বাংলাদেশের শিল্পনীতি সংশোধন প্রসঙ্গে

বাংলাদেশের শিল্পনীতি সংশোধন প্রসঙ্গে

শিল্পনীতি সংশোধন

 

শিল্পনীতির উদ্দেশ্য

বর্তমান শিল্পনীতিতে যেসব উদ্দেশ্য রয়েছে। তার সাথে নিন্ম লিখিত উদ্দেশ্যগুলো যুক্ত করতে হবে।

১. দেশীয় শিল্পের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য অনলাইনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া।

২. ক্রসবর্ডার ই-কমার্সের মাধ্যমে দেশীয় পণ্য এবং দেশে উৎপাদিত পণ্য  বিটুসি, এবং বিটুবি মডেলে বিশ্বব্যাপী একক ক্রেতাদের হাতে পৌঁছে দেয়ার সুযোগ গ্রহণ করা।

* অনলাইন ব্যবসা

১. অনলাইনে পণ্য বিক্রি ক্ষেত্রে যেসব পণ্য স্থানীয়ভাবে ডেলিভারী হয় কিন্তু তার বিনিময়ে বৈদেশিক মূদ্রা আসে। এসব পণ্যের ক্ষেত্রে তাদেরকে রেমিটেন্স অথবা রফ্তানী হিসেবে অন্তভূক্ত করা।

২. ক্রস বর্ডার ই-কমার্সের মাধ্যমে দেশে উৎপাদিত শিল্পপণ্যের বিশ্বময় বাজার সৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

৩. যারা ক্রসবর্ডারের মাধ্যমে পণ্য আমদানী করে থাকে। সেক্ষেত্রে রফতানী নীতি  ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের সাথে সমন্বয় নীতি পলিসি প্রণয়ন করে তরুনদের কাজের ক্ষেত্র প্রসারিত করা।

৪. প্রিন্ট অন অর্ডার (পিওডি) এর মাধ্যমে যারা বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করছে তাদের স্বীকৃতি প্রদান করা।

৫. শিল্প কারখানায় উৎপাদিত পণ্য ও তাদের মান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরী করে। পণ্য সম্পর্কিত তথ্য উপাত্ত স্থানীয় ও আন্তজাতিক ক্রেতাদের জন্য সহজলভ্য করা।

৬. শিল্পে উৎপাদিত পণ্য দেশে বিদেশে অনলাইন বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বাজার পরিধি বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সুযোগ সৃষ্টি করা।

৭. বিশ্বব্যাপী অ্যামাজন এর মতো প্লাটফর্ম পণ্যসামগ্রী বিশ্বময় ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই সুযোগটা গ্রহণ করা প্রয়োজন –

 

* মেধাসম্পদ সৃষ্টি, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা

১। জোরালো পদক্ষেপ এর মাধ্যমে কপিরাইট ও মেধাসত্ব আইনকে যুগোপযোগী করে সংশোধন করতে হবে।

২। কপিরাইট আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইন ও প্রশাসনকে আরো কার্যকর ও একনিষ্ঠ করতে সরকারের সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরকে তাগিদ দিতে হবে।

৩। কপিরাইট ও পেটেন্ট কার্যক্রম আরো, সহজ, সুন্দর ও গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

৪। কোনো আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের খবর প্রকাশিত হলে তা স্ব-প্রনোদিত হয়ে যাচাই বাছাই করে পেটেন্ট বা কপিরাইট নিবন্ধন করার বিধান যুক্ত করতে হবে।

৫। সমন্বিত শিল্প যেমন, গান, চলচ্চিত্র যেসব শিল্পের সৃষ্টিতে একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্টান জড়িত তাদের রয়ালিটি বা স্বত্ব নির্ধারণের জন্য সোসাইটি বা কাউন্সিল গঠন করতে হবে।

৬। বহুমাত্রিক শিল্পে রয়ালিটি নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং পদ্ধতিতে বিশেষ সেটেলমেন্ট একাউন্ট চালু করতে হবে। যাতে হিস্যা অনুযায়ী রয়ালিটির অর্থ প্রকৃত দাবীদারদের ব্যাংকের মাধ্যমে বিলি বন্টন করা যায়।

৭। চিত্রলিপি বা বুদ্ধিভিত্তিক পণ্য রফতানীর ক্ষেত্রে করপ্রক্রিয়া শিথিল করতে হবে।

৮। বুদ্ধিভিত্তিক পণ্য ও ব্যবসার জন্য আলাদা ট্রেড এসোসিয়েশন গঠন ও পেশাজীবি পরিষদ তৈরী সহযোগিতা করতে হবে।

বাংলাদেশের কপিরাইটের আইনের দূর্বলতা প্রয়োগের অপ্রতুলতার কারণে এখানে সহজে যেকোনো মেধাগত পণ্যের নকল হয়।

* ক্রস বর্ডার ই-কমার্স

১। ক্রসবর্ডার ই-কমার্সের মাধ্যমে রপ্তানি প্রক্রিয়াকে সহজ ও ব্যয়লাঘবিত করতে বিমান, স্থল ও নৌ বন্দরে সম্মিলিত ওয়ারহাউজ ও ফুলফিলমেন্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

২। ক্রসবর্ডার ই-কমার্সের বিদেশী ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে এলসি এবং ওয়ার্কঅর্ডারের বাধ্যবাধকতা পরিহার।

৩। আমদানী ও রপ্তানির ক্ষেত্রে কাস্টম হাউজের কর্মপ্রক্রিয়া সহজ ও নিরাপদ করতে হবে।

এধরনের ফুলমিলমেন্ট সেন্টার থাকলে দ্রুতগতিতে পণ্য রপ্তানি করা যায় এবং খরচ কম হয়।

* শিল্প প্রযুক্তি

১. শিল্পের জন্য ব্যবহৃত আইটি পণ্যসেবা দেশে উৎপাদনের লক্ষ্যে অপরাপর শিল্পের সাথে সমন্বয় ও যোগাযোগ বৃদ্ধি করা।

২. শিল্প সম্পর্কিত প্রযুক্তি কাঠামো গড়ে তুলতে দেশীয় আইটি শিল্পকে প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদান করতে হবে।

৩. শিল্প প্রযুক্তিতে জনবলকে দক্ষ করে তুলতে শিল্প প্রযুক্তি বিষয়ক পাঠক্রম, প্রশিক্ষণ ও ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৪. তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে খরচ কমানোর মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ভিত তৈরী করতে হবে।

* দক্ষতা উন্নয়ন

১. সরকারী খরচে প্রদত্ত প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে। প্রশিক্ষণ পরবর্তী কার্যক্ষেত্রে নমূনা মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের কাঠামো হালনাগাদ করার শর্ত যুক্ত করতে হবে।

২. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্রমান্বয়ে গতানুগতিক ও কর্মসূযোগহীন বিভাগসমূহ সংকুচিত করতে হবে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করে। ক্রমশ এর পরিধি কমিয়ে সেখানে আধুনিক কর্মমূখী বিভাগ ও বিষয় চালু করতে হবে।

৩. শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে শিল্পের ও উৎপাদনখাতের ব্যবহারিক জ্ঞান যুক্ত করতে হবে। এর মাধ্যমে একজন শ্রমিকও যেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে সংশ্লিষ্ঠ বিষয়ে দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করতে পারে এ ধরনের পরিবেশ তৈরী করতে হবে।

৪. ৪র্থ শিল্প বিল্পবের মোকাবিলায় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে যুগোপোযোগী করে সাজাতে হবে।

৫. কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশাপাশি প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য  একটি হার্ড স্কিল ও একটি সফট স্কিল অর্জনের সুযোগ রাখতে হবে।

* অন্যান্য

দেশে বিক্রি বিদেশী আয়: রপ্তানিমুখী ই-কমার্সে অনাবাসী বাংলাদেশীরা যেসব সেবা ক্রয় করে থাকে সেসব সেবার বিপরীতে বৈদেশিক মূদ্রা অর্জিত হলেও কখনো কখনো এসব সেবা দেশের সীমা অতিক্রম করে না। সেক্ষেত্রে এই আয়কে রপ্তানি অথবা রেমিটেন্স হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

ডেলিভারী বাইক: ই-কমার্সের পণ্য ডেলিভারীর জন্য সারাবিশ্বে মোটর বাইকে ১৬/১৬/১৬ সাইজের পণ্য পরিবহন বক্স অনুমোদিত হলেও বাংলাদেশে এটি অনুমোদিত নয়। এই বাক্স অনুমোদনের মাধ্যমে একদিকে যেমন বিশেষ ধরনের মোটরবাইক প্রস্তুত করে মোটর বাইক শিল্পে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও সহজ ডেলিভারী ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের বক্স ব্যবহারের মাধ্যমে যে ঝুঁকি তৈরী হচ্ছে তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।

পর্যটনমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা: পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের জন্য সড়ক, নৌ, সেতু ও রেলপথ নির্মাণ ও উন্নয়ন পর্যটন এলাকা ও রুটভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরী ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

সড়ক ব্যবস্থাপনা: ভবিষ্যত শিল্প, শিল্প সংক্রান্ত পরিবহন ও সহযোগী শিল্প বিকাশ প্রক্রিয়া ঝামেলামুক্ত করতে এখনি জাতীয় মহাসড়কের বুক থেকে ৩০০ ফিট, আন্তশহর মহাসড়ক থেকে ২৫০ ফিট, আন্তজেলা মহাসড়ক থেকে ২০০ ফিট, আন্ত উপজেলা মহাসড়ক থেকে ১০০ ফিট এবং অন্যান্য সড়কের বুক থেকে ৬০ ফিটের মধ্যে বৃহৎ ও স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করতে হবে।  শিল্প ও কৃষিপণ্য সর্বোপরী পণ্য পরিবহনে সড়ক ব্যবস্থায় অদৃশ্য খরচ বন্ধ করা জরুরী। যদি বন্ধ করা সম্ভব না হয় তাহলে এটিকে একটি পদ্ধতিগন কাঠামোর মধ্যে এসে শৃংখলা বিধান করা প্রয়োজন।

ডিজিটাল ক্যাটালগ: বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্য সেবার ছবি ও বিবরণসহ অনলাইন ও প্রিন্টেড প্রোডাক্টস ক্যাটালগ তৈরী করা প্রয়োজন।

সমন্বিত নীতিমালা: আইসিটি নীতিমালা ও ডিজিটাল কমার্স নীতিমালার অনুরুপ একশন প্লান উক্ত নীতিমালার সাথে যুক্ত করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী করনীয় এবং সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরের সংযোগের বিষয়টি উল্লেখিত থাকলে কাজের গতি আসবে।

কাস্টম সেবা: পণ্য আমদানী রপ্তানীর ক্ষেত্রে কাস্টমসের কালক্ষেপন, হয়রানি, পণ্য হারিয়ে যাওয়া বিষয়গুলোতে সেবার মান উন্নয়ন না করলে সরকারের নীতি পলিসিসমূহের সুফল শিল্প উদ্যোক্তারা ভোগ করতে পারবেন।  কাস্টমস এর সার্ভার ডাউন থাকার কারণে সেবা বন্ধ থাকলে যে ক্ষতি হয় এই সমস্যার সমাধানের উন্নত সার্ভার ব্যবহার করতে হবে অথবা সার্ভার বন্ধকালীন বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে অথবা এ সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply