Mango Rajshahi

শিবগঞ্জের আম খেয়ে জুড়ায় প্রাণ

শিবগঞ্জের আম খেয়ে জুড়ায় প্রাণ

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

আমের কি বাহারী নাম! ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, খিরসাপাত, অরুনা, আম্রপালি, মল্লিকা, সুবর্নরেখা, মিশ্রিদানা, নিলাম্বরী, মতিচুর, কালীভোগ, কাঁচামিঠা, আলফানসো, বারোমাসি, গোলাপবাস, তোতাপুরী, কারাবাউ, গোপাল খাস, কেন্ট, কাঞ্চন, সূর্যপূরী, পাহুতান, ত্রিফলা, হাড়িভাঙ্গা, ছাতাপরা, গুঠলি, লখনা, আদাইরা, কলাবতী ও আম রূপালি।

এখানে শেষ নয় আছে বউ ভুলানি, বৃন্দাবনি,  কইতরী, কদলিভোগ, দাদভোগ, গোড়ভোগ, ফুনিয়া, দিলশাদ, কেঊই সাউই,  খোসাল, সিন্দুরি, খুদি গোলাপ খাস, দেওভোগ, মেম পছন্দ, নওয়াব পছন্দসহ এমনি প্রায় আটশ’ প্রজাতির আমগাছ ছিল আমাদের দেশে। বাকীনামগুলো লেখার শেষে বলছি।

মজার একটা তথ্য দিয়ে শুরু করা যাক এই যে, লোকেরা হিমসাগর বলে। আসলে হিমসাগর বলতে আমাদের দেশে কোনো আম নেই। যে আমটিকে হিমসাগর বলা হয় এটি আসলে খিরসাপাত বা খিরসাপাতি। হিমসাগর ভারতীয় একটি আামের জাত এটি খিরসাপাতের মতো দেখতে। কিন্তু বাংলাদেশের খিরসাপাত আমের স্বাদই আলাদা। স্বাদের দিক থেকে চাপাই এর খিরসাপাতের সাথে অন্য এলাকার খিরসাপাতের পার্থক্য রয়েছে আর হিমসাগরের সাথে মিল থাকারতো প্রশ্নই উঠে না।

আরো মজার কিছু তথ্য বলা যাক, বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশী এবং স্বাদের আম হয় চাপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে। এখানে পদ্মা এবং মধুমতির অববাহিকায় আমের স্বাদই আলাদা। এটা চট করে সবাই বুঝতে পারবেনা। যারা আম ভালবাসে তারা ধরতে পারবে। আম গাছের বয়স যত বেশী হবে সে গাছের আম তত স্বাদ হবে। কোনো আম গাছপাকা স্বাদ কোনো আম আবার গাছ থেকে নামিয়ে ঘরে পাকালে সবচেয়ে বেশী মজা। শিবগঞ্জে আছে আমের জাদুঘর বা ম্যাংগো মিউজিয়াম এখানে ২শ বছরের পুরনো আমগাছ দেখতে পাওয়া যায়। এখানে বিলুপ্ত্রপায় আমের নানা জাত। এই তথ্যগুলো জানতে পেরেছি গত ১২ ও ১৩ জুন শিবগঞ্জ ম্যাংকো প্রসেসিং কো-অপারেটিভ অ্যাসোসিয়েশন এর আমন্ত্রণে এবং সুইস কন্টাক্টকের সহযোগিতায় ই-ক্যাবের ব্যবস্থাপনায় অনলাইন আম ব্যবসায়ীদের সাথে শিবগঞ্জে ভ্রমণের সময়।

(চলছে আমের ভূগোল, ব্যাকরণ আর ইতিহাস পাঠ)

আমের ব্রান্ডিং, অনলাইন বিক্রি বাড়ানো এবং আমসম্পর্কে বিশেষ করে শিবগঞ্জের আম সম্পর্কে অনলাইন তথা ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের জানাতে এই সফর ঠিক করা হয়েছিল অনেকে আগে। ই-ক্যাব থেকে আমি এবং নাজমুল এটা সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলাম। আমাদের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন ই-ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট শিপন ভাই।

প্রথমদিন বিমান ও কারযাত্রা শেষে হোটেল থেকে বিশ্রাম নিয়ে আমরা সরাসরি চলে যাই বাগানে। এখানে আম ও আমগাছ দেখি, ছবি তুলি আর আমের ইতিহাস ভুগোল ব্যাকরণ শিখি শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রসেসিং কো-অপারেটিভ অ্যাসোসিয়েশন সেক্রেটারী শামীম ভাই’র কাছ থেকে। এখানে জানতে পারি শিবগঞ্জের আম ব্যবসার ইতিহাস সম্পর্কে, জানতে কাটিমন আম ও ম্যানহাইট গাছ সম্পর্কে। কিভাবে তারা এক বছরের মধ্যে গাছে আম ফলান সেটাও দেখতে পাই।

(প্রদর্শনীর জন্য রাখা পোলাপবাস আম। এখনো পাকেনি। নতুন নাম শুনেছিলাম কইতরী। নিয়ে এসেছিলাম কিন্তু ছবি তোলা হয়নি। )

শামীম ভাই জানালেন এখন থেকে ১২ মাস শিবগঞ্জের আম পাওয়া যাবে। অফসিজনে আমের আমদানী নির্ভরতা কমে যাবে। দেখলাম বর্তমানে অনেক চাষী আধুনিক পদ্ধতিতে ব্যাগের মধ্যে আমছাষ করেন। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি আমকে ব্যাগের মধ্যে রেখে বাইরের পোকা ও ময়লা থেকে রক্ষা করে সুন্দর কিছুটা লালচে রাখা হয়। ফলে এই আমগুলো বিদেশে রপ্তানী করা যায়। দেশেও অনেক শৌখিন মানুষ এই আমগুলো চান।  

এখানে ইথিনিল চেম্বার পদ্ধতিতে আম সংরক্ষণ ও পাকানো সম্পর্কে জানতে পারি। এই পদ্ধতি স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ। এটা ছিল শামীম ভাইর বাগান।

পরে আমরা আরেকটা বাগানে যাই। এই বাগানটি বেশ বড় এবং বৈচিত্রময়। এখানে অনেক বেশী জাতের আমগাছ ও আম ছিলো। একটি গাছে তারা বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রায় ১০ প্রজাতির আমের ফলন দেখালেন। লাল রংয়ের বিশেষ আমগুলো সকলের দৃষ্টি কেড়েছিল। এভাবে নাকি ২শ প্রজাতির আমও এক গাছের মধ্যে চাষ করা যায়। প্রকৃতি এবং বিজ্ঞান এই দুয়ে মিলে আমাদের অনেক সমৃদ্ধ করছে প্রতিনিয়ত।

(এই গাছটিতে ১০ রকমের আমের ফলন করেছেন কলম পদ্ধতির মাধ্যমে)

আগের বাগানে তিনি বিভিন্ন জাতের আম খাইয়ে আমাদের আপ্যায়ন করিয়েছিলেন। এখানে কিন্তু আমের সাথে আমের আঁচার, আমসত্ত্ব, তিলের ট্রপি, পাটিসাপ্টা আরো নানা রকমের বিকেলের নাস্তা পরিবেশন করা হলো। সেগুলো আবার স্থানীয় নারী উদ্যোক্তাদের তৈরী। তারা কাঁচামরিচ দিয়ে মাখানো কাঁচা আমের শরবত খেতে দিলেন। তবে আমি আশা করেছিলাম পাটিসাপটা আমের হবে। সেটা হয়নি। আমের পাটিসাপ্টা রেসিপিটা মন্দ হয়না। ভাবছি নিজেই বানাবো কিনা।

(আমের গায়ে পোশাক পরিয়ে ভদ্রআম চাষ করা হয় বিদেশী ভদ্রলোকদের জন্য। দেশী ভদ্রলোকেদের পছন্দ। দাম একটু বেশী,  এই যা।

(প্যাকেট আমের পোশাক সরালে এমন দেখায়)

প্রচন্ড গরমে যেন এক পশলা প্রশান্তি ছিলো সে শরবত। সবাই ১/২ গ্লাস করে খেলেন কিন্তু আমি এক বোতল সাথে নিয়ে নিলাম। কারণ গরমে প্রচন্ড ঘাম হয়েছে। শরীর থেকে অনেক লবণ ও পানি বেরিয়ে গেছে। সেগুলোর ঘাটতি পূরণ করতে হবে। এসব বিষয়ে লজ্জা পাওয়ার বোকামি আমি করতে চাই না। তবে আমি আবার নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেয়ার জন্য সেখান থেকে কিছু কেনাকাটাও করেছি। তারা চাপাইয়ের বিখ্যাত এবং সুন্দর সব নকশীকাঁথা নিয়ে এসেছিলেন।

এখানে একটি মজার ঘটনা শেয়ার না করে পারছিনা। আমি আমসত্ব কিনেছিলাম ২ প্যাকেট। আর তিলের টপিগুলো আমার খুব পছন্দের। আমি দেখলাম অনেকে খাচ্ছে। এগুলো বেশী ছিল না আমি কিনে নিলে অনেকে খেতে পারবেনা সেজন্য আমি সেগুলো আর কিনিনি। সেকথা আমি তাদের বলেছিও। কিন্তু বাসায় এসে আমি যখন আমসত্বের প্যাকেট খুললাম। সেখান থেকে অনেকগুলো তিলের টপি বেরিয়ে এলো। মানে সবাই খাওয়ার পর যেগুলো ছিলো সেগুলো আমার আপুরা আমার প্যাকেটে দিয়ে দিয়েছেন। এ ধরনের গোপন উপহার সব সময় রোমাঞ্জকর ও আনন্দদায়ক সেটা যত ছোট হোক না। তাদের কারো সাথে যোগাযোগ নেই। তবে এই লেখার মাধ্যমে সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাখলাম।

(বঙ্গবন্ধু লাইভ ম্যাংগো মিউজিয়াম এর ফটক)

সন্ধ্যায় আমাদের মত বিনিময় সভা ছিলো আমচাষী ও স্থানীয় লোকদের সাথে। ৭০ জনের মতো আমচাষী, বাগানমালিক, আড়ৎদারের সাথে সভায় যোগ দিয়েছেন সুইস কন্টাক্ট এর কর্মকর্তারা, সাথে ছিলেন শিবগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা ভূমি প্রশাসক। তারা স্থানীয় ইতিহাস ঐতিহ্য, আম চাষ ও ব্যবসার সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা জানালেন। আমাদের সাথে থাকা ই-ক্যাব, লাচালডাল, দারাজ, একশপ, লালসবুজ, রাখালী, দিনরাত্রি, ইউনিমার্ট, স্বপ্ন, মেরিডিয়ান, প্রাণ, ফসল, স্টেডফাস্ট, অন্যকিছু ও আগোরার প্রতিনিধিগণ তাদের কথা শুনেছেন এবং সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে একসাথে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

রাতে খাবার ভালই ছিল। ও একটা কথা বলা হয়নি। দুপুরে কিন্দু আমরা মটকা বিরিয়ানী খেয়েছিলাম আয়োজকদের কল্যাণে আর পরেরদিন দুপুরে ছোট মাছের চচ্ছড়ি দিয়ে আপ্যায়িত হয়েছিলাম।

লেখক

নির্বাহী পরিচালক: ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)

সাধারণ সম্পাদক: বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply