বাংলাদেশ

বাংলাদেশ : শত সমস্যার মাঝেও এখানে আছে কিছু বিশেষ সুবিধা

বাংলাদেশ : শত সমস্যার মাঝেও এখানে আছে কিছু বিশেষ সুবিধা

আমরা প্রায়ই বলি, বাংলাদেশ হচ্ছে সমস্যার দেশ বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্নীতিতে ভরা দেশ। বাংলাদেশকে আমরা প্রায়ই এভাবে  দোষারোপ করি — ঘনবসতি, যানজট, দুর্নীতি, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, চিকিৎসা ও শিক্ষার সীমাবদ্ধতা ইত্যাদির জন্য।

তবু একটু গভীরে তাকালে বোঝা যায়, এখানেই লুকিয়ে আছে কিছু বিষয়,  এত কিছুর মধ্যেও এখানে আছে সে অন্যরকম ব্যাপার যা হয়তো বহু উন্নত দেশেও এমনভাবে মেলে না। এগুলোই এখানকার মানুষের জীবনযাত্রাকে তুলনামূলকভাবে সহজ করে দেয়, সম্পর্কগুলোকে বাঁচিয়ে রাখে, আর সমাজকে কিছুটা মানবিক রাখে।
সেটাই বাঁচিয়ে রাখছে এই জাতিকে — কষ্টের মাঝেও।

  হাতের কাছেই জীবনযাত্রার সবকিছু

 শহরগুলোতে আধা কিলোমিটার থেকে ১ কিলোমিটার বৃত্তের মধ্যেই মুদিখানা, কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান, ব্যাংক, মসজিদ, স্কুল প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছু পাওয়া যায়। গাড়িতে ৫ -১০ মিনেটের দূরত্বে হাসপাতালও পাওয়া যাবে। গ্রামেও প্রধান বাজার, প্রাথমিক স্কুল, হাট, ডাকঘর, স্বাস্থ্যকেন্দ্র রিকশায় ৩০ মিনিটের মধ্যে পাওয়া যায় বেশীরভাগ এলাকায় কিছু পাহাড় ও চর এলাকা ব্যতিত। ইউরোপ বা আমেরিকায় অনেক সময় মসজিদ তো দূর, গির্জা বা স্কুলও ৫-১০ কিমি দূরে। ফলে জীবনযাত্রা এখানে তুলনামূলকভাবে সহজ বলায় “পায়ে হেঁটে চলার যোগ্য”। এটা বাংলাদেশের লোকেরা বুঝতে পারে যখন তারা দেশের বাইরে যায়।

  সহজ পানি ও চাষের ব্যবস্থা

নদী এবং পানীয় জল এই দুটো বিষয়কে কেন্দ্র করে সারা পৃথিবীর সভ্যতাগুলো বিকশিত হয়েছে। আর এই দুটো এখানে সবচেয়ে হাতের কাছে। ৭শ নদী জালের মতো বিস্তৃত। আর পানীয় জলও মাটির একটু গভীরে। সাম্প্রতীক কালে ঢাকায় পানির স্তর নামলেও বেশীর ভাগ এলাকায়  এখানে টিউবওয়েল বসালেই মিষ্টি পানি মেলে।চাষের জন্য খাল, পুকুর, নদী হাতের কাছে এটা খাদ্যের জোগানে মূল ভূমিকা রাখে। মরুপ্রধান বা বরফঢাকা দেশে এমন সহজে পানি পাওয়া কল্পনাতীত।

  বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে সহজে যাওয়া যায়

ইউরোপ বা আমেরিকায় একজন বিশেষজ্ঞের কাছে দেখা করতে ২ সপ্তাহ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। বাংলাদেশে সকালে ফোন করলেই দুপুরে বা পরের দিনই চেম্বারে গিয়ে দেখা সম্ভব। হয়তো এদেশে স্বাস্থ্য সেবার মান খুব খারাপ কিন্তু যারা বিদেশ গিয়ে ভাল সেবা নিতে পারে না তাদের জন্যতো এটাই শান্তি। হ্যাঁ, মানসিক শান্তি আর সিস্টেমের ত্রুটি আছে, কিন্তু দ্রুত সেবা পাওয়ার এই সুযোগও সত্যি। ফলে এ ধরনের সহজ জীবনযাত্রায় যারা অভ্যস্ত তারা অন্যত্র গিয়ে তাল সামলাতে একটু কষ্টই হবে। বিদেশে সেটেল হওয়ার জন্য যাওয়া আগে এগুলো ভাবতে হবে।

আমি বিদেশে যেতে নিষেধ করছিনা। কারণ এখানে মানুষ বেশী সুযোগ কম। তাই অপচুনিটি হ্যাট করতে আপনাকে সীমানা পাড়ি দিতে হবে সুযোগ থাকলে। যুগে যুগে অনেকে করেছে যারা করেছে তারা তাদের ভাগ্যকে নতুন করে লিখেছে। এটা নিয়ে পরে লিখব আশা করি।

 অদৃশ্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয়

গত বছর ৫ আগস্ট থেকে প্রায় ক’ দিন দেশের অনেক এলাকায় পুলিশ কার্যত ছিল না। কিছু ঘটনা অবশ্য ঘটেছে কিন্তু দেশের সর্বত্র বড় কোনো লুটতরাজ বা গণহত্যা হয়নি। কারণ, গ্রামের মানুষ পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, এমনকি হাটের দোকানদারদের সাথেও এক ধরনের অলিখিত সামাজিক চুক্তিতে থাকে। ইউরোপ-আমেরিকায় ঘণ্টাখানেক কারেন্ট না থাকলেই দোকান ভাঙচুর-লুটপাটের খবর পাওয়া যায়। আর পুলিশতো আরো বড়ো ব্যাপার।

একটা অভ্যুত্থান হয়ে গিয়েছে। অথচ কোথাও কোনো সাধারণ মানুষের হাতে অস্ত্র দেখা যায়নি। আমেরিকাতে প্রায় সময় শোনা যায়। স্কুলে বাচ্চারা খেলতে খেলতে মানুষ খুন করে। অস্বীকার করছিনা মব জাস্টিস হয়েছে, সেটাতে দেশ স্বাধীনের পরের দিন থেকে শুরু হয়েছে। আইনের শাসন না থাকলে এর থেকে মুক্তি আসবেনা। সেটি একটি ইস্যু বটে। সাথে সাথে স্বৈরাচার সরকারের রাজনৈতিক নিপীড়নও হতাশার বিষয়

 করোনাতেও অর্থনীতি স্থির থেকেছে

করোনা মহামারিতে যখন বিশ্বের বহু দেশের অর্থনীতি ধসে পড়েছিল, বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধীর হলেও ঋণাত্মক হয়নি। গরীব মানুষ ছোট ব্যবসা, দিনমজুরি, চাষাবাদ দিয়ে মৌলিক জীবন চালিয়ে গেছে। কারণ তারা সরকারী বেতন, বাজেট আর অনুদানের উপর নির্ভরশীল নয়।

হাজারী থেকে বিলিয়নিয়ার

যেদেশে ১শ বছর আগে ১ হাজার টাকার মালিক হলে তার নামের সাথে ‘‘হাজারী’’ লেখা হতো। সে দেশে গত ৫০ বছরে আনুমানিক দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ শূন্য থেকে কোটিপতি হয়েছে (মূলত ক্ষুদ্র ব্যবসা, গার্মেন্টস, পোলট্রি, মাছ চাষ, আড়ত, কনস্ট্রাকশন ইত্যাদিতে)। মাত্র ৫০-৫৫ বছরে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো ছাড়াই এত বেশি নতুন কোটিপতি তৈরি হওয়া বিশ্বে বিরল। দেশে ব্যবসা শুরুর জন্য কঠিন ট্যাক্স, পরিবেশ, শ্রম আইন, নিরাপত্তা বিধি পার হতে হয়। আর এখানে এগুলো অবলীলায় পার হওয়া যায় তবে একটু বাঁকা পথে। এটা একটা কষ্টের কথা বটে তবে এখানে সেই তুলনায় পরিবেশ এখনো অনেক শিথিল।

 টাটকা খাবার ও দেশি স্বাদ

সকালে বাজারে গেলে কেটে আনা টাটকা দেশি মুরগি, মাছ, শাকসবজি পাওয়া যায়। ইউরোপ-আমেরিকায় বেশিরভাগ খাবার ফ্রোজেন বা কেমিক্যাল ট্রিটেড। তবে বর্তমানে ফরমালিন, ক্যামিকেল, রাসায়নিক সার, রং আর মানহীন খাবারের যে নির্যাতন চলছে এটাকে এখন আর সুবিধা না বলে অসুবিধা বলাই ভাল। তবে হাঁ  গ্রামাঞ্চলে তো নিজের পুকুর, ক্ষেত, গাছ থেকেই খাবার আসে সেগুলো তুলনামূলক ফ্রেশ। আজকাল অর্গানিক অনেক কিছু পাওয়া যায়। তবে সেজন্য পয়সা গুনতে হয়।

 এক ভাষা, এক খাদ্যাভ্যাস, এক সংস্কৃতি

বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গেলে একই ভাষায় কথা বলা যায়, একই ধরণের খাবার খাওয়া যায়, একই রকম অভ্যাস-প্রথা। ফলে দেশের ভেতরে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজন থেকে তেমন সমস্যা হয় না। ভারতে ভাষা, ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পুরো ভিন্ন হয়ে যায়। এমনকি ইউরোপেও ভাষা বা খাদ্যের জন্য আলাদা এলাকা মানিয়ে নেওয়া কষ্টকর হয়।

বেকারত্ব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি — সব সত্ত্বেও এদেশের মানুষ বেঁচে আছে, নতুন করে জীবন গড়ছে। চরম হতাশা বা গণআত্মহত্যার খবর এ দেশে তেমন শোনা যায় না, যা অনেক উন্নত দেশের মলিন বাস্তবতা।

বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জে ভরা দেশ। তবু এখানকার মানুষের মুখে হাসি থাকে, পরিবারে সম্পর্ক থাকে, সমাজে আতিথেয়তা থাকে, আর থাকে এক সহজতর জীবনযাত্রা — যা বহু উন্নত দেশেও পাওয়া দুষ্কর। এই মাটির এই গুণগুলোই হয়তো আমাদের বাঁচিয়ে রাখছে শত সমস্যা সত্ত্বেও।

লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

ছবি: ইন্টারনেট

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply