বাংলাদেশে নৈতিক চর্চার সংকট: কথা ও কাজের অমিল
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
গণমাধ্যমে প্রতিনিয়িত সম্পাদকীয় কলাম প্রকাশের মাধ্যমে নীতি-নৈতিকতা ও আইন-বিচারের পক্ষে শত শত কলাম ও সম্পাদকীয় লেখা হয়, কিন্তু খুব কমই তারা নিজেরা তা করে দেখাতে পারে । প্রতিদিন অসংখ্য টকশোতে নীতি নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বাস্তবে, তারা যা বলে তা করার জন্য নিজেদের কোনো কার্যক্রম থাকে না। সামাজিক অনুষ্ঠানও আড্ডায় দেশের ও ভিন্ন মানুষের অপরাধকে ঘৃণামূলক সমালোচনা করা হয়। কিন্তু সৎ ও কাজের লোকদের জন্য সেভাবে প্রশংসা ও সহযোগিতা করা হয় না। মসজিদে, জুমার খুৎবায়, মন্দিরে, ওয়াজে, কীর্তনে, গীর্জায়, প্যাগোডায় নানা নীতিকথা আলোচনা করা হয়। কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো সামাজিক উদ্যোগ নেয় না, যে কিভাবে মানুষ তা চর্চা করবে। রাজনীতিবিদেরা সারাবছর নানা নীতিকথা বলে দূর্ণীতির বিষয় দেখলে দেখা যায় সমাজে অপরাধের সূচনা ও অপরাধ জিইয়ে রাখার ক্ষেত্রে তারা আগুয়ান, আমলা, পুলিশ ও বিচারকেরা দেশে নীতি কায়েম এর জন্য কাজ করে। কিন্তু জনগন কার্যক্ষেত্রে দেখে যা তাদের সিংহভাগ লোকেই আসলে নীতিহীন। আর এটাই আমাদের মূল সমস্যা। যার কারণে আমরা সে চক্র থেকে বের হতে পারছিনা।
বাংলাদেশের জনজীবনে নীতি ও নৈতিকতার আলোচনা যেন কখনোই কমে না। প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায়, কলামিস্টদের লেখায়, টেলিভিশনের টকশোতে, সামাজিক আড্ডায়, ধর্মীয় উপাসনালয়ের বয়ানে—সর্বত্র নীতি, নৈতিকতা, আইন ও ন্যায়বিচারের কথা উচ্চারিত হয়। কথার দিক থেকে দেখলে মনে হয়, আমরা একটি গভীরভাবে নীতিবোধসম্পন্ন সমাজ। কিন্তু বাস্তবতার আয়নায় তাকালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক ভয়াবহ বৈপরীত্য—নীতি নিয়ে কথা আছে, কিন্তু নীতির চর্চা নেই; উপদেশ আছে, কিন্তু উদাহরণ নেই।
ক) গণমাধ্যম: নৈতিকতার ভাষণ, কিন্তু আত্মসমালোচনার অভাব
প্রতিদিন অসংখ্য সম্পাদকীয় ও কলামে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তীব্র ভাষা ব্যবহার করা হয়, ন্যায়বিচারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া হয়। অথচ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরেই অনেক সময় স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতার ঘাটতি স্পষ্ট। যাঁরা নিয়মিত নৈতিকতার পাঠ দিচ্ছেন, তাঁদের বড় একটি অংশ নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে সেই নীতির প্রয়োগ ঘটাতে ব্যর্থ। ফলে নৈতিক ভাষ্য অনেক সময় বিশ্বাসযোগ্যতা হারায় এবং সাধারণ মানুষের কাছে তা নিছক বক্তৃতায় পরিণত হয়।
খ) টকশো সংস্কৃতি: কথা যত, কাজ তত নয়
টেলিভিশনের টকশোতে প্রতিদিন নীতি-নৈতিকতা, দুর্নীতি, সুশাসন নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচকরা রাষ্ট্র, সমাজ ও জনগণের জন্য করণীয়ের তালিকা তুলে ধরেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই আলোচকদের নিজেদের জীবনে বা সামাজিক পরিসরে নৈতিকতার পক্ষে কী দৃশ্যমান উদ্যোগ রয়েছে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আলোচনা শেষ হয় স্টুডিওতেই; বাস্তব কোনো কার্যক্রম বা দায়বদ্ধতা তৈরি হয় না।
গ) সামাজিক আড্ডা: অপরাধ ঘৃণা, কিন্তু সৎ মানুষ উপেক্ষিত
সামাজিক অনুষ্ঠানে, চায়ের আড্ডায় বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় আমরা অন্যের অপরাধ, দুর্নীতি ও ব্যর্থতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করি। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সমাজে যারা সৎ, পরিশ্রমী ও নৈতিকভাবে দৃঢ়—তাদের জন্য প্রশংসা, সহযোগিতা বা প্রণোদনার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। ফলে সমাজে একটি উল্টো বার্তা ছড়িয়ে পড়ে—অপরাধ আলোচিত হয়, সততা উপেক্ষিত থাকে।
ঘ) ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান: নীতিকথা আছে, সামাজিক প্রয়োগ নেই
মসজিদের জুমার খুৎবা, মন্দিরের উপদেশ, ওয়াজ-মাহফিল, কীর্তন, গীর্জা বা প্যাগোডা—সবখানেই নৈতিকতার কথা বলা হয়। সততা, ন্যায়, সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই এমন সামাজিক উদ্যোগ নেয়, যেখানে মানুষ শিখতে পারে কীভাবে দৈনন্দিন জীবনে সেই নৈতিকতা চর্চা করা যায়। উপদেশ দেওয়া হয়, কিন্তু অনুশীলনের কাঠামো তৈরি হয় না।
ঙ) রাজনীতি: নীতিকথা ও বাস্তবতার নির্মম সংঘর্ষ
রাজনীতিবিদদের ভাষণে নীতি ও আদর্শের কথা বছরের পর বছর শোনা যায়। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, সমাজে অপরাধের সূচনা ও টিকে থাকার পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা একটি বড় কারণ। নৈতিকতার বুলি আর ক্ষমতার চর্চা—এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান এতটাই গভীর যে সাধারণ মানুষের আস্থাই ভেঙে পড়ে।
চ) প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা: দায়িত্ব আছে, আস্থা নেই
আমলা, পুলিশ ও বিচারকদের দায়িত্ব দেশের নীতি ও আইন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু জনগণের অভিজ্ঞতা বলছে, এই ব্যবস্থার বড় একটি অংশ নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত। ঘুষ, পক্ষপাত ও ক্ষমতার অপব্যবহার ন্যায়বিচারের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। ফলে নীতি প্রতিষ্ঠার প্রতিষ্ঠানগুলোই অনেক সময় নীতিহীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
মোট কথা:
বাংলাদেশে নীতি-নৈতিকতা নিয়ে কথার অভাব নেই—অভাব আছে নৈতিক সাহসের, আত্মসমালোচনার ও বাস্তব প্রয়োগের। যতদিন না ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সব স্তরে কথা ও কাজের মিল ঘটবে, ততদিন নৈতিকতা থাকবে বক্তৃতার মঞ্চে, বাস্তব জীবনে নয়।
নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে প্রয়োজন নিজেদের আয়নায় তাকানো—অন্যকে শেখানোর আগে নিজে করে দেখানো। নচেৎ নৈতিকতার সব কথাই থেকে যাবে অর্থহীন শব্দে সীমাবদ্ধ।

