প্রবাসী কল্যাণে বিশেষ প্রস্তাবনাসমূহ
প্রথমে বলে নেয়া ভাল যে, এই লেখা বাংলাদেশের সরকারের প্রতি আমার ৮১টি অধ্যায়ের বিস্তারিত বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও সংষ্কার কর্মসূচীর অংশ হিসেবে লিখিত ‘‘ প্রবাসী কল্যাণ’’ অধ্যায়ের একটি অংশ। বিস্তারিত প্রস্তাবনা নিচে দেয়া গুগল লিংকে পাওয়া যাবে।
ধন্যবাদান্তে- জাহাঙ্গীর আলম শোভন
প্রবাসী বাংলাদেশীদের সম্মাননা ও সুরক্ষা কর্মসূচি
বাংলাদেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নয়নে প্রবাসী বাংলাদেশীদের অবদান অপরিসীম। এই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের জন্য একটি টেকসই সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স একটি প্রধান চালিকাশক্তি। এই অবদানকে স্বীকৃতি ও উৎসাহ দিতে একটি জাতীয় পর্যায়ের সম্মাননা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
বিশেষ প্রস্তাব ০১: “অনারারী মাদারল্যান্ড অ্যাম্বাসাডার” উদ্যোগ
প্রস্তাব করা হচ্ছে যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত সফল, সৎ ও সম্মানিত প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্য থেকে নির্বাচিত ব্যক্তিদের “অনারারী মাদারল্যান্ড অ্যাম্বাসাডার” হিসেবে মনোনীত করা হবে।
উদ্দেশ্য:
- প্রবাসে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা
- প্রবাসী সমাজকে সংগঠিত ও অনুপ্রাণিত করা
- সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমে নেতৃত্ব প্রদান
- বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক সংযোগ জোরদার করা
বৈশিষ্ট্য:
- এটি হবে সম্মানসূচক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক পদ
- সরকার কর্তৃক স্বীকৃতি ও পরিচয় প্রদান
- নির্দিষ্ট মেয়াদে দায়িত্ব পালন
বিশেষ প্রস্তাব ০২. প্রবাসী বীমা ও সামাজিক সুরক্ষা স্কিম
প্রবাসীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি নমনীয় বীমা ও অবসরভাতা স্কিম প্রস্তাব করা হচ্ছে।
(ক) নমনীয় প্রিমিয়াম ভিত্তিক বীমা:
- প্রবাসীরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অনিয়মিতভাবে প্রিমিয়াম জমা দিতে পারবেন
- বার্ষিক গড় জমার ভিত্তিতে বীমা সুবিধা নির্ধারিত হবে
- দুর্ঘটনা, মৃত্যু, অসুস্থতা ইত্যাদিতে আর্থিক সহায়তা প্রদান
(খ) রেমিট্যান্স-ভিত্তিক অবসরভাতা:
- প্রবাসীর প্রেরিত রেমিট্যান্সের ৫% প্রিমিয়াম হিসেবে গণ্য করা হবে
- অতিরিক্ত ৫% সরকার প্রণোদনা হিসেবে যোগ করবে
- মোট ১০% অর্থ একটি সঞ্চয় হিসেবে জমা হবে
- নির্দিষ্ট সময় শেষে প্রবাসীকে অবসরভাতা প্রদান করা হবে
৩. সম্ভাব্য সুফল
- প্রবাসীদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি
- বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণে উৎসাহ বৃদ্ধি
- দেশের প্রতি প্রবাসীদের সম্পৃক্ততা ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি
- আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ইতিবাচক ব্র্যান্ডিং
বিশেষ প্রস্তাব ০৩: প্রবাসী রেমিট্যান্স সম্মাননা কর্মসূচি
ক. জাতীয় পর্যায়ের “টপ রেমিটার অ্যাওয়ার্ড”
প্রস্তাব করা হচ্ছে যে, প্রতি বছর সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রেরণকারী শীর্ষ ১০০ জন প্রবাসী বাংলাদেশীকে জাতীয়ভাবে সম্মাননা প্রদান করা হবে।
উদ্দেশ্য:
- বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহ দেওয়া
- প্রবাসীদের অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া
- অন্যদের অনুপ্রাণিত করা
বৈশিষ্ট্য:
- সরকার কর্তৃক আনুষ্ঠানিক পুরস্কার ও সনদ প্রদান
- জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন
- গণমাধ্যমে প্রচার ও স্বীকৃতি
খ. জেলা পর্যায়ের রেমিট্যান্স সম্মাননা
প্রত্যেক জেলার জন্য আলাদা কোটা নির্ধারণ করে (১–১০ জন), সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রেরণকারী প্রবাসীদের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হবে।
বাস্তবায়ন কাঠামো:
- জেলা প্রশাসন (DC অফিস) তালিকা প্রণয়ন ও যাচাই করবে
- ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ভিত্তিতে নির্বাচন
- জেলা পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক সম্মাননা অনুষ্ঠান আয়োজন
৩. সম্ভাব্য সুফল
- বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি
- প্রবাসীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি
- স্থানীয় পর্যায়ে প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি
- অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা
জাতীয় ও জেলা পর্যায়ে এই সম্মাননা কর্মসূচি চালু হলে প্রবাসীদের অবদান আরও দৃশ্যমান হবে এবং বৈধ উপায়ে রেমিট্যান্স প্রেরণে একটি শক্তিশালী প্রণোদনা তৈরি হবে।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে প্রবাসী বাংলাদেশীরা একদিকে যেমন সম্মানিত ও অনুপ্রাণিত হবেন, অন্যদিকে তাদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা কাঠামো তৈরি হবে। ফলে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—তিন স্তরেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিশেষ প্রস্তাব ৪- রেমিট্যান্স যোদ্ধা দিবস
বাংলাদেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক উন্নয়নের পেছনে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য; তবুও তাদের এই অবদান অনেক সময় যথাযথ স্বীকৃতি পায় না। এই প্রেক্ষাপটে “রেমিট্যান্স যোদ্ধা দিবস” প্রবর্তনের প্রস্তাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিবসের মাধ্যমে প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে দেশের জন্য রেমিট্যান্স প্রেরণকারী শ্রমজীবী মানুষদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানো হবে এবং তাদের অবদানকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা হবে। দিবসটি পালন করলে একদিকে যেমন প্রবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বৈধ উপায়ে রেমিট্যান্স পাঠানোর গুরুত্ব ও সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া এই দিবসকে কেন্দ্র করে আলোচনা, সেমিনার, সম্মাননা প্রদান এবং নীতিনির্ধারণী সংলাপ আয়োজন করা হলে প্রবাসীদের সমস্যা, সম্ভাবনা ও অধিকার বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব পাবে। ফলে “রেমিট্যান্স যোদ্ধা দিবস” শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি প্রবাসীদের মর্যাদা বৃদ্ধি, জাতীয় ঐক্য জোরদার এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আরও বেগবান করার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
কখন হতে পারে এই দিবস: কোনো রেমিট্যান্স যোদ্থার মৃত্যুর দিবস। বিশেষ করে একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধার মৃত্যু নিয়ে ইতোপূর্বে একটি ডকুমেন্টরী বা ডকু পিকশন তৈরী হয়েছে। সেদিনটি হতে পারে।
কিভাবে পালন করা হবে: ঢাকা প্রবাসী সম্মেলন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দূতাবাসে প্রবাসী সেবা মাস ঘোষণার মাধ্যমে।
বিশেষ প্রস্তাব ৫ – ঢাকা প্রবাসী সম্মেলন : একটি মিলনমেলা
দিবসটির মূল অনুষ্ঠান হিসেবে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘প্রবাসী সম্মেলন’ আয়োজন করা যেতে পারে। এই সম্মেলন হবে শুধু অনুষ্ঠান নয়; এটি হবে একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে প্রবাসীরা তাঁদের মতামত, সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা সরাসরি সরকার ও নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরতে পারবেন। সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত সম্ভাব্য প্রবাসী, ফেরত আসা প্রবাসী, নারী প্রবাসী, এবং বিভিন্ন পেশার প্রবাসী অংশগ্রহণ করবেন।
সম্মেলনের এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে:
১. ইনভেস্টমেন্ট প্রমোট: প্রবাসীদের বিনিয়োগে দেশীয় শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন।
২. কনস্যুলার সার্ভিস: পাসপোর্ট, এনআরবি সেবা ও আইনি জটিলতা নিরসনে এক-ছাতের অধীনে সেবা।
৩. ফেরত প্রবাসীদের পুনর্বাসন ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ।
অন্যান্য বিশেষ প্রস্তাব
১) রেমিটেন্স এর পরিমাণ এর উপর বিশেষ উপাধি দিতে হবে। স্তরভিত্তিক উপাধিসমূহ ঠিক করতে হবে।
২) প্রবাসিদের জন্য বিশেষ পেনশন স্কিম চালু করতে হবে।
৩) অনাবাসী বাংলাদেশীদের জন্য আলাদা ইনভেস্ট কাউন্সিল গঠন করতে হবে। উক্ত কাউন্সিল তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের সকল বিষয় দেখভাল করবে।
গুগল ড্রাইভ লিংক: https://drive.google.com/drive/u/0/folders/1Z0-U4A_pZqGihJmhWk-6n2cdTkDrCyhI

