বাংলায় ঈদ আনন্দ ও ঈদ মেলা

বাংলায় ঈদ আনন্দ ও ঈদ মেলা

বাংলায় ঈদ আনন্দ ও ঈদ মেলা

-জাহাঙ্গীর আলম শোভন

 

ঈদের চাঁদ দেখা উৎসব

ঢাকায় ঈদ-উল-ফিতরের চাঁদ দেখা নিয়ে একটি বিশেষ ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল। মোগল আমলে লালবাগ কেল্লা, সোয়ারিঘাট, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার ছাদে চাঁদ দেখা নিয়ে উৎসব হতো। উর্দুরোড, বংশাল, ইসলামপুর, মৌলবীবাজার, নিমতলি প্রভৃতি অঞ্চলেও চাঁদ দেখা নিয়ে আনন্দ-উল্লাস ছিল চোখে পড়ার মতো।

মোগল সুবাদার ইসলাম খানের সেনাপতি মির্জা নাথান তাঁর ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বি’ গ্রন্থে ঢাকার ঈদ উৎসবের সূচনার কথা উল্লেখ করেছেন: “সন্ধ্যায় মোমবাতির আলোয় নতুন চাঁদ দেখা গেলে শিবিরে বেজে উঠত শাহি তূর্য, একের পর এক গোলন্দাজ বাহিনী গুলি ছুঁড়ত, যা আতশবাজির মতো দৃশ্যমান হতো।” এরপর মোগল শাসনের অবসানের পরও নায়েব-নাজিমদের আমলে নিমতলি প্রাসাদকে কেন্দ্র করে চাঁদ দেখা উৎসব ও ঈদ মিছিল আয়োজিত হতো।

ঈদ জামাত ও নামাজ

বাংলাদেশে কোথায় প্রথম ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মামা, মা আমেনার চাচাতো ভাই আবু ওয়াক্কাস (রা.) ৬২০ থেকে ৬২৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করেন । অনেকে অনুমান করেন, রংপুরের পঞ্চগ্রামের মসজিদটিও তিনি নির্মাণ করেন যা ৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে সংস্কার করা হয়। ধারণা করা হয় তিনি প্রথম অনুসারীদের নিয়ে ঈদের জামাত ও খুৎবা পাঠ করেন।  বাংলায় যেসব ইসলাম প্রচারক দলবেঁধে এসেছিলেন তাদের দ্বারা প্রথম ঈদ-জামাতের সূচনা হয়। তবে সেটি সার্বিকভাবে প্রচলন হতে সময় লাগে।

প্রচলন শুরুর প্রথমদিকে  গবেষকরা মনে করেন, সন্দ্বীপে  আরব বণিকদের উদ্যোগে ১৪ শতকের প্রথমদিকে  প্রথম ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। তবে, ঢাকায় ১৪৫৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত বিনত বিবির মসজিদে প্রথম ঈদ জামাত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সুলতানি শাসনামল থেকে ঢাকায় ঈদের বড় জামাত আয়োজনের প্রমাণ পাওয়া যায়।

মিরপুরের শাহ আলী (র.)-এর মাজার সংলগ্ন মসজিদেও কয়েকশ বছর ধরে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সুবাদার মুর্শিদ কুলি খাঁর উদ্যোগে নির্মিত লালবাগ শাহি মসজিদেও ঈদের জামাত আদায়ের প্রচলন ছিল। ১৬৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত ধানমন্ডি ঈদগাহ ঢাকার প্রথম পরিকল্পিত ঈদগাহ হিসেবে চিহ্নিত, যেখানে বড় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতো।

ঈদের পোশাক ও ফ্যাশন

মোগল শাসকদের হাত ধরে ঢাকায় সেলাইযুক্ত পোশাকের প্রচলন শুরু হয়। বিশেষ কারিগর শ্রেণি, যাঁরা দর্জি বা খলিফা নামে পরিচিত ছিলেন, ঈদের পোশাক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। ঢাকার নবাবদের শেরওয়ানি, কোট, আচকান তৈরি করতেন কিংবদন্তিতুল্য দর্জি হাফিজ মিঞা। ইসলামপুর, আমলিগোলা মহল্লার খলিফারাও পোশাক তৈরিতে সুপরিচিত ছিলেন।

বিশ শতকের শুরুর দিকে মুসলিম পুরুষরা ধুতি পরে ঈদের নামাজ আদায় করতেন, যা পরে লুঙ্গি ও পায়জামা-পাঞ্জাবিতে রূপ নেয়। ১৯৪০-এর দশকে ঈদের বাজার জমে উঠত পাটুয়াটুলীতে, যেখানে ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়, অমৃতলাল বস্ত্রালয়সহ বিখ্যাত দোকান ছিল। ইসলামপুর থেকে মেয়েরা কাপড় কিনে এনে বাড়িতে সালোয়ার-কামিজ তৈরি করতেন। চানরাতে চুড়িওয়ালিদের কাছ থেকে চুড়ি কেনা ছিল ঈদ ফ্যাশনের অন্যতম অনুষঙ্গ।

ঈদের মিছিল ও আনন্দ উৎসব

ইসলাম খানের শাসনামলে ঢাকায় ঈদ মিছিলের প্রচলন শুরু হয়। এই মিছিল নিমতলি প্রাসাদে নায়েব-নাজিমদের সময়েও চালু ছিল। উনিশ শতকের শুরুর দিকে আঁকা চিত্রে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে বিশ শতকের তৃতীয় দশক থেকে ঢাকায় আবার ঈদের মিছিল চালু হয়।

ঈদের আনন্দের আরেকটি অংশ ছিল আতর ব্যবহার। আতরপট্টিতে পাওয়া যেত দরবারিখাস, মিশকাম্বর, মেশক-জাফরান, গোলাপখাসসহ নানা রকম আতর। ঈদের জামাতে কানের ভাঁজে আতরগন্ধী তুলা গুঁজে নামাজ পড়তে যাওয়াটা ঢাকাবাসীর ঐতিহ্য ছিল।

ঐতিহ্যবাহী ঈদ মেলা

সুফিজমের ও শিয়া মতবাদের কারণে ঈদের আনন্দের অনুসঙ্গ হিসেবে ঈদমেলা শুরু হয়। ধারণা করা হয় ঈদমেলা ও ঈদমিছিল সমসাময়িক। কারণ ঈদের জামাত ও ঈদমেলার জন্য আসা লোকদের উদ্দেশ্য করে বসা পণ্যের পসরা ধীরে ধীরে মেলায় রুপ নিতে থাকে। কিন্তু ঈদ মিছিল ও ঈদমেলায় ঢাকায় সুলতানী বা মুঘল আমলে আনুষ্ঠানিক রুপ পেলেও রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় রয়েছে ৫শ বছরের ঈদমেলার ঐতিহ্য। প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঈদ মেলা এখনো অনেক এলাকায় টিকে আছে। বিশেষত, রাজশাহীর বাঘার ঐতিহাসিক ঈদ মেলা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ঈদ উৎসবের অংশ। ঈদের আগের দিন থেকে শুরু হওয়া এই মেলা চলে প্রায় ১০ দিন।

ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঢাকার ঈদ উৎসবের নানা ঐতিহাসিক অনুষঙ্গ আজও বহু মানুষের মনে জড়িয়ে আছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে ঈদ উৎসবের রূপ পাল্টেছে, কিন্তু মূল আনন্দ ও ঐতিহ্যের ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে।

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply