পায়ে হেঁটে বিশ্বরেকর্ড: মহাকাব্যিক পদযাত্রা
নেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস (Guinness World Records)-এর ইতিহাসে পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণ বা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সফলভাবে পদযাত্রা (Cross-World Walk/Circumnavigation on Foot) করা মানুষের সংখ্যা হাতেগোনা। এদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, নিখুঁত ডাটা এবং একক প্রচেষ্টায় সবচেয়ে আইকনিক ও বিতর্কহীন বিশ্বরেকর্ডধারী হলেন জঁ বেলিশোঁ (Jean Béliveau)।
মানুষের কখন কি চায়, সব সময় সে নিজেও সেটা জানে না। আম জঁ বেলিশোঁ এর কাজ দেখলে সেটা বুঝতে পারবো।
নাম ও পরিচিতি (The Record Holder Profile)
জঁ বেলিশোঁ (Jean Béliveau) কানাডার নাগিরক। (মন্ট্রিল, কুইবেক) সাইনেজ বা নিওন সাইন ম্যানুফ্যাকচারার (Neon Sign Manufacturer)। তাঁর পেশা ছিল সাইনেজ ও ভিজ্যুয়াল ব্র্যান্ডিংয়ের সাথে জড়িত।
৪৫ বছর বয়সে তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হয়ে যায়। তীব্র মানসিক সংকট ও মধ্যবয়সের হতাশা (Mid-life Crisis) থেকে বাঁচতে এবং জীবনের নতুন অর্থ খুঁজতে তিনি বিশ্বভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এটিকে কেবল একটি ভ্রমণ নয়, বরং “জাতিসংঘের শিশু অধিকার ও শান্তির জন্য বিশ্ব পদযাত্রা” (UN Universal Declaration of Human Rights for Children) হিসেবে ঘোষণা করেন।
ভ্রমণ বৃত্তান্ত (The Journey Profile)
জঁ বেলিশোঁ তাঁর ৪৫তম জন্মদিনে, ১৮ আগস্ট ২০০০ সালে কানাডার মন্ট্রিল থেকে হাঁটা শুরু করেন। দীর্ঘ ১১ বছর পর, ১৬ অক্টোবর ২০১১ সালে তিনি আবার মন্ট্রিলে ফিরে এসে তাঁর যাত্রা শেষ করেন। তিনি একটানা ৪,০৭৭ দিন (১১ বছর ২ মাস) হেঁটেছেন। এই সময়ে তিনি মোট ৭৫,৫5৩ কিলোমিটার (৪৬,৯৪৬ মাইল) পথ পাড়ি দেন।
তিনি মোট ৬৪টি দেশ পাড়ি দিয়েছেন। চিলি থেকে আর্জেন্টিনা হয়ে দক্ষিণ আমেরিকার একদম শেষ প্রান্ত (উশুয়াইয়া) ছুঁয়ে, ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া (ভারত, বাংলাদেশসহ) হয়ে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে পর্যন্ত।
তাঁর হাঁটার যাত্রাটি ছিল নিরবিচ্ছিন্ন এবং একটানা (Continuous True Walk)। সাউথ আমেরিকা থেকে ইউরোপ কিংবা এশিয়া থেকে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার জন্য সমুদ্র পারাপারের সময়টুকুই কেবল তিনি জাহাজে বা বিমানে পার হয়েছেন (যা গিনেস বুক অনুযায়ী বাধ্যতামূলক ট্রানজিট)। কিন্তু জমিনে নামার পর প্রতিটি দেশের সীমান্ত তিনি পায়ে হেঁটেই পার হয়েছেন, কোনো গণপরিবহন ব্যবহার করেননি।
আলাস্কা বা কানাডার তীব্র শীত ও বরফের সময় তিনি বিশেষ উইন্টার গিয়ার এবং ট্র্যাকিং বুট ব্যবহার করতেন। কিছু অঞ্চলে অতিরিক্ত তুষারপাতের কারণে গতি ধীর হয়ে গেলে তিনি দিনে কম কিলোমিটার হাঁটতেন, কিন্তু হাঁটা থামাতেন না।
আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি এবং অস্ট্রেলিয়ার আউটব্যাক (মরুভূমি) পার হওয়ার সময় তিনি ভোর ৪টা থেকে সকাল ১০টা এবং বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাঁটতেন। দুপুরের তীব্র রোদে (যখন তাপমাত্রা ৪০°-৪৫° সেলসিয়াস ছুঁত) তিনি স্থানীয় কোনো গাছ, তাবু বা পেট্রোল পাম্পে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতেন।
প্রধান অ্যাক্টিভিটি এবং লজিস্টিকস:
তিনি একটি ৩ চাকার বিশেষ পুশ-কার্ট (Three-wheeled Cart) বা ঠেলাগাড়ি ঠেলে নিয়ে যেতেন। এই গাড়িতেই ছিল তাঁর তাবু, খাবার, জামাকাপড় এবং ফার্স্ট এইড বক্স। যাত্রাপথে তিনি বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার স্কুল পরিদর্শন করেন, শিশুদের সাথে কথা বলেন এবং মানবাধিকার ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেন।
প্রমাণ ও মূল্যায়ন (Evidence & Global Recognition)
গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অত্যন্ত কঠোর নিয়মে পায়ে হাঁটার রেকর্ড যাচাই করে। জঁ বেলিশোঁ যেভাবে তাঁর যাত্রার সত্যতা প্রমাণ করেছিলেন:
ক. প্রযুক্তি ও প্রমাণের পদ্ধতি (Proof & Technology):
পাসপোর্ট স্ট্যাম্প: তিনি প্রতিটি দেশের বর্ডার ক্রসিং, ইমিগ্রেশন এবং লোকাল থানার সিল ও সাইন সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁর পাসপোর্টগুলো ছিল এই যাত্রার সবচেয়ে বড় আইনি প্রমাণ।
লগবুক ও সিগনেচার: তিনি একটি অফিশিয়াল ডায়েরি বা লগবুক মেইনটেইন করতেন। প্রতিদিন তিনি যে শহরের বা গ্রামের ওপর দিয়ে যেতেন, সেখানকার মেয়র, হোটেল মালিক, পুলিশ অফিসার বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্বাক্ষর এবং তারিখ লিখে রাখতেন।
ভিডিও ও ফটোগ্রাফি: পুরো ১১ বছরে তিনি হাজার হাজার ছবি এবং ভিডিও ফুটেজ রেকর্ড করেন, যা তাঁর জিপিএস লোকেশনের সাথে ম্যাচ করানো হয়েছিল।
বৈশ্বিক মূল্যায়ন ও সম্মাননা (Global Recognition):
জাতিসংঘের স্বীকৃতি: জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (UNICEF)-এর দূত হিসেবে বিভিন্ন দেশে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল।
রাষ্ট্রপ্রধানদের অভ্যর্থনা: যাত্রা চলাকালীন বিভিন্ন দেশের প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট এবং নোবেলজয়ীরা (যেমন নেলসন ম্যান্ডেলা) তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে অভ্যর্থনা জানান এবং তাঁর পুশ-কার্টে স্বাক্ষর করেন।
মিডিয়া কাভারেজ: BBC, CNN, এবং National Geographic তাঁর ওপর বিশেষ ফিচার তৈরি করে। ২০১১ সালে তিনি যখন কানাডায় ফিরে আসেন, তখন হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাঁকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেয়।
তার আগে প্রথম যিনি গ্রিনিচ বুকে নাম লেখান তার দূরত্ব ২৪ হাজার কিলোমিটার হলেও ইনি প্রায় ৩ গুন বেশী হেঁটে তার পরের রেকডধারীর জন্য কাজটি কঠিন করে দিয়েছেন। তবে মানুষের অসাধ্য নয় বটে।
সূত্র: দ্যা ডেইলি মেইল ও অন্যান্য পত্রিকা

