Police station

থানায় সাধারণ ডায়রী সহজীকরণ ও বাস্তবতা

থানায় জিডি করতে গিয়ে নাগরিক ভোগান্তি: সমস্যা, বিশ্লেষণ ও করণীয়

আমরা জানি যে, থানায় সাধারণ ডায়রী করতে গেলে এখন আর টাকা দিতে হয় না এবং এটি অনলাইনে করা যায়, বাসা থেকে করা যায় এমনকি দোকানে গেলেও অনেকে নন-অফিসিয়ালভাবে  এই সেবা দিয়ে থাকে।

কিন্তু বাস্তবে এর ভোগান্তি সম্পর্কে সে জানে যে এর ভুক্তভোগী। তারই আলোকে এই সেবাকে সহজীকরণের জন্য কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো।

বাংলাদেশে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা নাগরিকের একটি মৌলিক অধিকারভিত্তিক সেবা। কাগজে-কলমে অনলাইনে জিডি করার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে বহু মানুষ এখনও ভোগান্তির শিকার হন। ডিজিটালাইজেশনের ঘোষণা থাকলেও মাঠপর্যায়ে সেবা গ্রহণের অভিজ্ঞতা সবসময় সহজ নয়। নিচে সমস্যাগুলো ও সম্ভাব্য সমাধান একটি গোছানো প্রস্তাবনা আকারে তুলে ধরা হলো, যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিবেচনার যোগ্য।

 বাস্তব সমস্যা: নাগরিকের অভিজ্ঞতা

ক) অনলাইন জিডির জটিলতা

বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশ-এর ওয়েবসাইটে অনলাইনে জিডি করার সুযোগ থাকলেও—

  • অনেক সময় রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয় না

  • নির্দিষ্ট “রেজিস্ট্রেশন” লিংক কার্যকর থাকে না

  • সার্ভার ডাউন বা সিস্টেম ত্রুটির কারণে আবেদন আটকে যায়

  • সহায়ক হেল্পডেস্ক বা তাৎক্ষণিক সমাধানব্যবস্থা অনুপস্থিত

ফলে নাগরিককে আবার থানায় যেতে হয়।

খ) থানায় সরাসরি গেলে ভোগান্তি

  • ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়

  • “সার্ভার ডাউন” অজুহাত শোনা যায়

  • আগে হাতে লিখে জিডি করতে বাধ্য করা হতো, এখনো কোথাও কোথাও অনানুষ্ঠানিক চাপ থাকে

  • গ্রামাঞ্চলে ঘুষ বা অনানুষ্ঠানিক টাকা না দিলে বিলম্ব হয়

ডিজিটাল সেবা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবিক সেবার মান সমান হয়নি।

২. প্রস্তাবিত সমাধান কাঠামো

সমাধান ১: অনলাইন ও অফলাইন—দুই পথই সমানভাবে চালু রাখা

জিডি করার দ্বৈত পদ্ধতি থাকতে হবে।

অফলাইন সংস্কার প্রস্তাব:

  • মুদ্রিত মানসম্মত ফরম থাকবে

  • সংযুক্তি/প্রমাণক যুক্ত করার আলাদা কলাম থাকবে

  • আবেদনকারী চাইলে বাসা থেকে লিখে এনে জমা দিতে পারবেন

  • থানা কর্তৃপক্ষ পরে সেটি অনলাইনে এন্ট্রি করবে

  • অনলাইন ও অফলাইনের পৃথক সিরিয়াল নম্বর থাকতে পারে—এতে প্রশাসনিক সমস্যা নেই

এতে ডিজিটাল বিভাজনের কারণে কেউ বঞ্চিত হবেন না।

সমাধান ২: অনলাইন সিস্টেম শক্তিশালীকরণ

বর্তমান অনলাইন জিডি ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত করতে হবে।

দুটি বিকল্প—

  1. চুক্তিভিত্তিকভাবে দক্ষ বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া

  2. পুলিশের অধীনে পৃথক ও শক্তিশালী “আইসিটি ইউনিট” গঠন

এ ইউনিটের দায়িত্ব হবে—

  • সার্ভার স্থিতিশীল রাখা

  • ২৪/৭ টেকনিক্যাল সাপোর্ট

  • ডেটা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

  • নাগরিক ট্র্যাকিং সুবিধা যুক্ত করা

সমাধান ৩: প্রতিনিধিত্বের সুযোগ চালু

বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে নিজে করতে হয়। প্রস্তাব—

  • অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে জিডি করার সুযোগ

  • প্রবাসী সন্তান দেশে থাকা বাবা-মায়ের সমস্যায় অনলাইনে জিডি করতে পারবে

  • পাওয়ার অব অথরিটি/জাতীয় পরিচয়পত্র ভিত্তিক ভেরিফিকেশন যুক্ত করা

এতে সেবাটি বাস্তবিক অর্থে নাগরিকবান্ধব হবে।

সমাধান ৪: অনুমোদিত স্থানীয় জিডি এজেন্ট ব্যবস্থা

থানা এলাকায় জনসংখ্যা অনুযায়ী ৫০–১০০ জন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে।

যোগ্যতা ও কাঠামো:

  • স্থানীয় কম্পিউটার কম্পোজ/ফটোকপি দোকানি

  • অনুমোদিত “জিডি এন্ট্রি এজেন্ট”

  • সেবামূল্য: ৫০–১০০ টাকা (নির্ধারিত সীমা)

  • নিবন্ধন ফি: ৫০০ টাকা

  • বার্ষিক প্রশিক্ষণ ফি: ১০০০ টাকা

  • বছরে অন্তত ২টি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক

চাহিদা বেশি হলে সংখ্যা সীমাবদ্ধ না করলেও ফি সমন্বয় করা যেতে পারে।

সুবিধা:

  • নাগরিকের সময় বাঁচবে

  • পুলিশের কাজের চাপ কমবে

  • স্বচ্ছ ও নির্ধারিত সেবামূল্য থাকবে

  • স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে

সমাধান ৫: থানার অভ্যন্তরে সেবাকেন্দ্র (UDC মডেল)

ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার-এর আদলে থানার অভ্যন্তরে সেবা ডেস্ক চালু করা যেতে পারে।

কাঠামো:

  • সরকার দেবে শুধু জায়গা ও বিদ্যুৎ

  • অনুমোদিত সেবাদানকারী নিজস্ব ল্যাপটপ, ইন্টারনেট, আসবাব আনবে

  • ওসি প্রতি ২ বছরের জন্য নির্বাচন করবেন

  • ট্রেড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক

  • নির্ধারিত সেবামূল্য আদায়

  • ভ্যাট সরকারকে প্রদান

নিয়ন্ত্রক কাঠামো:

  • একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে বাংলাদেশ পুলিশ-কে বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রদান

  • ন্যূনতম নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণ ফি

  • বয়সসীমা: ২৮ বছরের ঊর্ধ্বে নয়

  • সর্বোচ্চ কার্যকাল: ৪ বছর

উদ্দেশ্য—এটিকে স্থায়ী পেশা নয়, বরং তরুণদের কর্মজীবনে প্রবেশের পূর্বে অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা।


৩. প্রত্যাশিত ফলাফল

এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে—

  • নাগরিক সেবা সহজ হবে

  • ঘুষ ও অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন কমবে

  • পুলিশের প্রশাসনিক চাপ কমবে

  • ডিজিটাল সিস্টেম কার্যকর হবে

  • স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে

  • সরকার রাজস্ব পাবে

জিডি একটি সাধারণ নাগরিক সেবা হলেও এটি অনেক সময় হয়রানির প্রতীকে পরিণত হয়। প্রযুক্তি আছে, কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার ও ব্যবস্থাপনা ঘাটতির কারণে সুফল আসছে না। দ্বৈত পদ্ধতি, প্রযুক্তিগত শক্তিশালীকরণ, প্রতিনিধিত্বের সুযোগ, অনুমোদিত এজেন্ট ও থানাভিত্তিক সেবাকেন্দ্র—এই পাঁচস্তর বিশিষ্ট মডেল গ্রহণ করলে জিডি সেবাকে সত্যিকার অর্থে নাগরিকবান্ধব করা সম্ভব।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply