Cleves, History of Failure, Gov

বক্ষ বিভাজিকা প্রদর্শন: ফ্যাশন নাকি সংস্কৃতির অবক্ষয়?

বক্ষ বিভাজিকা প্রদর্শন: ফ্যাশন নাকি সংস্কৃতির অবক্ষয়?

‘‘কে যেন বলেছিল আগের দিনে জমিদারেরা গরিবের মেয়েদের নাচ আর শরীর দেখতো পয়সা দিয়ে জলসাঘর আর বাইজিখানায়। এখন তাদের মেয়েরা বিনে পয়সায় টিকটক ইউটিউবে নেচে আর শরীর দেখিয়ে বিনে পয়সায় তা উসুল করে দিচ্ছে।’’ এটা একটা ব্যঙ্গ হতে পারে হতে পারে পুরনো মানসিকতার প্রকাশ। কিন্তু আসলেই নারীর শরীর এবং ক্লিভেজ দেখানো আধুনিকতা নাকি অপ সংষ্কৃতি?

আধুনিক সমাজে “বক্ষ বিভাজিকা” বা ক্লিভেজ প্রদর্শন যেন এক নতুন ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। সামাজিক পরিসরে বা ফ্যাশন দুনিয়ায় এমন একটি অঘোষিত বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে—দেখাতে হবে, না হলে পিছিয়ে পড়তে হবে। অথচ প্রকৃত শিক্ষা, মেধা ও জ্ঞানের সংমিশ্রণ থেকে যে অন্তর্গত সৌন্দর্য বিকশিত হয়, সেটাই মানুষের আসল সৌন্দর্য। পোশাক কেবল বাহ্যিক রূপকে ফুটিয়ে তোলে, কিন্তু ব্যক্তিত্বের গভীরতা আসে মনন, মূল্যবোধ ও নৈতিক শক্তি থেকে। বাংলাদেশে একসময় সিনেমায় যা দেখা যেতনা তা এখন সাধারণ ঘরের মেয়েদের ফেসবুক পোস্ট করা ছবিতে দেখা যায়। এই পরিবর্তন সমাজকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এটা আধূনিকতার ছাপ নাকি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন।

যারা আধুনিকতার নামে যেকোনো পোশাক গ্রহণ করতে চান। তারা কি যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্টি এখনো নগ্ন জীবন যাপন করেন। তাদের মতো হতে পারবেন। নাকি তারা তাই চান। হ্যাঁ সেটা তাদের সংষ্কৃতি হতে পারে। সেটাকে আমরা তাদের সংষ্কৃতি হিসেবে চিন্তা করে স্বাভাবিক মনে করি। তাহলে আমাদের দেশের সমাজ সংষ্কৃতিতে যা আছে সেটা আমাদের জন্য স্বাভাবিক অন্যটা নয়। আমি বাংলাদেশ এবং ভারত দুদেশের কথা বলছি।

বাংলাদেশে ভারতে মুসলিম নারীরা বোরকা ও অন্যান্য দেশীয় পোশাক পরেন। হিন্দু নারীরা এলাকা ভিত্তিক নানা পোশাক পরেন। কোনো আদিবাসী বা ট্রাইভ ব্যতিত ক্লিভেজ দেখানো পোশাক স্বাভাবিক কিনা এ নিয়ে সম্প্রতি কলকতায় এক বাঙালী ফেসবুকে এক নারীর শাড়ী পরা ছবি যাতে তিনি ক্লিভেজ দেখাচ্ছিলেন তা পোস্ট দেন। সেখানে সব মন্তব্যকারী তাকে সমর্থন করেন। এবং একজন আক্ষেপ করে লিখেন যে পুজোর সময় কিছু কিছু কমবয়সী মেয়েদের মাঝে বুকের শুধু একপাশে শাড়ী রাখার প্রবণতার কথা বলেন।

ক্লিভেজ প্রদর্শনের ব্যাপারটাকে কেউ আত্মবিশ্বাসের প্রদর্শণ মনে করে। আবার কেউ করে ব্যাপারটা তার উল্টো। এটি আসলে এক ধরনের জ্ঞানভিত্তিক অযোগ্যতাকে ছাপিয়ে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ ও নিজেকে প্রদর্শণ করার কৌশল। চলুন একটা পর্যালোচনা করা যাক বিষয়টি।

বিষয়টি পর্যালোচনা করা যাক 

বক্ষ বিভাজিকা প্রদর্শনকে এখন “স্টাইল” হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। সিনেমা, সোশ্যাল মিডিয়া, মডেলিং কিংবা উৎসব—সব জায়গায় এ যেন এক অব্যক্ত প্রতিযোগিতা। অথচ সংস্কৃতির গভীরে গেলে দেখা যায়, নারীর পোশাক ছিল সৌন্দর্যকে মর্যাদার সঙ্গে প্রকাশ করার মাধ্যম, প্রদর্শনের নয়। শাড়ি, চোলি কিংবা ব্লাউজ—সব পোশাকেরই নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য আছে। কিন্তু আজ কিছু আধুনিক নকশা ও উদ্দেশ্যমূলক প্রদর্শনের কারণে সেই পোশাকগুলো নিজস্ব মর্যাদা হারাতে বসেছে। বিশেষ করে সামাজিক উৎসব  সামাজিক মাধ্যমে কিছু স্বগোষিত আধূনিক মেয়েদের এ ধরনের পোশাক আগ্রাসন বেশীরভাগ নারীকে বিব্রত করছে।

সমাজের দ্বিমুখী মানসিকতার কথাও কেউ বলছেন। তারা বলেন, আশ্চর্যের বিষয় হলো, সবাই দেখছে কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহসী মানুষ খুব কম। সমাজে যেটুকু আপত্তি শোনা যায়, তা-ও অনেকে উপেক্ষা করে “মাই বডি, মাই চয়েস” বলে চুপ করিয়ে দেয়। অথচ পোশাকের মূল লক্ষ্য শরীর আড়াল করা, নয়ত অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রদর্শন করা নয়। একজন লিখলেন যে, প্রশ্ন হলো—আসলে কে বেশি উলঙ্গ?  যে মানুষ সম্পূর্ণ পোশাক পরেও শরীরের সংবেদনশীল অংশ প্রদর্শনের সুযোগ রাখছে? নাকি যে পুরো নগ্ন হলেও অন্তত শরীরের গোপন অংশগুলো আড়াল করেছে? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সমাজের ভেতরে লুকানো সাংস্কৃতিক সংকটকে সামনে আনে।

তবে যেখান এই প্রবণতাগুলো শুরু হয়েছে সেটা বিশ্লেষণ করা যেতে পারে

প্রথমত: নাটক সিনেমা থেকে

প্রতিষ্ঠিত ধারণা হলো নাটক সিনেমা বিনোদনের জন্য আর নারীর শরীর পুরুষের কাছে বিনোদনের উপাদান। তাই বাণিজ্যিক ছবিতে বিনোদনি উপাদান থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এভাবে শুরু হলো। তারপর যারা নায়িকা হতে চায় বা সঙ্গীত অন্যান্য শিল্পে আছে। তাদের মধ্যে ছড়াল। তারপর এটা সাধারণ উচ্চ বিত্তদের হয়ে মধ্যবিত্ততে এসে পড়ল।

দ্বিতীয়ত: নিজেকে  আধুনিক স্মার্ট ও ফ্যাশন সচেতন দেখানো

মানুষ যেহেতু বাড়ি ঘর কিংবা টাকার বস্তা সাথে করে নিয়ে দেখাতে পারে না। দেখানো যায়না। তাই মানুষ পোষাক দিয়ে নিজেকে ধনী আধুনিক ফ্যাশন সচেতন দেখায়। এই ৩ শ্রেণীর মানুষের একটা অংশের মধ্যে পোশাকের কৌশলে শরীর দেখানোর প্রবণতা আছে। তা সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে।

তৃতীয়ত: নারীবাদ ও পোশাকের স্বাধীনতা

নারীর সমান অধিকার? পোশাকের ক্ষেত্রে কেন নয়। পুরুষের উন্মুক্ত বক্ষ যদি দেখানো যায় নারীর কেন এত বাঁধা। তারাও কিছুটা দেখাক। তাছাড়া কি কোন পোশাক পড়বে এটা ব্যক্তি স্বাধীনতা।  এ ধরনের ধারণা ছড়িয়ে পড়ায় এই প্রবণতা বাড়ছে।

যখন পোশাক তার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে কেবল প্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে যায়, তখন সেটি সংস্কৃতির অবক্ষয়ের লক্ষণ। শাড়ি বা যেকোনো পোশাক আমাদের ঐতিহ্যের গৌরবময় প্রতীক। এটিকে বিকৃত করে সমাজে এমন এক বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে বাহ্যিক প্রদর্শনই সাফল্য বা আধুনিকতার চিহ্ন। অথচ এটি কেবল একধরনের বিভ্রান্তি।

নারীর ক্ষমতায়নের নামে

নারী ক্ষমতায়নের আলোচনায় পোশাককে কেন্দ্র করে অনেক যুক্তি হাজির করা হয়। কিন্তু আসল ক্ষমতায়ন তো গলার নীচ থেকে শুরু নয়, মস্তিষ্ক থেকে শুরু হওয়া উচিত। জ্ঞান, দক্ষতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও আত্মসম্মানই আসল নারী ক্ষমতায়নের স্তম্ভ। দুঃখজনকভাবে, অনেক ক্ষেত্রে পোশাকের প্রদর্শনকে ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। এতে করে নারীর আসল শক্তি—তার মনন ও যোগ্যতা—আড়াল হয়ে যাচ্ছে।

শুধু পুজো নয়। হিন্দু বা মুসলিম নয়। সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন পার্টি পোশাক এখন ডিজাইন করা হয়। ক্লিভেজ প্রদর্শনের কথা মাথায় রেখে।

পোশাক সর্বদা মর্যাদার প্রতীক। এটি শরীর আড়াল করার পাশাপাশি ব্যক্তিত্ব ও রুচির প্রকাশ ঘটায়। কিন্তু অযথা প্রদর্শন কোনো সভ্যতার অংশ হতে পারে না। সমাজে প্রতিবাদ করার আরও অনেক সৃষ্টিশীল পথ আছে—সাহিত্য, শিল্প, আন্দোলন, গবেষণা কিংবা সামাজিক কর্মকাণ্ড। বক্ষ বিভাজিকা প্রদর্শনকে “স্টাইল” বা “নারী ক্ষমতায়নের প্রতীক” বানানোর চেষ্টাটি আসলে সংস্কৃতিকে টেনে নামানো ছাড়া কিছু নয়।
আমাদের বুঝতে হবে—আসল সৌন্দর্য মস্তিষ্ক ও মননের দীপ্তিতেই, বাহ্যিক প্রদর্শনে নয়।

দৃষ্টিভঙ্গি

পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বক্ষ বিভাজিকা প্রদর্শনকে নান্দনিকতা, আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ হিসেবে দেখা হয়।  ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে সিনেমা, মডেলিং, রেড কার্পেট ইত্যাদিতে এটি প্রতিষ্ঠিত ফ্যাশন। আর এখান থেকেই সমাজে ছড়িয়েছে। নারী স্বাধীনতা ও “My body, my choice”–এর অংশ হিসেবে পোশাককে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ধরা হয়। পশ্চিমা দেশে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কথা বিবেচনা করলে  কর্মক্ষেত্র ছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত রয়েছে। কোনো সমাজে যখন কোনো কিছু প্রচলণ হয়ে যায় তখন কিছু মানুষের প্রশ্ন থাকলেও সেগুলো আর তোলা হয় হয়না। তবুও প্রশ্ন থেকে যায় যা, যা স্বাভাবিক কর্মক্ষেত্রে অশালীন তা অন্যত্র শালীন হয়ে যায় কিভাবে।

 দক্ষিণ এশীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে সংস্কৃতি ও শালীনতার বিষয়টি মূখ্য এখানে পোশাককে মূলত শালীনতা ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তারউপর রয়েছে ধর্মীয় প্রভাব। ইসলাম, হিন্দুধর্মসহ বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষায় শরীর ঢেকে রাখা উৎসাহিত করা হয়। ফলে এখান তৈরী হয়েছে একটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। অনেকের কাছে এর নাম রক্ষণশীলতা। ফলে এর নাম হয় অশালীনতা। আর তা না হওয়ার জন্য থাকে সামাজিক চাপ। এখানে অতি প্রদর্শনকে নিন্দনীয় মনে করা হয়। পরিবার ও সমাজ সমালোচনা করে। 

প্রজন্মগ ব্যবধানের কারণে কিছু  তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা বাড়লেও প্রবীণ ও রক্ষণশীল সমাজে তা অগ্রহণযোগ্য। অন্যদিকে বাংলাদেশের সমাজে একদিকে ইংলিশ মিডিয়াম অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা এই দুয়ের বিকাশের কারণে মধ্যমপন্থীদের সংখ্যা লোপ পেয়ে পরষ্পর বিরোধী মত তথা পর্দাপ্রথা এবং ফ্যাশন সচেতনতা এই দুটোই বাড়ছে। এতে করে ভবিষ্যতের বাংলাদেশে এই দুই বিরোধপূর্ণ মতের সংঘর্ষ হবে নাকি তুরষ্কের মতো সহাবস্থান হবে তা কেবল সময়ই বলে দেবে।

এখন শরীর দেখানোর এই প্রবণতা কি সামাজিক অবক্ষণ হিসেবে দেখা হবে কিনা? এটা আসলে খুব স্পর্শকাতর একটি প্রশ্ন। আমি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ বাদ দিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বলছি। কারণ ধর্মীয় দৃষ্টিটা আমরা জানি। ইসলামের ক্ষেত্রে অন্তত হিজাব আর নেকাবের বিতর্ক থাকলেও। হিন্দু ধর্মের ক্ষেত্রে বাঙালী হিন্দু সমাজের কালচারের সাথে ক্লিভেজ দেখানোর সংষ্কৃতি সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়। এটা বোঝার জন্য একটা কথা মনে রাখতে হবে। সনাতন ধর্মে সবকিছু শাস্ত্রে লেখা হয়নি। অনেককিছুই সামাজিক রীতিনীতি এসেছে।

আমরা বলতে পারি, সে রীতি নীতি পরিবর্তনশীল। কিন্তু সেটা কখন কতটা পরিবর্তন হবে সেটা কে ঠিক করবে? এই প্রশ্নটাও ক্লিভেজ স্বাধীনতাকামীগণ তুলতে পারেন।  এজন্য অবশ্যই একটি নিরপেক্ষ দৃষ্টি তৈরীর পথ আছে। এটা নিয়ে আরেকদিন লিখব আশা করি। আর বাংলাদেশের যে পর্দা-প্রথা তার স্বরুপও আরেকটি লেখায় বিশ্লেষণ করেছি যে, এটা কতটা সামাজিক আর কতটা শরয়ী?