প্রস্তাবিত ডিজিটাল বাণিজ্য আইন ২০২৩ খসড়ার বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন

প্রস্তাবিত ডিজিটাল বাণিজ্য আইন ২০২৩ খসড়ার বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন

প্রস্তাবিত ডিজিটাল বাণিজ্য আইন ২০২৩ খসড়ার বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন

নিকট অতীতে ই-কমার্স সেক্টরে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল তার আলোকে আইনের প্রশ্নটি এসেছে। যদিও কথিত প্রতারণাকে এই খাতের লোকজন ভিন্নভাবে দেখেন। তারা মনে করেন কিছু ছদ্মবেশী ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার করে এক ধরনের জাল জুয়াচুরির ফাঁদ পেতে হাজার কোটি টাকার লোপাটের ধান্ধা করেছে। ছদ্মবেশী বলা হয় এই কারণে যে, তারা যে বিজনেস মডেলে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছে এটা ই-কমার্স রেভিনিউ মডেল ছিল না। সারা দুনিয়ার কোথাও এটাকে ই-কমার্স রেভিনিউ মডেল বলা হয়না। কেউ পুঞ্জি স্কিম, কেউ বিনিয়োগ স্কিম, কেউ এমএলএম স্কিম কেউবা অন্যকোনো ভাবে কাজটা করেছে।

যাই হোক, বিভিন্ন সূত্র থেকে এই বিষয়ে আইনের প্রস্তাব এসেছিল। বিগত ২০২১ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ই-কমার্স আইন বিষয়ক একটি কমিটিও গঠিত হয়েছে। এই কমিটি ৬টি সভা করার পর এই বিষয়ে আইনের প্রয়োজন নেই বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। কিন্তু উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনার কারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চলতি বছর (২০২৩) সালে এই আইন নিয়ে কাজ শুরু করে। তারা জিরো ড্রাপ্ট এর একটা প্রি ভার্সন ইতোমধ্যে প্রকাশ করেছে। এতে এমন কিছু দূর্বল, আপত্তিকর ও ব্যবসা বিদ্বেষী ধারা ছিল। যাতে এই খাতের উদ্যোক্তারা আঁতকে উঠেছিল। আসুন দেখি সেগুলো কি কি এবং কেন এগুলো সঠিক নয়।

উল্লেখ্য ইতোমধ্যে বাণিজ্য সচিব ও উচ্চ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে এই খসড়ায় যাই থাকুকনা কেন, এর পরিবর্তন করে ব্যবসা বান্ধব একটি আইন করা হবে। এই বিষয়ে সরকারের অবস্থানের কোনো হেরফের হবে না। তাই এখানে কোথায় কোথায় আপত্তির জায়গা সেটা একটু তুলে ধরতে চাই যাতে যারা এই বিষয়ে কাজ করছেন তাদের জন্য সহায়ক হয়।

কতৃপক্ষ গঠন কাঠামো

২য় অধ্যায়, ৪/১ ধারায় চেয়ারম্যান ও তিনজন পরিচালকের কথা বলা হয়েছে। বস্তুত এই খাত এত বহুমূখী ও বিশাল এখানে স্বল্প জনবল কার্যকারিতা ভাল আসবেনা। তাছাড়া তাদের যোগ্যতার বিষয়ে ই-কমার্স ধারণা বা জ্ঞানের কথা বলা হয়নি। তবে ডিজিটাল বাণিজ্য কাউন্সিল যুক্ত করা হলে সেক্ষেত্রে কতৃপক্ষের পরিচালকের সংখ্যা কম হলেও সমস্যা হবে না।

 

কতৃপক্ষের কাজ

২য় অধ্যায়, ৭/২, ( ঢ/ণ) ধারায়  কতৃপক্ষের ইতিবাচক কাজের ক্ষেত্রকে খুব সীমিত আকারে এবং ভাসা ভাসা কাজ দেয়া হয়েছে। এ ধরনের কাজের মাধ্যমে সেক্টর উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবেনা। তাছাড়া এই অধ্যায়ের ধারাগুলোতে এটা প্রতীয়মান হয়না যে, এই খাতের উন্নয়নের জন্য আইন করা হচ্ছে। বরং মনে হয় এটা একটা অপরাধ বিভাগ। এর যাবতীয় দমন ও নিয়ন্ত্রেণের জন্য এই আইন হয়েছে। মূলত এই কতৃপক্ষের নাম হওয়া উচিৎ ডিজিটাল কমার্স সম্প্রসারণ কতৃপক্ষ।

 

ডিজিটাল কমার্স নিবন্ধন

৩য় অধ্যায় ৮/১, এখানে নিবন্ধনের দায়িত্ব আরজেএসসিকে দেয়া হয়েছে। অথচ আরজেএসসি আইনে তা নেই। তাছাড়া একটি কর্তৃপক্ষ হওয়ার পর আরজেএসসিকে দায়িত্ব দেয়া যুক্তিযুক্ত নয়।

 

ভোক্তা অধিকার আইনের সাথে দ্বৈততা

৬ষ্ঠ অধ্যায় তে  বিক্রেতার জন্য পালনীয় যেসব বিধির কথা বলা হয়েছে। সেগুলো ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা অনুসরণ করে ভোক্তা অধিকার আইনের সংশোধনীতে প্রস্তাবনা আকারে যুক্ত করা হয়েছে। যেহেতু বিষয়গুলো ভোক্তা অধিকার আইনে যুক্ত হতে যাচ্ছে। তাই দ্বৈত আইনের যুক্তিকতা নেই।

ভিন্ন আইনের সূত্র

৭ম অধ্যায়, (১) এ  নতুন কোনো নির্দেশনা নেই। অন্যান্য আইনকে ও নিয়মকে দেখিয়ে তা মেনে চলতে বলা হয়েছে। যদি অন্যান্য আইন অনুসরণ করতে হয় তাহলে এই আইনের প্রয়োজন থাকেনা।

 

ক্রস বর্ডার ই-কমার্স

 

এই অধ্যায়ে ক্রস বর্ডার ই-কমার্স বিষয়ে দীর্ঘদিনের ই-ক্যাবের দাবীর কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। প্রচলিত যে ব্যবস্থা অনুসরণ করা হচ্ছে। সে ব্যবস্থায় ইতোমধ্যে ১৭টি সমস্যা ও বাঁধা চিহ্নিত করে সরকারকে অবহিত করা হয়েছে।  এখানে যেহেতু প্রচলিত পন্থ অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। তার মাধ্যমে আন্তসীমান্ত ডিজিটাল বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

 

ওয়ার হাউজ এর বাধ্যবাধকতা

এখানে ওয়ারহাউজ নির্মানের যে শর্ত দেয়া হয়েছে তা ই-কমার্স মূলনীতির পরিপন্থি। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অন্যকারো পণ্য সেবা বিপনন করে। তাই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের গুদামঘর থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে। এমনকি সকল ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের  সটিং ও ফুলফিলমেন্ট সেন্টারও থাকেনা। তাই এই শর্ত ব্যবসা বিরোধী বলা যায়।

 

কেন্দ্রীয় অভিযোগ ব্যবস্থাপনা

৮ম অধ্যায়ের বিধিতে যে সমস্যার আলোকে এবং যে সুবিধার জন্য কেন্দ্রীয় অভিযোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রনয়ন করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। তার প্রতিফলত এখানে ঘটেনি। যেহেতু এটি চালু হয়ে গেছে এবং এটি একটি ডিজিটাল প্লাটফরর্ম কারণ ডিজিটাল ব্যবসার সমস্যা সমাধানের জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তা নেয়া জরুরী। তাই এটিকে আইনের কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা দরকার। যার প্রতিফলন এখানে ঘটেনি।

 

শাস্তির বিধান

৯ম অধ্যায়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে শাস্তির বিধানগুলো এই আইনের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে না। কারণ এই আইনের উদ্দেশ্য হলো সঠিক নিয়মে ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি, প্রতারণা রোধ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ। তাই একজন ব্যবসায়ীকে ১টা অভিযোগের জন্য যদি জেলে পাঠানো হয় তাহলে তিনি বাকী ৯৯টা সঠিক কাজের মাধ্যমে ক্রেতাদের কিভাবে সেবা দিবেন।

 

 

প্রস্তাবিত খসড়ায় আরো ব্যাপক ঘাটতি, বেশকিছু বিষয়ে অসঙ্গতি এবং প্রচুর দ্বৈততা রয়েছে। তাই এই আইন আগাগোড়া পর্যালোচনা করা দরকার। এই আইনের নাম হতে পারে ডিজিটাল কমার্স কতৃপক্ষ আইন অথবা ডিজিটাল কমার্স সম্প্রসারণ আইন।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply