুমাল চুরি, বালিশ দৌড়, ঘুড়ি ওড়ানো ইত্যাদি। এমনি অনেক খেলা অনেক অঞ্চলে রয়েছে। কিছু কিছু খেলা সারা বাংলাদেশে রয়েছে আবার কিছু খেলা শুধু নির্দিষ্ট অঞ্চলেই দেখা যায়।
কিছু প্রতিযোগিতামূলক খেলা আছে যাতে দলভিত্তিক হয় না প্রথম দ্বিতীয় হয়। যেমন মোরগ লড়াই, ঘুড়ি ওড়ানো, মারবেল খেলা। দলভিত্তিক প্রথম দ্বিতীয় হয় নৌকা বাইচ। গুমঘঠি খেলা প্রচলিত আছে কোনো কোনো অঞ্চলে এ খেলা দিয়ে জমির মালিক বা দখলদারিত্ব নির্ণয় হয়। এটা এক ধরনের সামাজিক খেলা। বলি বা কুস্তি, লাঠি খেলা, ষাঁড়ের লড়াই ইত্যাদি আড়ম্ভরপূর্ণ ক্রীড়া উৎসব বাঙালির জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে আসছে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে। কিছু কিছু খেলা আছে বড়রা খেলে না বললেই চলে আবার কিছু খেলা ছোটদের মধ্যে তেমন প্রচলন নেই। বড়দের একটি খেলা নৌকাবাইচ। ছোটদের কুতকুত। এগুলো একবারেই আমাদের নিজস্ব খেলা।
এসব সমৃদ্ধ আর আনন্দ জাগানিয়া খেলাধূলা আজ হারাতে বসেছি আমরা। গ্রামীন এসব খেলাধুলা বহুমুখিতা আর বৈচিত্রে ঠাসা। ঘরের ছোটবেলা এক চিলতে উঠোন কিংবা দিগন্ত জোড়া মাঠ সব জায়গার জন্য উপযোগী খেলা রয়েছে। এমনকি নদীমাতৃক এই বাংলায় পানিতে ডুব দিয়ে খেলা যায় এ রকম মজার খেলারও প্রচলন আছে। এসব খেলা কে কবে কখন কিভাবে শুরু করেছে তার হদীস বের করা সত্যি খুব দূষ্কর। তবুও এখানে এসবের সংরক্ষণ ও বিকাশে উদ্যোগ নেয়া যায়। ফোকলেইন বাংলাদেশ নামক একটি সংস্থা এসব খেলার কিছু প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। কিন্তু দীর্ঘ পরিসরে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার জন্য কারো না কারো এগিয়ে আসা খুবই জরুরি।
গ্রীসের অলিম্পিয়াস মন্দিরের স্থানীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আজ বৈশ্বিক হয়ে পড়েছে। সেদিক দিয়ে আমরা লক্ষ্যযোজন মাইল পিছিয়ে আছি। আমাদের কোনো ক্রীড়া আন্তর্জাতিক পরিচয় তো মেলেনি বরং জীবন থেকেই হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ প্রয়োজন ছিলো জাতীয় ভাবে এসবের আয়োজন ও পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং গণমাধ্যম দ্বারা নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে তুলে ধরা। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অনিয়মিত উদ্যোগ আশা জাগিয়ে আবার হারিয়ে যায়। ভরসা হয়তো পরবর্তী প্রজন্ম এসবের গুঢ় অর্থ অনুধাবনে সক্ষম হবে।
আমাদের শেকড়ের পরিচয় এইসব খেলা খেলতে যেমন বেগ পেতে হয় না। তেমনি করে ধর্মীয় বিধি-বিধানের সাথেও এসবের কোনো সংঘর্ষ নেই। তাই আমরা অনায়াসে এসবের সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও আয়োজন করে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিরচর্চাকে বেগবান করতে পারি। দুনিয়ার কাছে আমাদের ক্রীড়া সংস্কৃতির কথা জানিয়ে দিতে পারি।

