প্রেস রিলিজ কার্যকর করার কৌশল
লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন, বই: প্রেস রিলিজ গাইড লাইনস
ধরে নিলাম আমরা এই বইয়ের সংবাদ ও প্রেস রিলিজ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় পড়ে জেনেই গেছি যে, কিভাবে প্রেস রিলিজ লিখতে হয়? তাতেই কি ব্যাপারটা পূর্ণতা পেল? আমি সুন্দর নির্ভুল একটা পিআর লিখে পাঠালেই কি ল্যাঠা চুকে গেল? সুন্দর ভাষা আর সঠিক কাঠামো দেখে সম্পাদক তার দশ হাজার টাকার কলাম ইঞ্চির জায়গা আমার জন্য খরচ করে ফেলবেন? সব সময় ব্যাপারটা এতটা সুখকর নাও হতে পারে। সুন্দরী নারী দেখে প্রেমে না পড়ার মতো। আসুন আমরা এই পর্যায়ে সে বিষয় গুলো নিয়ে আলোচনা করব যেগুলো মাধ্যমে একটি পিআর যথাযথ ভাবে প্রকাশের পথ উন্মুক্ত হবে।
সঠিক বিষয়ে পিআর:
পাঠকের কাছে প্রেস রিলিজ যেহেতু একটি সংবাদের মতোই। আর সম্পাদক সাহেবও পাঠকের চোখ দিয়ে বিষয়টি দেখার চেষ্টা করবেন। কারণ গুরুত্বহীন অপ্রযোজনীয় পিআর পাঠকের বিরক্তি বাড়াতে পারে এবং সংবাদপত্রের মানকে প্রশবিদ্ধ করতে পারে। তাই পিআর এর বিষয়টি পাঠকের আগ্রহের জায়গা হতে হবে অথবা পাঠকের জন্য উপকারী হতে হবে অথবা পাঠকের কাছে পরিচিত কোনো ইস্যু নিয়ে হতে হবে যাতে পাঠক সংবাদটির সাথে নিজের কোনো সম্পর্ক খুঁজে পায়। এটা আপনার পিআরকে প্রথমেই কয়েকধাপ এগিয়ে নিয়ে যাব। যেমন, সিরাজগঞ্জে হোম ডেলিভারী নিয়ে যাত্রা শুরু করল গ্রামীণ ফ্রেন্ডস ডট কম’’ এটা সিরাজগঞ্জের জন্য একটা ভাল খবর।
কাল থেকে শুরু হচ্ছে দেশী অনলাইন শপিং উৎসব। এটা ঢাকার পত্রিকায় ছোট করে প্রকাশ করবে। কারণ এটা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য থাকলেও পাঠকের আগ্রহ থাকতে পারে।
কিন্তু, চালডাল ডট কম এ যুক্ত হলো আফগানী জাফরান। এটা খুব বড় খবর নয়। এমনটাতো হতেই পারে। আবার যদি এভাবে হয় এখন থেকে একশপ বিক্রি করবে রোহিঙ্গা নারীদের হস্তশিল্প। এটা কিন্তু খবর হয়ে গেলে। আগের পিআরটা ছাপা হওয়ার সম্ভাবনা ৫% পরেরটা ৭৫%।
নির্ভুল পি আর:
ধরলাম আপনি খুব ভাল বিষয়ে পিআর লিখেছেন। সংবাদ মাধ্যম এটা লুফে নিবে যেমন, ৩০০০ টাকা মিলবে ওয়ালটনের স্মার্টফোন, অথবা ২৩ টাকায় অনলাইনে মিলবে টিসিবি’র পেয়াজ। এগুলো ভাল খবর। ৩০০০ টাকায় সাধারণত স্মার্টফোন পাওয়া যায়না। আর বাজারে পেয়াজের দাম ৫০ টাকা। কিন্তু দেখা গেলো। এতেও দেখার আছে। বাক্যগুলো ঠিকভাবে অর্থ প্রকাশ করছেনা। প্রচুর বানান ভুল কিংবা কাঠামো অনুসারে লেখা না হলে পিআর ছাপা হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। আপনি যদি ৩০০ সংবাদ মাধ্যমে পাঠান। সবকিছু ঠিক থাকলে যদি ২৫০টি পত্রিকায় ছাপতো এখন এটাকে এডিট করে বা আলাদা করে নিউজ করে ছাপলো ২০ টি পত্রিকা। এটা হয়তো অনেকবেশী সংবাদমূল্যের কারণে হয়েছে। যদি এরকম হতো কাল থেকে দেশে উৎপাদিত গুড়োদূধ বাজারজাত করবে মিল্কভিটা তাতেও ভাল জায়গা পাবে। কিন্তু এমন হয় বইয়ের পসরা নিয়ে নতুন অনলাইন উদ্যোগ দূরবীন ডট কম। বা রকমারিতে পাওয়া যাবে স্কুলের বই খাতা। তাহলে কিন্তু ধরে নিন কারো ঠেকা পড়েনি এটা এডিট করে সময় ব্যয় করে ছাপতে।
সঠিক সূত্র ব্যবহার:
একটা পিআর এর অনেকগুলো সূত্র থাকে। প্রথমত এটি কে পাঠাচ্ছে। ই-ক্যাবের পঞ্চবার্ষিক সম্মেলন কাল থেকে। এই সংবাদ ই-ক্যাব দপ্তর থেকেই পাঠাতে হবে। ই-ক্যাবের মেম্বার প্রতিষ্ঠান বা সরকারী দপ্তর থেকে নয়। এছাড়া এটাতে কারো তথ্য বা উদ্বৃতি থাকলে সেগুলো যথাযথ ব্যক্তির হতে হবে। এই পিআরে ই-ক্যাব দপ্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে নাম পদবি স্বাক্ষর নিশ্চিত করে পাঠাতে হবে। অবশ্যই সবার শেষে স্বাক্ষরকারীর বা অন্য একজনের ফোন নাম্বার ও ই-মেইল আইডি থাকতে হবে যাতে আরো কোনো তথ্য প্রয়োজন হলে সংবাদমাধ্যম থেকে ফোন দিয়ে জেনে নিতে পারে।
আরেকটি বিষয় হলো, প্রিন্টেড কপি হলে এটা প্রতিষ্ঠানের লেটারহেডে যাবে। এমনকি সফটকপি বা ই-মেইল হলেও টেক্স আকারে মেইল বডিতে দেয়ার পাশাপাশি লেটার হেডে পিডিএফ ভার্সন দিতে হবে। প্রফেশনাল মেইল সিস্টেম ব্যবহার করে মেইল পাঠানো উত্তম। যে মেইল আইডি থেকে পিআর পাঠানো হবে তা যেন ইয়াহু গুগল তা হয়। এটা প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ই-মেইল হয়।
অন্যান্য:
এর বাইরেও কয়েকটা বিষয় অতি গুরুত্বপূর্ন। বাজারে কোম্পানীর দূর্নাম থাকলে সংবাদ পত্র সে প্রতিষ্ঠানের পিআর ছাপতে চাইবেনা। প্রতিষ্ঠানের মালিক বা যিনি পিআর পাঠাচ্ছেন তার সাথে সম্পর্ক ভাল থাকলে পিআর ছাপা হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুন বেড়ে যাবে। কারণ পত্রিকার আজকের পাতাটা ভরাব জন্য সংবাদ নির্বাচনের ক্ষমতা সম্পাদক বা বার্তা সম্পাদকের বা বিভাগীয় সম্পাদকের। তাই তিনি চাইলে কিছু পিআর বাদ দিতেই পারেন।
উপহার পিআর ছাপা হওয়া খুব ভাল উপায়। দেখাগেল বাংলাদেশে একটি কোম্পানী নতুন একটা ল্যাপটপ বাজারে নিয়ে আসলো। তারা এ উপলক্ষ্যে ব্রান্ড লোগো দিযে কিছু টি শার্ট বা পেনড্রাইভ তৈরী করলো এবং পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদককে সেগুলো উপহার হিসেবে পাঠালো। উপহার পেতে কার না ভাল লাগে। তিনি যদি ৩টি পিআর সিলেক্ট করে থাকেন আগামী কালকের পত্রিকার জন্য। একটি তাদেররটা হতেই পারে। অথবা আজকাল পত্রিকার অনলাইন ও প্রিন্ডেড ভার্সন আলাদা হয়। তাই তিনি প্রিন্টেড সংস্করনে দিতে না পারলেও দেখা গেল অনলাইনে দিতে পারেন। তবে প্রথমসারির পত্রিকার কাছে আগে প্রেস রিলিজ এর সংবাদমূল্য তারপর পিআর। এমন অনেক থাকতে পারেন যিনি হয়তো কোনো উপহারই গ্রহণ করেন না।
সময়:
কখন ঘটনা ঘটল? আর কখন পিআর পাঠানো হলো। এটা একটা অতি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। ঘটনা ঘটার ১০ মিনিটের মধ্যে পাঠানো পিআর আর ১০ ঘন্টার মধ্যে পাঠানো পিআর এর গ্রহনযোগ্যতা আকাশ-পাতাল ব্যবধান হবে। পিআর ছাপা হওয়া সম্ভাবনা ৩০-৫০% কমে যাবে।
স্মার্ট কনটেন্ট ও প্রাযুক্তিক সহজিকরণ
আপনি যখন কোনো পিআর পাঠাবেন সেটা ছাপানোর জন্য যত বেশী ঝামেলা পত্রিকা অফিসকে পোহাতে হবে, তত সেটি ছাপা হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। কারণ পত্রিকার বার্তাকক্ষে প্রতিটি সেকেন্ড খুব গুরুত্বপূর্ন। ছাপানো পত্রিকার ক্ষেত্রে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অবশ্যই সংবাদ সম্পাদনা করে মেকাপ সেরে প্লেট তৈরী করতে হবে। আবার অনলাইন পত্রিকা বা ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার ক্ষেত্রে সবার আগে সঠিক সংবাদটি সাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তাই এই বিশাল কর্মযজ্ঞে আপনার সংবাদ বিজ্ঞপ্তি যদি সংবাদ কর্মীদের সময় নষ্ট করে তাহলে সেটা সাইড টেবিল কিংবা বাতিল বাক্সেও চলে যেতে পারে।
তাই, আপনি পিআরটি অন্তত তিনটি টেক্সে এবং তিনটি করে ফরম্যাটে পাঠাবেন। পত্রিকার প্রিন্টিং ভার্সনের জন্য বিজয় কী-বোডের সুতন্বী ফন্টে, অনলাইন ভার্সন এর জন্য ইউনিকোডে, এবং ইংরেজী পত্রিকার জন্য ইংরেজী পাঠাতে ভুলবেন না। অবশ্যই মেইল বডি, ওয়ার্ড ফাইল ও পিডিএফ দিবেন। ফাইল খুব বেশী বড় হওয়ার আশংকা না থাকলে পিডিএফ করার আগে আরটিএফ বা রিচ টেক্সট ফরম্যাটও করে দিতে পারেন। সংশ্লিষ্ট ছবি দেখে বিষয়টা পরিষ্কার না হলে পিআর এর নিচে ব্রাকেটে ফটো ক্যাপশন লিখে দিতে পারেন। আর ছবি অবশ্যই ওয়ার্ড বা পিডিএফ ফাইল না দিয়ে আলাদা ইমেজ আকারে পাঠাবেন। ফাইলের নামটাও যেন বিষয় সংশ্লিষ্ট হয়।
যদি আপনার পিআর ছাপা হয়। আপনি খুশিতে গদ গদ হয়ে সব ভুলে গেলে চলবেনা। আপনি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পিআর হলে ছোট গিফট পাঠাতে পারেন। আর অবাণিজ্যিক পিআর হলে কোনো মেইল এসএমএস বা ফোন সংশ্লিষ্ট সংবাদ মাধ্যম বা ব্যক্তিকে ধন্যবাদ জানাতে পারেন। অবশই প্রিন্ট্রিং পত্রিকার একাধিক কপি কিনবেন। আর সংবাদটির অনলাইন লিংক আপনার প্রতিষ্ঠানের পেইজ ও গ্রæপ থেকে শেয়ার করবেন। এতে সংবাদ মাধ্যম খুশি হবে। আপনার গ্রæপ পেইজ থেকে পাঠক আসলে ভবিষ্যতে আপনার পিআর ছাপার ব্যাপারে তারা যতœ বান হবে।
আশাকরি, লেখা ছাড়াও কৌশলগত বিষয়সমূহে নজর রাখবেন। কারণ আপনিতো চাইবেনই বেশী পত্রিকায় আপনার পিআরটি প্রকাশিত হোক। বেশী মানুষ দেখুক। বেশী পাঠক পড়–ক আর বেশী ব্যাক লিংক তৈরী হোক।
অবশ্যই পিআর এর সাথে ছবি পাঠাবেন। সম্ভব হলে ভিডিও কিংবা ভিডিও লিংক পাঠাতে পারেন। এই বিষয়ে অন্য অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও সংশ্লিষ্ট ছবি
একসময় সংবাদটাই ছিল মূখ্য। তারপর ক্ষেত্রবিশেষে সংবাদের সাথে ছবি যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে ছবি ছাড়া সংবাদ চিন্তাই করা যায়না। ছবি না থাকলেও প্রতীকি ছবি বা সিম্বল ব্যবহার করা হয় এবং ফ্যাকশীট বা ইমেজ সংগ্রহ বা কোলাজ করে ছবি ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি সংবাদের সাথে যেমন ছবি চাইই চাই।
প্রতিটি পিআর এর সাথেও ছবি চাই। আজকাল ছবিকে এতটাই শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শুধু একটা ছবিই হতে পারে একটা সংবাদ। ছবি কখনো ক্যাপশন সহ হয় কখনো ক্যাপন ছাড়া হয়। আজকাল ছবিকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয় ক্যাপশন এর প্রয়োজন হয়না।

