বাংলাদেশের পর্দাপ্রথা: ধর্মীয় নির্দেশনা নাকি সামাজিক বাস্তবতা
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
(এই রচনা কোনো পক্ষপাতিত্ব নয়; কেবল একটি সামাজিক প্রথার ইতিহাস, বিকাশ ও বর্তমান রূপ বিশ্লেষণ)
মুসলিম ভ্রমণকারী ইবন বতুতাহ (Ibn Battuta) ভারতে এবং মালদ্বীপে কাজীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি তার গ্রন্থ আল রিহলাতে লিখেছেন ১৩৩৭ সালে লিখেছেন যে, মালদ্বীপের থাকা কালীন তিনে দেখেছেন অনেক নারীরা তখন মাথা বা শরীরের ওপরের অংশ ঢাকা পরিধান করতেন না। তারা শুধু কোমর থেকে নিচের দিকে স্কার্ট এর মত পরতেন। তাদের শরীরের উপরের অংশ কোনো পোশাক দ্বারা আবৃত থাকতো না।
বতুতাহ আরও লিখেছেন যে, যখন তিনি কাজী ছিলেন সেখানে, তিনি নারীদেরকে শরীরের উপরের অংশ ঢাকা রাখার আদেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটি কার্যকর করতে পারেননি — অর্থাৎ, ‘কানুন জারি করার’ মত চেষ্টা ছিল, কিন্তু সফল হয়নি।
যুগে যুগে মুসলিম দেশগুলোতে ইসলাম এবং পর্দা একসাথে আসেনি। এটা বলা যায়। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।
বাংলাদেশে পর্দা বা নারীর আড়াল থাকার সংস্কৃতি অনেক পুরোনো এবং বহুস্তরীয়। ইসলামী শরীয়তের নির্দেশনা যেমন রয়েছে, তেমনি সামাজিক বাস্তবতা, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবও এই প্রথাকে গড়ে তুলেছে। ফলে আজকের দিনে বাংলাদেশে প্রচলিত পর্দা—কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতিফলন নয়, বরং সামাজিক-অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ফলাফল।
প্রাচীন সময়ের অবস্থা
বাংলার গ্রামীণ সমাজে অতীতে অধিকাংশ মুসলিম নারীই কৃষিকাজ, গৃহস্থালি ও পারিবারিক কাজে সমানভাবে অংশগ্রহণ করতেন। তাদের জন্য কঠোর পর্দা পালন প্রায় অসম্ভব ছিল। অনেক পরিবারে এক কাপড়েই নারীকে সারাদিন থাকতে হতো। নামাজের জন্য আলাদা কাপড় রাখার মতো সামর্থ্যও ছিল না। ফলে তখনকার বাস্তবতা ছিল—নারীরা গৃহের ভেতরে-ভেতরে শালীন থাকলেও বাইরে কাজ করতে গেলে তারা প্রকাশ্যেই আসতেন।
পর্দাপ্রথার বিস্তারে ঐতিহাসিক ভূমিকা
উনিশ শতকে মাওলানা কারামাত আলী জৈনপুরী ও জৈনপুরের সিদ্দিকী পরিবার বাংলায় পর্দাপ্রথা প্রচারে বড় ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলে তাদের প্রভাবে নারীরা ধীরে ধীরে আলাদা পোশাক ব্যবহার ও বাইরে বেরোতে হলে ঢেকে থাকার প্রথা শুরু করেন। পাকিস্তান আমলে এসে বোরখা বা আলাদা পর্দার কাপড় ধনী ও শিক্ষিত পরিবারের মধ্যে জনপ্রিয় হতে থাকে। এরও আগে ধনী পরিবারগুলোর নারীরা পালকি, বজরা কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে বাইরে যেতেন, যেটি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই অভিজাতত্বের প্রতীক ছিল।
সুফি প্রচারক ও প্রাথমিক ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলায় ইসলাম প্রচারকারীরা মূলত সুফি দরবেশ ও আউলিয়া ছিলেন। তারা মানুষের হৃদয়ে ঈমান জাগানো, কালেমা শিক্ষা দেওয়া এবং আল্লাহভক্তি প্রচারে মনোযোগী ছিলেন। নারীর জন্য পর্দা পালন তাদের শিক্ষায় ততটা প্রাধান্য পায়নি। বরং আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও মানবিকতা ছিল মূল বিষয়। ফলে সমাজে প্রথমদিকে কঠোর পর্দার পরিবর্তে সাধারণ শালীনতা ও ঘরে থাকার প্রথাই গ্রহণযোগ্য ছিল।
ফরায়েজি আন্দোলন ও শরয়ী সচেতনতা
ব্রিটিশ আমলে হাজী শরীয়ত উল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলন বাংলার মুসলমানদের ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত করে। নামাজ, রোজা, শরীয়ত পালনের পাশাপাশি নারীদের শালীনতা নিয়েও আলাপ ওঠে। তবে সে সময়ও গ্রামীণ সমাজে পর্দা পালন সীমিত ছিল। পরবর্তী সময়ে কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা এবং তাবলিগ জামায়াতের বিস্তারের ফলে মুসলিম সমাজে বোরখা, নেকাব ও হিজাবের প্রচলন বাড়তে থাকে।
পর্দার দুই রূপ: ধর্মীয় ও সামাজিক
বাংলাদেশে আজ পর্দাকে দুইভাবে দেখা যায়—
১. ধর্মীয় বা শরয়ী পর্দা:
কোরআন-হাদিসের নির্দেশ মান্য করে পালন করা হয়। এখানে আবার নানা স্তর দেখা যায়—
-
ফরজ পর্দা (আবশ্যকীয়)
-
সুন্নতি পর্দা
-
ফতোয়াভিত্তিক বা মাযহাবভেদে ভিন্ন ব্যাখ্যা
-
রক্ষণশীল ধারার পর্দা
-
কট্টর রূপ (যেমন পূর্ণ শরীর ঢেকে ফেলা, মুখসহ)
২. সামাজিক বা সাংস্কৃতিক পর্দা:
যেটা পরিবার, সমাজ বা পরিবেশের চাপে বা সুবিধার কারণে গড়ে ওঠে। অনেক নারী নিজে স্বপ্রণোদিত হয়ে করেন, আবার অনেকে পরিবার বা স্বামীর চাপে করেন।
পোশাক ও পর্দার বহুমুখিতা
বাংলাদেশে পর্দার বহিঃপ্রকাশ পোশাকনির্ভর।
-
শাড়ি ও ঘোমটা: বহুদিন ধরে প্রচলিত প্রথা, বিশেষ করে গ্রামে।
-
সালোয়ার-কামিজ: পাকিস্তান আমল থেকে জনপ্রিয় হয়।
-
বোরখা, হিজাব, নেকাব: আধুনিককালে শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে।
-
ফ্যাশনেবল পর্দা: আঁটসাঁট পোশাকের সঙ্গে হিজাব বা রঙিন ও স্টাইলিশ বোরখা, যেটাকে অনেকে প্রকৃত পর্দা বলে মানতে চান না।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আবার আলাদা ধারা দেখা যায়—ইরানে মাথা ঢাকা বাধ্যতামূলক হলেও মুখ খোলা থাকে, আফগানিস্তানে পূর্ণ শরীর ঢাকা চাদর, আর দক্ষিণ এশিয়ায় ওড়না বা শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢাকার প্রথা।
সামাজিক চাপ ও ব্যক্তিগত পছন্দ
বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই পর্দা হলো সামাজিক নিয়ম মানার উপায়। কেউ যদি পরিবার বা সমাজের প্রত্যাশিত নিয়ম না মানেন, তবে সমালোচনার শিকার হন। আবার অনেক নারী আছেন যারা ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে আন্তরিকভাবে পর্দা করেন। আর কেউ কেউ শুধুমাত্র নিরাপত্তা বা সুবিধার কারণে হিজাব ব্যবহার করেন। তাই এক কথায় বলা কঠিন—কারো পর্দা ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে, কারোটা সামাজিক কারণে।
আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন
অর্থনৈতিক উন্নয়ন নারীর পোশাক ও পর্দাচর্চায় বড় ভূমিকা রেখেছে। একসময় দরিদ্র পরিবারে আলাদা নামাজের কাপড় ছিল না। এখন অনেক পরিবারে আলাদা কাপড়, বোরখা, হিজাব রাখা সম্ভব হচ্ছে। শিক্ষিত নারীরা কর্মস্থলে যাওয়ার সময় পর্দাকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করেন। আবার চাকরিজীবী নারীরা অনেক সময় শুধু মাথার কাপড় দিয়েই ‘পর্দা’ বোঝান।
বাংলাদেশের পর্দাপ্রথা একক কোনো কারণে তৈরি হয়নি। ধর্মীয় নির্দেশনার পাশাপাশি সামাজিক রীতি, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, ঐতিহাসিক প্রভাব ও পারিবারিক সংস্কৃতির মিলেই এই প্রথা গড়ে উঠেছে। কারও কাছে এটি ইবাদতের অংশ, কারও কাছে সামাজিক চাপ মেনে চলা, আবার কারও কাছে কেবল নিরাপত্তা ও সুবিধার বিষয়।
ভবিষ্যতেও এই প্রথা সমাজের পরিবর্তন, নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রভাবে রূপ বদলাবে। তবে এটুকু নিশ্চিত যে—বাংলাদেশের পর্দাপ্রথা শুধু শরীয়ত নয়, বরং সমাজ ও সংস্কৃতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।
ছবি: আল কোরআন একাডেমী লন্ডন এর কোরআর বিতরণ এর ছবি

