নির্বাচন না সংস্কার? নাকি দুটোই।
নির্বাচন না সংস্কার? এই মুহুর্তে এটা একটা বড় ইস্যু হয়ে দেখা দিয়েছে। কতিপয় রাজনৈতিক দল বলছেন। তারা ক্ষমতায় এসে সংস্কার করবেন। এখন নির্বাচন দরকার। তাছাড়া অনির্বাচিত সরকারের সংস্কার জনগন মানবেনা ।
কিন্তু সরকারের একটি অংশ বলছে রাজনৈতিক সংস্কার না চাইলে দ্রুত নির্বাচন দিয়ে তারা সরতে চান। অন্য অংশ বলছে রাজনৈতিক দলগুলো বিগত ৫০ বছর সংস্কার করতে পারেনি। সূতরাং তাদেরকে দিয়ে সংস্কার হবে না।
তাহলে বাস্তবতা কি?
বিগত ৮ মাসে সরকারের কাছে জনগনের যে প্রত্যাশা তার অতি নগণ্য অংশও পুরণ হয়নি। সরকারের লোকেরা দৃশ্যমান কোনো উন্নতি কিংবা সংস্কারের পথে পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বড়ো দাগে তাদের কর্মকান্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়।
সরকারের ব্যর্থতা
• ১০০০ টাকার নোট নিষিদ্ধ করে ঘরে ঘরে বস্তাবন্দী টাকাগুলো অচল করার দরকার ছিল। তারা সেটা করেনি বা করতে পারেনি।
• পুলিশের যে ঘাটতি সেটা দূর করার জন্য অবসরপ্রাপ্ত ডিফেন্স অফিসারদের দিয়ে আলাদা টিম করে নিয়োগ দিতে পারতো ২ বছরের জন্য তারা সেটা করেনি বা করতে পারেনি।
• পুলিশের খুনি অফিসারদের গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় আনতে পারেনি। ৫ হাজার দোষীদের মধ্যে থেকে ১০ জনকে অ্যারেস্ট করতে পারছে কিনা সন্দেহ।
• অভিযান হলো। হাজার হাজার কোটি টাকার ১% শতাংশও বের হয়নি। অস্ত্রেরতো কোনো হদিসই পাওযা গেলনা। অথচ ৩৬ দিনে আমরা কি পরিমাণ অস্ত্রের মহড়া দেখেছি।
• দেশে কোনো দপ্তরে কাজের গতি আসেনি। দালাল চিহ্নিত হয়নি। মুক্ত হয়নি। কারণ দোষীদের চিহ্নিত করার কোনো প্রক্রিয়াগত এবং সংগঠিত উদ্যোগ নেয়াই হয়নি।
• আইনশৃংখলা পরিস্থিতি কতটা অবনতি হয়েছে। সেটা পরিসংখ্যান দেখে বলা যাবে। কিন্তু চুরি ছিনতাই বেড়েছে। ডাকাতি হচ্ছে। যে যেখানে পারে ক্ষমতা দেখাচ্ছে এটা সত্যি।
• যেসব জায়গায় চাঁদাবাজি হতো। বেশীরভাগ জায়গা নতুন কেউ দখলে নিয়েছে। চাঁদাবাজি থেকে বের হওয়ার কোনো পদ্ধতি আপনারা উপস্থাপন করতে পারেননি।
• ফ্যাঁসিবাদের প্রকৃত দোষীরা চোখের সামনে দিয়ে চলে গেছে (২/১ জন ছাড়া)। কিছু করতে পারেননি। ননি ফনি, টোনা মোনা তাদের অ্যারেষ্ট করে সফলতা বুঝাতে চাওয়া একটা আইওয়াশ মাত্র। এই ব্যর্থতা একদিন ফুটে উঠবে। ( সেনাকুঞ্জে আটক ৬২৬ জনের ব্যাপারে কি জবাব দেবে সংশ্লিষ্ঠরা)
• ব্যবসা বাণিজ্যে গতি ফিরে আসেনি। ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত। তারা চায় স্থায়ী সরকার।
উপরের ব্যর্থতাগুলো নিজের চোখে দেখা। এবার আসি সফলতা। এই তথ্যগুলো ফেসবুক থেকে নেয়া। এগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। উদারতার খাতিরে যদি ধরে নিই এগুলো সত্য। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াবে-
সরকারের অর্জন
• দ্রব্যমূল্যের দামের ক্ষেত্রে একটা সফলতা এসেছে। কিছু পণ্য বাদে বেশীরবাগ পণ্যের দাম বাড়ছেনা। কিছু কিছু পণ্যের দাম কমেছেও। এরমধ্যে শাকসব্জি অন্যতম।
• – দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে ১৮.৪৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। যা গতবছরের এই সময়ের তুলনায় ৪ বিলিয়ন বেশি।
* এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সর্বশেষ ৬ মাসে দেশী বিদেশী ঋণ পরিশোধ করেছে ৬২ হাজার কোটি টাকা।
– দেশের রিজার্ভ বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ১৪০ কোটি ডলার।
* হাসিনা ও তার পরিবারের একাউন্ট থেকেই উদ্ধার করেছে ৬৩৫ কোটি টাকা।
* আওয়ামী আমলে অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির কারণে বাফুফের উপর ফিফা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলো৷ বাফুফের উপর সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে ফিফা।
* এখন থেকে প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকেরা পাবেন দ্বিতীয় শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তার মর্যাদা।
* ৮ মাসে শতাধিক আন্দোলন ম্যানেজ করে দেশকে স্থিথিশীল রাখছে।
আমি বলবো, আরো কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে হয়তো তার সুফল পাবো মানুষ পরববর্তীতে।
আমি জানি ভিন্নমতও রয়েছে। কেউ বলবেন পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারতো। হয়তো তাই
পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে যা হতো-
• পুলিশ কাজে যোগ না দিলে সর্বত্র দেশের অবস্থা নাজুক হতে পারতো।
• সেনাবাহিনী ১শ ভাগ নিস্ক্রিয় হয়ে দেশে দলে দলে সংঘাত হতে পারতো।
• যে যেভাবে খুশি দাম বাড়িয়ে মানুষকে বিপদে ফেলতে পারতো।
• লীগের কয়েক হাজার নেতাকর্মী বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন আন্দোলনকারীদের সাথে মিলে প্রতিটি দিন ঢাকা শহর ছাড়া শহরগুলোকে অচল করে দিতে পারতো।
• পরিস্তিতি ঘোলা করে দিয়ে বিদেশী শক্তির নাক গলানোর সুযোগ করে দিতে পারতো।
• রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গিয়ে দেশের অর্থনীতি খারাপ হতে পারতো।
• বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপ হয়ে দেশে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারতো।
• বৈদেশিক বাণিজ্যের খারাপ পরিস্থিতি খারাপ হয়ে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হতে পারতো।
• জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন দেশ সরকার ও দেশকে চাপে ফেলে বেকায়দায় ফেলতে পারতো।
কোনো সন্দেহ নেই। এতসব খারাপ পরিস্থিতি থেকে দেশকে তারা দূরে রেখেছেন। কিন্তু মানুষের প্রত্যাশা কি এটাই ছিল। আমাদের মনে রাখতে যতক্ষন জুলাই আন্দোলন কোটা আন্দোলন ছিল ততক্ষন মানুষ রাস্তায় নামেনি। যখন এটি সরকার বিরোধী আন্দোলনে রুপ নিয়েছে তখনি এতে সর্বস্তরের মানুষ যোগ দিয়েছে। সরকারের হত্যানীতিও একটা কারণ ছিল। সেজন্য বিগত সময়ে যেসব অনিয়ম হয়েছিল সেগুলো থেকে মানুষ মুক্তি পাবে সেটাই মানুষের প্রত্যাশা ছিল সেটা কি হয়েছে?
আর মানুষের প্রত্যাশাই বা কি ছিল?
• যে দলই ক্ষমতায় থাকুক। মানুষ কথা বলার সুযোগ পাবে। কথা বলার জন্য কোনো হামলা, মামলা খুন গুম নির্যাতনের শিকার হবে না। এখানে মানুষ ভাল আছে।
• দ্রব্যমূল্যের দাম সহনীয় থাকবে। দেশে কোনো সিন্ডিকেট থাকবেনা। দ্রব্যমূল্য নিয়ে সরকার কাজ করবে। ( দ্রব্যমূল্য বর্তমানে না বাড়লেই, ভবিষ্যতে বাড়বে না এমন মনে করা যাচ্ছে না)
• ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ হবে। এটা বন্ধ হয়নি। ক্ষেত্র বিশেষে কমতে পারে।
• দেশে যানজট থাকবেনা। পরিস্থিতি আগের চেয়ে অবণতি হয়েছে।
• মানুষ নিরাপদে ঘুমাবে। সার্বিক আইন শৃংখলা যাই হোক। চুরি ছিনতাই, ডাকাতি বেড়েছে।
• নিয়োগ বাণিজ্য ও তদবির বন্ধ হবে। (এটা বন্ধ হয়নি)
• চাঁদাবাজি বন্ধ হবে ( এটা বন্ধ হয়নি, শুধু চাঁদাবাজের সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে যেটা আগে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি)
• শিক্ষার মান উন্নত হবে। ( একটা কমিশন হয়েছে। পরবর্তী অগ্রগতি নেই)
• স্বাস্থ্য সেবা উন্নত হবে ( দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই)
• সরকারী সেবার মান উন্নত হবে ( ছোটোখাটো ইতিবাচক কিছু ঘটনা ছাড়া মৌলিক কোনো অগ্রগতি নেই ।
• জুলাই বিপ্লবে আহত ও নিহতের স্বীকৃতি ক্ষতিপূরণ চিকিৎসা খরচ কোনোকিছুই ঠিকমতো দেয়া হচ্ছে না।
• সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, সংস্কারের পক্ষে সরকারের সাহসী কোনো পদক্ষেপ নেই।
তাহলে এই সময়ে জনগনের বিভ্রান্ত হওয়ার যথেষ্ঠ অবকাশ আছে। জনগনের মধ্যে নিচের বিভ্রান্তিগুলো সৃষ্টি হতে পারে। এবং তাই হচ্ছে-
• সরকারের সব জায়গায় সাবেক সরকারের লোক বসে আছে। তারা যেকোনো মুহুর্তে সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।
• সরকারকে সেনাবাহিনী সব দিক থেকে ঘিরে রেখেছে। মৌলিক কোনো কাজ করতে দিচ্ছে না।
• প্রধান উপদেষ্ঠার অফিসে ১২% অফিসার সেনা থেকে নিয়োগ দিয়ে তার উপর নজরদারী চালানো হচ্ছে।
• উপদেষ্ঠা পরিষদে প্রান্তন গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রাক্তন ২ সেনা অফিসারকে দিয়ে সরকারকে একরকম গতি কমিয়ে দেয়া হয়েছে।
• যেহেতু সরকারের কোনো মেয়াদ ঠিক করতে পারে নাই। তাই সরকারকে কেউ সহযোগিতা করবেনা।
• যেহেতু এই সরকারের লোকদের মাঠ পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব নেই। তাই এরা পরিস্থিতি কতটা সামাল দিতে পারবে এটা নিয়ে জনগনের মাঝে সংশয় রয়েছে।
• দেশে সব সময় ভাগের রাজনীতি চলছিল। তাই যেকোনো মুহুর্তে যে কেউ বিক্রি হয়ে যেতে পারে।
• সাবেকদের কাছে যে পরিমাণ টাকা, অস্ত্র ও কর্মী আছে তারা যেকোনো মুহুর্তে অচলাবস্থা সৃষ্টি করতে পারে। সরকারের দূর্বলতা খুজে পেলে।
তাহলে এই অবস্থায় কি করনীয়। এটা অন্য লেখায় রয়েছে। এই লেখা আর বড় না করি। শুধু কয়েকটা কথা বলতে চাই।
জনগনের মধ্যে যেসব ভয় ও বিভ্রান্তি তৈরী হতে পারে।
• নির্বাচন যখনি হোক সরকারকে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে সংস্কারের কাজ শুরু করতে হবে। যতটা সম্ভব করবে। বাকীটুকুর দায় পরবর্তী সরকারের থাকবে। শুরু করলে পরের সরকার তা সম্পূর্ণ করতে যতটা দায়বদ্ধ থাকবে। শুরু না করলে ততটা দায়বদ্ধ থাকবেনা।
• সরকার অন্তত নির্বাচন ও রাজনীতি সংক্রান্ত একটা সংষ্কারের পরিকল্পনা করবে। সরকারের প্লান এ,বি,সি,ডি থাকবে। মানে ১ বছর পরে নির্বাচন হলে কি কি কাজ করবে. ২ বছর পরে হলে কি করবে এভাবে।
• জরুরী সংষ্কার যেমন ক্ষতিগ্রস্থদের পূণবাসন, পুলিশকে শক্তিশালী করণ, আদালতে ন্যায় বিচার নিশ্চিতকরণ এসব বিষয় কাজ করতে হবে। যার কোনো বিকল্প নেই।
• দূর্নীতি বন্ধের জন্য যা যা করা দরকার। সব করতে হবে।
• শিক্ষা ক্ষেত্রে আমুল পরিবর্তনের কাজ করতে হবে। এখানে ১% কাজও বাকী রাখা যাবে না।
• স্বাস্থ্যখাতে যতটা কাজ করা যায়। কিন্তু পুরো কাজের পরিবেশ ও অবস্থা করে দিতে হবে। যাতে পরের সরকার বাকী কাজ করতে বাধ্য হয়।
• মানুষ খুন আর টাকা লুট বাদে অন্যসব কাজের ক্ষেত্রে নিয়ম নীতি ১০০ ভাগ মানা যাবে না। তাহলে যে নিয়ম তৈরী করা হয়েছে সরকার কোনো কাজই করতে পারবেনা।
• আইন বিচার ব্যবস্থা সংস্কারে পূর্ণরুপরেখা তৈরী করে সরকারের মেয়াদে যতটা সম্ভব ততটা বাস্তবায়ন করতে হবে। নচেৎ এই জাতির আর মুক্তি মিলবেনা।
• তরুন শক্তিকে কাজে লাগানোর একটা রোডম্যাপ বানাতে হবে। সেটার প্রাথমিক কাজ শুরু করতে হবে।
আর যদি সরকার ব্যর্থ ও পথ হারায় তাহলে আমাদের জন্য খারাপ খবর আসছে। যা আমরা চাই না।
(ছবি: জুলাই আন্দোলন বিষয়ক ডেইলি স্টার চিত্র প্রদর্শণী)

