নির্বাচনী গণিত ও ভোটের জেতার কৌশল

নির্বাচনী গণিত ও ভোটের জেতার কৌশল

নির্বাচনী গণিত ভোটে জেতার গানিতিক কৌশল

ইলেকশান ম্যাথমেটিক্স নামে কিছু বিষয় আছে। দেশে নির্বাচন নিয়ে নানা গবেষণায় বিষয়গুলো উঠে আসে। যারা ইলেকশান ওয়ার্ক করে তারা এগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তারা এগুলো বুঝে নেয়। আবার যারা বুঝতে পারে না তারা কোপে পড়ে যায়। ইলেকশান ম্যাথমেটিক্স এর কিছু বিষয় এই লেখায় তুলে ধরা হলো।

নির্বাচনী গণিতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ইকোয়েশনসমূহ:

ক) ১ এর সমান ২ (১=২):  ভোট স্থানান্তর সূত্র (Vote Transfer Formula):

ওয়ান ইসটু টু (1=2) নামে ফর্মুলায় নির্বাচনের হারজিত ঠিক হয়। এই অংকটা ঠিকমতো কষতে পারলে লড়াইয়ে থাকা প্রার্থীরা নির্বাচনের ফল পক্ষে নিয়ে আসতে পারে। বিষয়টা খুলে বলা যাক। ধরুন আবুল আর বাবুল ২ জন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করছে। এখন মোট ভোটার হলো ১ হাজার। এর মধ্যে ৫শ জন্য আবুলকে ভোট দেবে ৫শ জন বাবুলকে ভোট দেবে। এখন বাবুল যদি কৌশলে ১শ ভোট নিজের দিকে বেশী নিতে পারে তাহলে ২ জনের ভোটের ব্যবধান হবে ২শ। কারণ যখন বাবুল ১শ ভোটার টানবে তখন বাবুলের ভোট হবে ৫শ+১শ=৬শ। আর আবুলের ভোট হবে ৫শ-১শ=৪শ। ব্যবধান দাঁড়াল ২শ।

Δ = 2x
যেখানে x = একজন প্রার্থীর কাছ থেকে অন্য প্রার্থীর দিকে স্থানান্তরিত ভোট সংখ্যা
Δ = মোট ভোট ব্যবধানে পরিবর্তন

ব্যাখ্যা: কেউ যদি প্রতিদ্বন্দ্বীর ১০০ ভোট নিজের পক্ষে নিয়ে আসে, তাহলে ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় ২০০। এটি আগের “১ = ২” সূত্রের ব্যাখ্যা।

খ)  স্বিং (Swing) সূত্র:

Swing% = (Current vote share – Previous vote share) ÷ 2

ব্যাখ্যা: কোনো দল বা প্রার্থীর ভোট ভাগে পরিবর্তন কতটা হয়েছে তা বোঝাতে।

একাধিক ভোটের ব্যালট ও গ্রুপ ভোটে প্রয়োগ

দলীয় ভোটে এর কিভাবে কাজ করে। ধরি একটি কাউন্সিলে ৭ সদস্যের বোর্ড আছে সেখানে বিজয়ের জন্য ১০ জন প্রার্থী আছে। এখানেও যদি আবুল ও বাবুল পরষ্পর প্রতিদ্ধন্ধি হয় তাহলে দুজনের ভোটের অনুপাতে একই ফল হবে। কিন্তু যদি আবুল ভোট মাবুল ও কাবুল নিয়ে যায় তাহলে তাদের ভোট বেড়ে যাবে। এখানে যদি মাবুলের ভোট ৫০০ থাকে তাহলে আবুল থেকে ৫০ ভোট নিয়ে তার ৫৫০ হবে। তবে এখানে ভোটের খেলা হয়। কারণ প্রথম ৬ জন হলো একে অপরের প্রতিদ্বন্ধি আর বাকী ৪ জন হলো ৭ নং পদের জন্য পরষ্পরের প্রতিযোগী। এখন এখান মামুন, মাসুদ ও মাসুম কি করবে? তারা তাদের নিজস্ব ভোটারদের বলবে তুমি ১ ভোট আমাকে দিবে বাকী ভোট অন্য এমন প্রার্থীকে দেবে যারা জিতবেনা। তাহলে জয়ের সম্ভাবনা আছে এমন প্রার্থী হেরে গেলে শেষের দিকে জেতার সম্ভাবনা থাকা প্রার্থীরা সামনে চলে যাবে।

তবে কখনো কখনো হেরে যাওয়া প্রার্থীকে চেকভোট দিতে গিয়ে জিতিয়ে দেয়ার ঘটনাও আছে।

গ) ভোট শতাংশ (Vote Share %): কমভোটে জেতা যায়

বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচন পদ্বতির এটি একটি ত্রুটি। যারা অংকটা বুঝতে এবং খেলতে পারে। তারা এই খেলায় অনেক সময় জিতে যায়। চলুন দেখি খেলাটা কি?

ধরি একটি এলাকায় মোট ১০ জন প্রার্থী সংসদ নির্বাচন বা মেয়র ইলেকশান করছে। আমরা জানি ভোটার ১ জনকে ভোট দিবে এবং একজন জিতবে। আপাত দৃষ্টিতে আমরা মনে করি যে ভোটে একজন জিতবে যে সবার চেয়ে বেশী ভোট পাবে কথা সত্য কিন্তু এই নয়যে, সব সময় তাকে অনেক ভোট পেতে হবে। যেমন-

১০ জন প্রার্থীর ভোটোর হার যদি এমন হয়।

প্রার্থী ১= ৭%

প্রার্থী ২= ৮%

প্রার্থী ৩= ৯%

প্রার্থী ৪=১০%

প্রার্থী ৪=১১%

প্রার্থী ৪=১২%

প্রার্থী ৪=১৩%

প্রার্থী ৪=১৪%

প্রার্থী ৪=১৬%

আমরা সহজে বুঝতে পারছি এখানে যিনি ১৬% ভোট পেয়েছেন তিনি জিতবেন। মজার ব্যাপার হলো ৮৪% ভোটার তাকে চায়নি। তারপরও তিনি জয়লাভ করলেন।

এখন যারা খেলাটা বোঝে তারা নিজেদের ২০-২৫% ভোট নিশ্চিত করে আরো কিছু ডামি প্রার্থী মাঠে রাখে যাতে তারা কিছু ভোট পায় এবং তাতে তিনি কম শতাংশ ভোটেও জিততে পারেন। এখানে অনেক সময় ঠিকভাবে খেলতে না পারলে হিতে বিপরীত হয়।

ঘ) V% = (Votes received by candidate ÷ Total valid votes) × 100

ব্যবহার: কোন প্রার্থী মোট বৈধ ভোটের কত শতাংশ পেয়েছেন তা নির্ণয় করতে।

ঘ) টার্নআউট হার (Voter Turnout Rate):

Turnout% = (Total votes cast ÷ Total registered voters) × 100

ব্যবহার: নির্বাচনে কতজন ভোটার ভোট দিয়েছেন তার পরিমাণ বোঝাতে।

ঙ)  মার্জিন অব ভিক্টরি (Margin of Victory):

Margin = Winner’s votes – Runner-up’s votes

ব্যবহার: নির্বাচনে জয়ী প্রার্থীর জয় কত ভোটে হয়েছে তা বোঝাতে।

 গুচ্ছ ভোট

গুচ্ছ ভোট: একটি ব্যালটে একই পদে একাধিক ব্যক্তিকে ভোট দেয়ার বিষয়টিকে আমরা গুচ্ছভোট বা ভোটগুচ্ছ বলতে পারি। এই গুচ্ছভোটেও দারুন হিসেব আছে। এখানকার হিসেবে অনেকে গরমিল করে থাকেন। উদাহরণ দিয়ে বলতে হয়-

যদি এরকম হয় এক ব্যালটে একটি সমিতির নির্বাচনে সদস্যরা ১০ জনকে নির্বাচিত করবেন। ধরি ভোটার সংখ্যা ১০০০। তাহলে ব্যালট সংখ্যাও ১০০০ হাজার কিন্তু ভোট সংখ্যা ১০,০০০।

যদি ৭০% কাস্ট হয় তাহলে মোট ৭০০ জন ভোটারের ভোট হবে ৭০০০টি। প্রার্থী সংখ্যা যদি ২৫ জন হয় তাহলে জনপ্রতি ভোটের পরিমাণ ২৮০টি। এসব ক্ষেত্রে বিজয়ী প্রার্থীকে ৫০% এর বেশী ভোট পাওয়ার টার্গেট করে মাঠে নামতে হয়। যদিও যদি দ্বৈত প্রার্থী হয় মানে মাত্র ২ জন প্রার্থী ও ১ ভোট হয় তাহলে অবশ্যই কাস্ট ভোটের অর্ধেকের বেশী পেয়ে জিততে হয়। এখানে অর্ধেকের কম পেয়ে জেতা গেলেও অর্ধেক লক্ষ্যমাত্রা থাকা ভাল কমপক্ষে। উদারহরণ স্বরুপ

১টি সমিতির নির্বাচনে ৬০০ কাস্টভোটের ৪৮০ পেয়ে একজন প্রথম বিজয়ী হলো। যেখানে মোট জন বিজয়ী হবে এবং তাদের ভোটের যোগফল হলে ৫৪০০। কেননা প্রতিজন ভোটার ৯টি করে ভোট দিয়েছিল। এবং যিনি নবম হয়েছেন তিনি ২৬০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন যা ভোট ভোটের ৪৫%।

এই হিসেব আরো কমবেশী হতে পারে। সেটা নির্ভর করছে যারা প্রথম দিকে থাকে তারা কত ভোট দখল করে নিয়েছে এবং যারা হেরে গেছে তাদের সংখ্যা কত এবং তারা সকলে মিলে কত ভোট পেয়েছে?

চ). Effective Number of Parties (ENP) বা কার্যকর দলের সংখ্যা:

ENP = 1 ÷ Σ(pi²)
যেখানে pi = প্রতিটি দলের ভোট শতাংশ (ভগ্নাংশে প্রকাশিত)

ব্যবহার: একটি এলাকায় প্রকৃতপক্ষে কতগুলো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে তা বোঝায়।

ছ). Gerrymandering Impact Formula (গেরিম্যান্ডারিং বিশ্লেষণ):

Efficiency Gap = (Wasted votes of Party A – Wasted votes of Party B) ÷ Total votes

ব্যাখ্যা: আসন পুনর্বণ্টন কৌশলের ফলে কোন দল কীভাবে সুবিধা বা ক্ষতির মুখে পড়েছে তা বিশ্লেষণ করা হয়।

২টি ফুরমূলার বিস্তারিত ব্যাখ্যা

 

ইলেকশান ম্যাথমেটিক্স শুধুমাত্র সংখ্যার খেলা নয়, এটি হলো কৌশল, মনস্তত্ত্ব, এবং সময়োপযোগী বিশ্লেষণের সমন্বয়। একটি সঠিক ভোট বিশ্লেষণ কেবলমাত্র ফলাফল নির্ধারণ করে না, বরং ভবিষ্যতের পরিকল্পনার দিকনির্দেশও দেয়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply