bd, cow, Land, agro

বাংলাদেশের ভূমিহীন ও আশ্রয়হীতা থেকে উত্তরণের পথ

বাংলাদেশের ভূমিহীন আশ্রয়হীণ মানুষের সংকট থেকে উত্তরণের পথ: করণীয় নীতিগত দিকনির্দেশনা

বাংলাদেশে ভূমিহীন ও আশ্রয়হীণ মানুষের সংকট কেবল ব্যক্তিগত দারিদ্র্য বা অর্থনৈতিক অক্ষমতার ফল নয়; এটি দীর্ঘদিনের ভূমি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, জনসংখ্যাগত চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন, এবং নীতিগত ব্যর্থতার সম্মিলিত পরিণতি। ভূমিহীন মানুষ মানে শুধু জমির মালিকানা না থাকা নয়—বরং নাগরিক অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া একটি জনগোষ্ঠী।

এই সংকট থেকে উত্তরণে দাতাভিত্তিক বা প্রকল্পনির্ভর ক্ষণস্থায়ী উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দীর্ঘমেয়াদি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।

 

. ভূমি সংস্কার ভূমি প্রশাসনের মৌলিক পুনর্গঠন

বাংলাদেশের ভূমিহীনতার মূল সমস্যা লুকিয়ে আছে ভূমি ব্যবস্থার বৈষম্য, দলিল জটিলতা ও দখল সংস্কৃতিতে।

করণীয়:

  • ডিজিটাল ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে (Digital Land Cadastre) সম্পূর্ণ ও স্বচ্ছ করা
  • খাস জমির পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি ও অনলাইনে প্রকাশ
  • ভূমি আদালত ও ট্রাইব্যুনালে ভূমিহীনদের জন্য ফ্রি লিগ্যাল এইড সেল
  • ভূমিহীন সমিতি প্রতিষ্ঠার নীতি ও অনুমোদন।
  • ভূমি নীতি ও  সংক্রান্ত অর্থ ব্যবস্থাপনার নীতিমালা তৈরী।
  • আবাসন নীতি তৈরী করে অপরিকল্পিত নগরায়ন রোধ।
  • এক ব্যক্তি বা পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ ভূমি মালিকানা সীমা কার্যকরভাবে প্রয়োগ
ক্ষেত্র ঢাকা অন্য সিটি পৌর এলাকা গ্রামে চর বা

নিচু

বন্ধকী বাণিজ্যিক

ভবন

পরিবার কোম্পানী
ফ্লাট ১০ হাজার বফ ১৫ হাজার বফ ২০

হাজার বফ

অনুমোদন

সাপেক্ষে

সদস্য সংখ্যার সমানুপাতিক

সংখ্যানুসারে

সদস্য সংখ্যা অনুসারে

সমানুপাতিক

জমি ৫ কাঠা ১০ কাঠা ১৫ কাঠা ৫০ কাঠা ১০০ কাঠা ৫০০

কাঠা

অনুমোদন

সাপেক্ষে

 

  • একটি নির্দিষ্ট সীমার বেশী ভূমি ও জায়গা থাকলে তাদের জন্য বাড়তি কর রাখতে হবে।
  • ভূমিপতিদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক হারে ভূমি সামাজিক কাজের জন্য অধিগ্রহণ

ক) জমি ও ফ্লাট জায়গা

ক্ষেত্র সীমা ১ সীমা ২ সীমা ৩ সীমা ৪ সীমা ৫ সীমা ৬ সীমা ৭
ফ্লাট

সীমা

১০-১৫ হাজার বফ ২% ১৬-৩০ হাজার বফ ২.৫ % ৩১-৫০ হাজার বফ ৩% ৫১-৭৫ হাজার বফ  ৩.৫% ৭৬-১০০ হাজার বফ ৪% ১শ-১৫০

হাজার বফ ৪.৫

১৫০+

হাজার বফ ৪.৫

 

 

জমি ৫০ কাঠার বেশী হলে ২% ১০০ কাঠার বেশী হলে ৩% ৩০০ কাঠার বেশী হলে ৪% ৪০০ কাঠার বেশী হলে ৪.৫% ৫০০ কাঠার বেশী হলে ৫%  

 

দ্রষ্টব্য:  ভূমি সংস্কার ছাড়া ভূমিহীনতা ও দারিদ্র নিরসন কেবল কাগজে-কলমে রয়ে যাবে।

. খাস জমির ন্যায্য বণ্টন দখলমুক্তকরণ

বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ একর খাস জমি থাকলেও তার বড় অংশ প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক দখলদার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কবলে

করণীয়:

  • খাস জমি দখলদারদের বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ফাস্টট্র্যাক আদালত
  • ভূমিহীন পরিবারভিত্তিক খাস জমি বন্দোবস্তে জাতীয় মানদণ্ড (criteria-based allocation)
  • নারীকেন্দ্রিক ভূমি মালিকানা (মহিলা প্রধান পরিবারের নামে জমি)
  • পরিবারের সম্মতিতে সমান অধিকার বন্টনের অসিয়ত নামা রেজিস্ট্রেশন চালু।
  • দূর্নীতিবাজদের জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে ভূমিহীনদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা।

👉 খাস জমি এবং রাষ্ট্রের অর্থ লুট করে অর্জিত জমি এবং বেদখলকৃত সরকারী জমি যদি ভূমিহীনের কাছে না যায় বা সুষম বন্টন ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার না হয়। তাহলে তবে রাষ্ট্রের ভূমির নৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

. আশ্রয়ন প্রকল্পকে পুনর্গঠন: ঘর নয়, জীবন নিশ্চিত করা

বাংলাদেশে আশ্রয়ন প্রকল্পসহ বিভিন্ন গৃহায়ন উদ্যোগ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো বাসস্থান দিলেও জীবিকা দেয় না

করণীয়:

  • আশ্রয়ন প্রকল্পকে livelihood-linked housing model এ রূপান্তর
  • প্রতিটি পুনর্বাসন এলাকায়:
    • আশ্রয়ন প্রকল্প সংলগ্ন কর্মসংস্থান জোন
    • আশ্রয়ন প্রকল্প সংলগ্ন স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র
    • আশ্রয়ন প্রকল্প সংলগ্ন বাজার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
    • আশ্রয়ন প্রকল্পে গাছ লাগানো।
  • শহরমুখী ভূমিহীনদের জন্য ভাড়াভিত্তিক সামাজিক আবাসন (social rental housing)

মনে রাখতে হবে,  শুধু ঘর দিলে মানুষ বাঁচে না; ঘরের চারপাশে জীবন থাকতে হয়।

. জলবায়ু বাস্তুচ্যুতদের জন্য আলাদা ভূমি পুনর্বাসন নীতি

বাংলাদেশে প্রতিবছর নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতায় লক্ষ লক্ষ মানুষ নতুন করে ভূমিহীন আশ্রয়হীণ হচ্ছে।

করণীয়:

  • Climate Displaced Persons Act প্রণয়ন
  • উপকূলীয় ও নদীভাঙন কবলিত মানুষের জন্য:
    • অভ্যন্তরীণ পুনর্বাসন করিডোর
    • বহুতল গ্রাম (cluster village)
  • জলবায়ু অভিযোজন তহবিল সরাসরি ভূমিহীন পুনর্বাসনে ব্যবহার

জেনে রাখা ভাল যে, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের উপেক্ষা মানে ভবিষ্যতের সামাজিক বিস্ফোরণকে আমন্ত্রণ জানানো।

. শহুরে ভূমিহীন বস্তিবাসীদের জন্য নগরভিত্তিক সমাধান

ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ বড় শহরগুলোতে ভূমিহীনতা নতুন রূপ নিয়েছে—বস্তি, ফুটপাতবাসী, ভাসমান মানুষ

করণীয়:

  • উচ্ছেদ নয়, in-situ slum upgrading
  • বস্তিবাসীদের জন্য:
    • অস্থায়ী ঠিকানার আইনি স্বীকৃতি
    • পানি, স্যানিটেশন ও বিদ্যুৎ
  • নগর ভূমি ব্যাংক (Urban Land Bank) গঠন

েউল্লেখ্য, শহর যদি শ্রম নেয়, তবে শহরকে আশ্রয়ও দিতে হবে।

 

. সামাজিক নিরাপত্তা ভূমিহীনদের জন্য অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি

ভূমিহীনতা দীর্ঘস্থায়ী হয় মূলত অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে

করণীয়:

  • ভূমিহীনদের জন্য:
    • নগদ সহায়তা (cash transfer)
    • কাজের বিনিময়ে খাদ্য ও নগদ
  • ঠিকানাবিহীনদের জন্য ডিজিটাল আইডেন্টিটি ব্যাংকিং অ্যাক্সেস
  • ভূমিহীন যুবকদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তহবিল

শুধু ভূমি নয় কর্মসংস্থান ও জীবিকাও মানুষের জন্য দরকারী।

 

. রাজনৈতিক সদিচ্ছা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

সবশেষে, ভূমিহীনতা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়—এটি নীতির ফল

প্রয়োজন:

  • ভূমিহীনতাকে “দয়া নয়, অধিকার” হিসেবে স্বীকৃতি
  • জাতীয় নির্বাচনী ইশতেহারে ভূমিহীন পুনর্বাসন বাধ্যতামূলক বিষয়
  • গণমাধ্যম ও শিক্ষাব্যবস্থায় ভূমি ন্যায়বিচারের আলোচনা।

সামাজিক সচেতনতা ও সকল নাগরিক এর জন্য নূনতম ভূমি নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশে মানুষ ১ জনের ভাগে মোট আবাদী বা চাষযোগ্য জমি কত? আমরা সে হিসেবটা করতে চািই। প্রথমে দরকার:

  1. দেশের মোট চাষযোগ্য/আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ

  2. দেশের মোট মানুষ (জনসংখ্যা)

  3. নদী, বন, পাহাড় ইত্যাদি বাদে শুধুমাত্র চাষযোগ্য বা বাসযোগ্য জমি ধরে হিসাব করা হয়।

মোট আবাদযোগ্য/চাষযোগ্য জমি (বাংলাদেশ)

  • সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট আয়তন প্রায় ১ কোটি ৪৯ লাখ ২১ হাজার হেক্টর এবং এর মধ্যে আবাদযোগ্য/চাষযোগ্য জমি প্রায় ৮৮ লাখ ১৭ হাজার হেক্টর (৮৮.১৭ লাখ হেক্টর) বা প্রায় 59% জমি আবাদযোগ্য বলে বলা হয়।   অর্থাৎ আবাদযোগ্য জমি ≈ 8.8 মিলিয়ন হেক্টর (8,817,000 হেক্টর) 1 হেক্টর = 10,000 বর্গমিটার, সুতরাং 8,817,000 হেক্টর = 88,170,000,000 বর্গমিটার

মোট জনসংখ্যা বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৬৫ লাখ (165 million) এর কাছাকাছি (২০২৫-এর আনুমানিক হিসাব)। (যদিও ঠিক সংখ্যাটা সরকারিভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, আমরা আধুনিক আনুমানিক ১৬৫ মিলিয়ন ধরি)।

 একজন মানুষের ভাগে চাষযোগ্য জমি কত?

ফরমুলা:

প্রতি জনের জমি=মোট আবাদযোগ্য জমি (বর্গমিটার)জনসংখ্যা\text{প্রতি জনের জমি} = \frac{\text{মোট আবাদযোগ্য জমি (বর্গমিটার)}}{\text{জনসংখ্যা}} =88,170,000,000165,000,000≈534 বর্গমিটার= \frac{88,170,000,000}{165,000,000} \approx 534\, \text{বর্গমিটার}

 অর্থাৎ প্রতি মানুষ আনুমানিক ~৫৩০–৫৪০ বর্গমিটার চাষযোগ্য/আবাদযোগ্য জমি পায়, যদি নদী, বন-পাহাড় ইত্যাদি বাদ দেওয়া হয় ও শুধু চাষযোগ্য জমি ধরা হয়।  একই হিসাব যদি হেক্টরে করি

প্রতি জনের ভাগে আবাদযোগ্য জমি ≈

8,817,000 হেক্টর165,000,000≈0.0534 হেক্টর/জন\frac{8,817,000\, \text{হেক্টর}}{165,000,000} \approx 0.0534\, \text{হেক্টর/জন}

 মানে আরও সহজভাবে ~0.05 হেক্টর/জন, বা
প্রতি জন ≈ 534 বর্গমিটার।
এটা FAO/World Bank-এর হিসাবেও প্রায় মিলছে (~0.046–0.048 হেক্টর/জন) যা 2023-এ হিসাব করা হয়েছিল।

বিষয় মান (প্রায়)
মোট আবাদযোগ্য/চাষযোগ্য জমি ~8.8 মিলিয়ন হেক্টর (৮৮ লাখ হেক্টর)
বাংলাদেশ জনসংখ্যা (2025 আনুমানিক) ~165 মিলিয়ন
প্রতি মানুষের ভাগে চাষযোগ্য জমি ~0.05 হেক্টর ≈ 530-540 বর্গমিটার

অর্থাৎ, বাংলাদেশে একজন মানুষের মালিকানায় (ব্যক্তিগত হিসেবে না হলেও দেশের হিসাব অনুযায়ী) প্রায় ৫৩৪ বর্গমিটার চাষযোগ্য/আবাদযোগ্য জমি পড়ে। বা ৮ কাঠার মতো।

. ভূমি দাতাদের স্বীকৃতি ও কররেয়াত এর ব্যবস্থা করা

ভূমির সুষম বন্টন ও ভূমিপতিতের ভূমি থেকে গরিবদের হিস্যা দিতে ভূমি অনুদান হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। আশ্রয়প্রকল্প, সরকারী অবকাঠামো ও দরিদ্র মানুষকে ভূমি দান করলে তাদের জন্য বিশেষ প্রনোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

যেমন

  • প্রকল্প সংলগ্ন রাস্তার নাম বা কোনো ভবনের নাম ভূমি মালিকের নামে হবে।
  • প্রদানকৃত জমির দামের উপর একটি নির্দিষ্ট হার ও পরিমানে কর রেয়াত।
  • সরকারী কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভূমি প্রদান করলে বিশেষ খেতাব।

 

. ভূমিহীনতার সমন্বয়

যাদের ভূমি নেই এবং যাদের ভূমি আছে তাদের জন্য সরকার কিছু সমন