নারী পুরুষের সম্পর্ক ও ছেলে মেয়ের বন্ধুত্ব
নারী-পুরুষের বন্ধুত্ব নিয়ে বিতর্ক চিরকালীন। তবুও জীবনের পথে চলতে চলতে গল্প, আড্ডা, হাসি-ঠাট্টার ফাঁকে কেউ না কেউ আমাদের ভালো লেগেই যায় — সে হোক নারী, কিংবা পুরুষ। আর প্রচলিত প্রবাদই বলে, “বন্ধুত্বের কোনো বয়স নেই, নেই কোনো ধর্ম, বর্ণ বা পরিচয়।” এই হলো বন্ধুত্ব?
আর ভালোবাসা? ভালো লাগা থেকেই কখনো কখনো ভালোবাসার জন্ম হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো — কোনো নারী ও পুরুষ কি শুধুমাত্র বন্ধুত্বের সম্পর্ক ধরে রেখে সারাজীবন একসাথে চলতে পারে?
নারী পুরুষের বন্ধুত্ব বলতে পুরুষ ও মহিলার মধ্যে অ-প্রণয়ঘটিত সম্পর্ককে বোঝায়। এই সম্পর্কগুলি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আগ্রহ এবং স্নেহের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। কিছু ক্ষেত্রে, এই ধরনের বন্ধুত্ব ঘনিষ্ঠ হতে পারে, আবার কিছু ক্ষেত্রে এটি নৈমিত্তিক হতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমে একটা পোস্ট ঘুরে বেড়ায়। শেক্সপিয়র বরাতে বলা হয়, ‘‘একজন ছেলে কখনো একজন মেয়ের বন্ধু হতে পারে না, কারণ এখানে আবেগ আছে, দৈহিক আকাঙ্ক্ষা আছে।”
আইরিশ কবি অস্কার ওয়াইল্ড এর নাম নিয়ে বলা হয়, “নারী ও পুরুষের মধ্যে কেবল বন্ধুত্ব থাকা অসম্ভব। যা থাকতে পারে তা হলো আকাঙ্ক্ষা, দুর্বলতা, ঘৃণা কিংবা ভালোবাসা।”
কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ এর নামে বলা হয়, তিনি বলেছেন- “ছেলে আর মেয়ে বন্ধু হতে পারে, কিন্তু তারা অবশ্যই প্রেমে পড়বে। হয়তো খুবই অল্প সময়ের জন্য, অথবা ভুল সময়ে। হয়তো খুবই দেরিতে, আর না হয় সারাজীবনের জন্য। তবে প্রেমে তারা পড়বেই।”
আসলে কী, ছেলে-মেয়ের মধ্যে শুধুমাত্র বন্ধুত্ব প্রকৃতি-বিরুদ্ধ? যদি সবকিছু বন্ধুত্বেই সীমাবদ্ধ থাকত, তবে প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়ম হারিয়ে ফেলত? চুম্বক আর লোহা কখনো কেবল পাশাপাশি থাকতে পারে না — তারা আকর্ষণ করবেই। তাহলে নারী পুরুষতো চুম্বক ও লোহার মতো কিন্তু তারা কি সব সময় চুম্বক ও লোহার মতো আচরণ করে? কিছু মনে করেন, নারী পুরুষ সম্পর্কের শেষ পরিণতি আকর্ষণ ও প্রেম। হয়তো প্রেম করে না। কিন্তু তারা কেউ না কেউ কারো না কারো প্রেমে পড়ে হয়তো দুদিক থেকে নয়তো এক তরফণা।
প্রথমত, উপরে সেক্সপিয়রের নামে যে মন্তব্যটি করা হয়েছে। এটি বিকৃত। দ্বিতীয়ত অস্কার ওয়াল্ডের নামে যেটা বলা হয়েছে। সেটা তার সাহিত্যের একটা চরিত্রের কথা, সরাসরি তার কথা নয়। হুমায়ন আমদে এর উদ্বৃতিও তাই।
এবার আমরা আসি বিশ্লেষণে, নারী-পুরুষের বন্ধুত্ব (Friendship between men and women) একটি বহুপার্যায়িক ও সংস্কৃতিভেদে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। আপনার প্রশ্নের আলোকে আমরা তিনটি সময় পর্ব (প্রাচীন, মধ্যযুগ ও বর্তমান) ধরে আলোচনা করব।
প্রাচীন সময়ের দৃষ্টিভঙ্গি
গ্রীক ও রোমান দার্শনিকরা
-
অ্যারিস্টটল বন্ধুত্বকে তিন ধরনের বলেছিলেন: স্বার্থসিদ্ধির জন্য, আনন্দের জন্য এবং গুণের জন্য (virtue-based)। তিনি নারী-পুরুষের মধ্যে এই গুণভিত্তিক (noble) বন্ধুত্ব সম্ভব মনে করতেন না, কারণ তৎকালীন সমাজে নারীর স্বাধীনতা সীমিত ছিল।
-
প্লেটো তাঁর “Symposium” গ্রন্থে ভালোবাসা ও বন্ধুত্বকে মিশ্রিত আকারে দেখেছিলেন। তাঁর মতে, প্রেমের মধ্য দিয়েও আত্মার উৎকর্ষ ঘটতে পারে। যদিও তখনও বন্ধুত্বের শীর্ষে পুরুষ-পুরুষ বন্ধুত্বের কথা বলেছেন।
প্রাচীন ভারত
-
সংস্কৃত সাহিত্য (যেমন নীতিশাস্ত্র, হিতোপদেশ) অনুযায়ী নারী-পুরুষের সম্পর্ক প্রধানত কাম (রোমান্টিক) বা গার্হস্থ্য জীবনকেন্দ্রিক ছিল।
-
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও নারী-পুরুষের সম্পর্ককে বেশি রাজনৈতিক বা দাম্পত্য স্তরেই দেখা হয়েছে। বন্ধুত্বের ধারণা সরাসরি পাওয়া যায় না।
চীনের কনফুশিয়ান দর্শন
-
সম্পর্কগুলো সামাজিক কর্তব্য (li) ও মর্যাদা (ren) দ্বারা প্রভাবিত ছিল। নারী-পুরুষের আলাদা সামাজিক ভূমিকার কারণে বন্ধুত্বের বিষয়টি তেমন আলোচনায় আসেনি।
২. মধ্যযুগের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামিক দর্শন
ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে সরাসরি বন্ধুত্বের (যেখানে ব্যক্তিগত মেলামেশা হবে) বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ উৎসাহিত। আল-গাজালি বা ইবনে খালদুন সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু নারী-পুরুষ বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে সতর্কতার পরামর্শ দিয়েছেন।
মধ্যযুগীয় ইউরোপ
ক্যাথলিক চার্চ প্রেম ও দাম্পত্যকেই নারী-পুরুষ সম্পর্কের উপযুক্ত ক্ষেত্র মনে করতো। ‘Courtly Love’ বা কোর্টলি লাভ ধারণা জনপ্রিয় ছিল, যেখানে প্রায়ই বিবাহিত নারীর সঙ্গে একজন নাইটের “প্লাটোনিক” প্রেম/বন্ধুত্ব হতো। কিন্তু সেটিও অন্তরঙ্গ না থেকে শৈল্পিক ও আভিজাত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত।
আধুনিক ও সমকালীন সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের মত
মনোবিজ্ঞানী ও ডাক্তারদের দৃষ্টিভঙ্গি
-
সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলেন, নারী-পুরুষের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে লুক্কায়িত যৌন কামনা প্রায়ই থাকে। সমসাময়িক অনেক মনোবিজ্ঞানী যেমন Deborah Tannen বলছেন, নারী-পুরুষের বন্ধুত্ব আলাদা ধরনের মানসিক চাহিদা পূরণ করে: পুরুষরা তথ্য-আধারিত ও মজা-ভিত্তিক বন্ধুত্ব চায়, নারীরা অনুভূতিমূলক ভাগাভাগি পছন্দ করে — দুজনের মেলবন্ধনে ভারসাম্য আসে।
সমাজবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ
-
সাম্প্রতিক বহু গবেষণা বলছে, নারী-পুরুষের বন্ধুত্ব আধুনিক নগরায়িত সমাজে অনেক বেশি স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য। তবে যৌন উত্তেজনা বা রোমান্টিক জটিলতা প্রায়শই এমন বন্ধুত্বে উত্থাপিত হয়, যা কখনো সমস্যার, আবার কখনো সম্পর্কের গভীরতা বাড়ায়। নারী-পুরুষের বন্ধুত্ব নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান (medicine) ও মনোবিজ্ঞান (psychology) – উভয় ক্ষেত্রেই বেশ কিছু ব্যাখ্যা, গবেষণা এবং তত্ত্ব রয়েছে। নিচে সহজ ভাষায় আলাদা আলাদা করে ব্যাখ্যা করছি:
চিকিৎসাবিদ্যা (Medicine) কী বলে?
চিকিৎসা শাস্ত্র সরাসরি বন্ধুত্বের উপর খুব বেশি আলোচনা করে না। তবে মানুষের শারীরবৃত্তীয় (physiological) ও হরমোনজনিত দিক থেকে কিছু বিষয় প্রভাবিত করে:
হরমোনের ভূমিকা:
-
টেস্টোস্টেরন (পুরুষদের প্রধান যৌন হরমোন) ও এস্ট্রোজেন (নারীদের প্রধান যৌন হরমোন) উভয়ই মানুষের সামাজিক আচরণে প্রভাব ফেলে। নারী-পুরুষ যখন ঘনিষ্ঠ হয়, তখন অবচেতনে যৌন আকর্ষণ জেগে ওঠা স্বাভাবিক। ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলেন, নারী-পুরুষের বন্ধুত্বে কখনো কখনো যৌন উত্তেজনা (sexual tension) তৈরি হতে পারে, যা সম্পর্কের জটিলতা তৈরি করে।
Oxytocin – “Bonding Hormone”:
-
বন্ধুত্ব, আলিঙ্গন বা আন্তরিক কথা বললে অক্সিটোসিন ক্ষরিত হয়, যা ঘনিষ্ঠতা ও বিশ্বাস তৈরি করে। নারী-পুরুষ উভয়েই এ হরমোন দ্বারা প্রভাবিত হয়, ফলে বন্ধুত্ব মজবুত হয়, কিন্তু একইসাথে মাঝে মাঝে এটি প্রেমমুখীও হতে পারে।
মেন্টাল হেলথ দিক:
-
ভালো বন্ধুত্ব স্ট্রেস কমায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। চিকিৎসকেরাও বলেন, বিপরীত লিঙ্গের বন্ধুত্বে মানুষ এক ধরনের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পায়, যা মানসিক স্বাস্থ্য উপকারে আনে।
মনোবিজ্ঞান (Psychology) কী বলে?
মনোবিজ্ঞান বিষয়টি অনেক গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছে। এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব উল্লেখ করছি:
Freud (সিগমুন্ড ফ্রয়েড)
ফ্রয়েডের মতে মানুষের আচরণের পেছনে যৌনচেতনা (libido) বড় চালিকাশক্তি। নারী-পুরুষের বন্ধুত্বে অচেতনভাবে যৌন আকর্ষণ লুকিয়ে থাকে বলে তিনি মত দিয়েছিলেন। তবে ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনেকটা বিতর্কিত এবং আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সব সম্পর্কের পেছনে যৌনতা নয়।
Evolutionary psychology
বিবর্তন মনোবিজ্ঞান বলছে, মানুষ বিপরীত লিঙ্গের প্রতি প্রাকৃতিকভাবে আকৃষ্ট হয়, যা বন্ধুত্বকেও প্রভাবিত করে।তবে এ আকর্ষণ সবসময় যৌন পরিণতি চায় না। মানুষ কখনো সহযোগিতা, সঙ্গ, সহমর্মিতা বা নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্যও বিপরীত লিঙ্গের বন্ধু খোঁজে।
সমসাময়িক গবেষণা (Deborah Tannen, April Bleske-Rechek)
-
নারী-পুরুষের বন্ধুত্ব নিয়ে বহু সমীক্ষায় দেখা গেছে, অনেক সময় পুরুষরা বন্ধুত্বে লুকানো যৌন সম্ভাবনা খুঁজে পায়, নারীরা বন্ধুত্বকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। তবে দু’পক্ষের জন্যই এটি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। যেমন: পুরুষরা নারী বন্ধুর মাধ্যমে আবেগময় আলোচনা শিখে, সম্পর্ক ম্যানেজমেন্টে উন্নতি করে।নারীরা পুরুষ বন্ধুর মাধ্যমে সরল যুক্তি ও প্রতিযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উপকৃত হয়।
Pluralistic ignorance
-
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, প্রায়ই নারী-পুরুষ বন্ধু একে অপরকে “শুধু বন্ধু” মনে করে, কিন্তু ভাবে — “সে হয়তো আমাকে প্রেমিক হিসেবে ভাবছে।” ফলে দ্বিধা, লজ্জা ও ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়।
জরিপ ও গবেষণা কি বলে?
অন্যদিকে, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, নারী-পুরুষের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বেশ লাভজনক হতে পারে। একজন পুরুষ তার বন্ধুত্বের মাধ্যমে একজন নারীর মানসিক অবস্থা বা অনুভূতি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে, যা তাদের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক তৈরি করতে সহায়ক হতে পারে।
-
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ভিক্টোরিয়ায় Danu Anthony Stinson-এর জরিপে দেখা গেছে, ৬৮ % (বিশ্বাসযোগ্য সীমা: ৫৯–৭২ %) দম্পতি প্রথমে বন্ধুত্ব থেকে প্রেমে গড়ে তোলে (*১)। তরুণ ও LGBTQ+ দম্পতিদের মধ্যে হার বেড়ে ৮৫ % । (*২)
২. যৌন বা শারীরিক আকর্ষণ:
-
Bleske-Rechek (২০০৯‑২০১২)–এর প্রণীত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৩০–৬০ % ক্রস-লিঙ্গ বন্ধুদের মধ্যে “মাঝারি-সামান্য” শারীরিক আকর্ষণ অনুভব করে (৩)
-
Asada‑এর (২০০৩) কলেজ ছাত্রদের জরিপে ৮৭ % পুরুষ ও নারীরা কখনো না কখনো যৌন আকর্ষণ অনুভব করেছেন ।
৩. অন্তর্বর্তী কাজ বা “only sex” সংক্রান্ত ফলাফল:
-
Afifi ও Faulkner (২০০০): ৫১ % কলেজ-বন্ধুর মধ্যে একবার যৌন সম্পর্ক হয়, কিন্তু এর ৫৬ % প্রেমে রূপ নেয় না (৪)
-
Psychology Today-র জরিপে ৬৭ % বোঝালো তারা বন্ধুদের সাথে যৌন সম্পর্ক করেছেন, এবং এর ৫৬ % রোমান্টিক সম্পর্ক আশা করেননি; ৮৩ % বিশ্বাস করেন যে মানুষ বিপরীত-লিঙ্গের বন্ধুত্ব রাখতে পারে ।
নারী-পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য
-
বেশিরভাগ পুরুষই মনে করেন বন্ধু নারী তার প্রেমে আগ্রহী, যেটি আসলে সত্য নয় ।
-
নারী আকর্ষণকে “বাধা” মনে করে, পুরুষরা তা মাঝে মাঝে “সুবিধা” বা “ইনসাইট” হিসেবে দেখে ।
সূতরাং-
বন্ধুত্ব বিকাশ করে প্রেমে রূপ নেওয়াটা খুবই সাধারণ—৬৮ % দম্পতি বন্ধু-প্রথম পথ অনুসরণ করে। অন্তত এক পর্যায়ে ৩০–৬০ % বন্ধুর মধ্যে আকর্ষণ বা রোমান্টিক আকাঙ্ক্ষা জন্মায়। পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রায় ৫০ % যৌন সম্পর্ক ভালোবাসায় রূপান্তর না করলেও আশেপাশেই থাকে।
বন্ধুত্ব থেকে প্রেমে
