Bangladesh, joy Bangla

বাংলাদেশ জিন্দাবাদ: বাংলাদেশের স্লোগান

বাংলাদেশ জিন্দাবাদ: বাংলাদেশের স্লোগান

“বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” (ফার্সি: জিন্দাবাদ, অর্থ: “দীর্ঘজীবী হোক”) বাংলাদেশের স্বাধীনতা, জাতিসত্তা, গরিমা ও অঙ্গীকারের সর্বশক্তিশালী ও সর্বব্যাপী প্রকাশ। এটি কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি একটি জাতীয় মন্ত্র, এক ধরনের প্রার্থনা এবং স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের চূড়ান্ত প্রকাশ বলে মনে করেন এর অনুসারীরা। কিন্তু একে বিদেশী ভাষার স্লোগান বলে তারা মনে করে এটা বাংলা সংষ্কৃতির বাহক নয়। বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে বা পাকিস্তানে এই স্লোগান ‘‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’’ থাকার কারণে কারো কারো কাছে এটা নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে।

অন্যদিকে বিকল্প স্লোগান হিসেবে জয়বাংলা ব্যবহার করা হলেও এটাও ভারতের জয়হিন্দ এবং হিন্দুধর্মের জয় শ্রীরাম এর সাথে মিল রয়েছে। তবে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ এবং তার আগে পরে এটি মুক্তিকামী মানুষের স্লোগানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এখানেও বাগড়া আছে। শেখ মুজিব সরকারের অত্যাচার নির্যাতন ও একদলীয় শাসনের কারণে বাংলাদেশের জনগনের বড়ো একটা অংশ প্রথমবার এই স্লোগান থেকে সরে আসে। এবং দ্বিতীয়বার শেখ হাসিনা সরকারের ব্যাপট লুটের রাজনীতি, গণহত্যা, ভোট ডাকাতিসহ নানাকাজে এর ব্যবহারের কারণে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিশাল অংশ এর বিরোধী হয়ে উঠেছে। যারা বিরোধী নয় তাদের বড়ো একটা অংশ নিরবতা পালন করে। ফলে এই স্লোগান এখন ভিন্নতা বহন করে কারো কারো কাছে। যদিও ভারতে বাঙালীদের একটা অংশ জয় বাংলা স্লোগান ব্যবহার করলেও কট্টর হিন্দুরা একে বাংলাদেশী স্লোগান মনে করে।

ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো  এখানে ‘‘আল্লাহু-আকবর ধ্বনি ব্যবহার করে। তবে তারা বাংলাদেশ জিন্দাবাদও ব্যবহার করে থাকে। আমরা আগে জয়বাংলা ও আল্লাহু আকবর নিয়ে লেখা প্রকাশ করেছি। এ যাত্রায় বাংলাদেশ জিন্দাবাদ স্লোগান নিয়ে কিছু বিষয় শেয়ার করতে চাই।

ইতিহাস ও উৎপত্তি: কে, কখন, কীভাবে?

“বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” স্লোগানটি জন্মেছে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতা যুদ্ধের গর্ভে। এর উৎপত্তি খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে।

১. ভারতীয় উপমহাদেশে “জিন্দাবাদ” প্রথা

“জিন্দাবাদ” একটি ফার্সি শব্দগুচ্ছ, যার অর্থ “দীর্ঘজীবী হোক” বা “চিরজীবী হোক”। মুঘল আমল থেকে এটি উপমহাদেশে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে এটি শক্তিশালী স্লোগান হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যেমন: “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” (বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক), “হিন্দুস্তান জিন্দাবাদ” (ভারত দীর্ঘজীবী হোক)। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” স্লোগানটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত।

২. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জোরদার হয়। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে বাঙালি ছাত্র ও জনগণ নানা স্লোগান চিৎকার করত, যেমন: “বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।” বাংলাদেশ জিন্দাবাদ ব্যবহার হয়েছে বলে শোনা যায়। কিন্তু এ সংক্রান্ত কোনো রেকড পাওয়া যায়নি।

২৩ নভেম্বর ১৯৭০ সালে আবদুল হামিদ খান ভাসানী ঢাকার পল্টন ময়দানে একটি সমাবেশে বক্তৃতা করেন। সেদিন তিনি  তিনি তার বক্তেব্যের শেষে পাকিস্তান জিন্দাবাদ-এর পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে স্লোগান দেন।

১৯৭৫ সালে খন্দকার মোশতাক আহমদের সভাপতিত্বে জয় বাংলার পরিবর্তে বাংলাদেশ জিন্দাবাদকে গ্রহণ করে।  পরে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতির সময় জাতিগত ভাষাগত বাঙালি পরিচয়ের বিপরীতে বাংলাদেশের জন্য একটি আঞ্চলিক পরিচয় তৈরির প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে এটি গ্রহণ করেন।

১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ পল্টনের ঐতিহাসিক সমাবেশে ছাত্রনেতারা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। সেই মুহূর্তে লাখো মানুষের কণ্ঠে স্বতঃস্ফূর্তভাবে “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” ধ্বনিত হয়। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গণঘোষণা হিসেবে বিবেচিত হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই বক্তৃতার পর জনসমুদ্র থেকে “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” ও “জয় বাংলা” স্লোগান উচ্চারিত হয়।

২৬শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা হওয়ার পর থেকে এটি মুক্তিযোদ্ধাদের আনুষ্ঠানিক স্লোগান হিসেবে গৃহীত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা সামনে এগোতেন “জয় বাংলা” স্লোগান দিয়ে, আর সাধারণ জনগণ প্রতিক্রিয়ায় বলতেন “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে, “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” এবং “শেখ মুজিব জিন্দাবাদ” একটি সাধারণ শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৭১ সালের অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারও জয়বাংলার পাশাপাশি  সমর্থকরা এটি ব্যবহার করতেন।

সুতরাং, এটি কোনো ব্যক্তির সৃষ্টি নয়; এটি ১৯৭১ সালের গণ-উত্থানের সময় সমগ্র বাঙালি জাতির সমষ্টিগত চেতনার ফল। এবং তখন জয়বাংলা ও বাংলাদেশ জিন্দাবাদ এসব নিয়ে কোনো বির্তক আসেনি।

কোন স্লোগানের সাথে মিল রয়েছে?

“বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” স্লোগানটির কাঠামো ও ভাবনা মূলত “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” স্লোগানের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। পাকিস্তানের শাসনাধীনে বাঙালি জাতি যখন দমনভোগ করছিল, তখন তারা তাদের নিজস্ব জাতীয় পরিচয়ের জন্য parallel স্লোগান সৃষ্টি করল – “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।”

এছাড়াও, এটি “হিন্দুস্তান জিন্দাবাদ” বা “জয় হিন্দ” স্লোগানের সাথেও সাদৃশ্যপূর্ণ। সবগুলোই একটি রাষ্ট্রের প্রতি ভালোবাসা ও দীর্ঘজীবনের প্রার্থনার প্রকাশ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘‘ বাংলাদেশ জিন্দাবাদ

সব রাজনৈতিক দল “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” ব্যবহার করে না। এর পেছনে মূলত দর্শনগত পার্থক্য কাজ করে।১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দার্শনিক ভিত্তি তারা গ্রহণ করেনি। তাদের কাছে জাতীয়তাবাদ প্রধান নীতি নয়; আন্তর্জাতিক মুসলিম উম্মাহ প্রধান যেমন, ধর্মীয় রাজনৈতিক দল  জামায়াতে ইসলামী, তারা “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ”-এর পরিবর্তে “আল্লাহু আকবর” বা ধর্মীয় ভিত্তির স্লোগানকে বেশি প্রাধান্য দেয়। তবে কখনো বাংলাদেশ জিন্দাবাদ ব্যবহার করলেও কখনো জয়বাংলা ব্যবহার করে না। তারা এটাকে আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগান ও ভারতীয় স্লোগানের নকল বলে মনে করে।

তাদের মতে, “জিন্দাবাদ” স্লোগান ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদকে প্রচার করে, যা তাদের ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা কিংবা অন্য কিছুর সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কিন্তু স্লোগানের রাজনীতিও এখানে এত প্রকট যে, জয়বাংলার লোকদের কাছে এটা পছন্দ নয়। তবে ইসলামী পন্থীদের কাছেও যে, সবসময় গ্রহণযোগ্য তা নয়।

কিছু বামপন্থী দল (যেমন সিপিবি বা ছোট অংশ) জাতীয়তাবাদকে “পুঁজিবাদী আদর্শ” হিসেবে দেখে। আন্তর্জাতিকতার নীতির কারণে তারা কখনো কখনো জাতীয় স্লোগান এড়ায়, যদিও কোনো বিরোধীতা করে না।  বাংলাদেশে আগে যারা যারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, তাদের উত্তরাধিকারীরা “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে । কারণেএটা পাকিস্তান জিন্দাবাদ এর সাথে মিলে যায়।

বাংলাদেশ জিন্দাবাদ পুরনো স্লোগান। কিন্তু জয়বাংলা বিতর্ক দলীয় সাম্প্রদায়িকতার কারণে স্লোগানের রাজনীতি বড় হয়ে গেছে।  জাতীয় অর্জন বা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া জয়লাভের সময় “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” স্লোগান জাতিগত পার্থক্য অতিক্রম করে দেশকে একত্রিত করতে পারে।

“বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” এবং “আল্লাহু আকবর” এই দুটি স্লোগানের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বৈততা বোঝা যায়। প্রথমটি জাতীয় পরিচয়, দ্বিতীয়টি ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে আনে। আর জয়বাংলা মুক্তিযুদ্ধের প্রতিনিধিত্ব করে।

জয়বাংলা যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের মুখের ধ্বনি ছিল “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” হল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ধারণা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অনুখকূল।

অতএব, “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি একটি লিটমাস টেস্ট, একটি দেশের ইতিহাস, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণের সূচক। বাংলাদেশ শুধুমাত্র একটি ভূখণ্ড নয়, এটি একটি ধারণা, একটি স্বপ্ন এবং চলমান সংগ্রাম – এবং সেই সংগ্রামে “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” আমাদের চিরন্তন আহ্বান।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply