বাংলা প্রবাদ “ধর্মের কল বাতাসে নড়ে” মূলত ইঙ্গিত করে ধর্মের স্থিরতা, অচলতা ও চিরন্তন সত্যের প্রতি আস্থা। প্রবাদটি বোঝায়, ধর্ম কখনো নিজের শক্তিতে টিকে থাকে না; সমাজের চলমান পরিস্থিতি, মানুষের বিশ্বাস ও ব্যাখ্যার বাতাসে সেটি নড়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক সময় ধর্মকে ব্যবহার করে নানা কুসংস্কার প্রতিষ্ঠা করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, সতীদাহ, অশৌচ প্রথা, অশিক্ষিত মানুষের উপর ভূতপ্রেতের ভয় চাপিয়ে দেওয়া কিংবা সামান্য অসুখকে দেবতার অভিশাপ বলে চালানো—এসবই ধর্মের নামে কুসংস্কারের বাতাসে নড়ে ওঠা কলের মতো। অর্থাৎ ধর্মের মূল শিক্ষা যেমন মানবকল্যাণ, ন্যায় ও সত্য—সেটিকে বিকৃত করে সমাজে অমানবিক রীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাই বলা যায়, প্রবাদটি শুধু ধর্মের দৃঢ়তাই প্রকাশ করে না, বরং এর আড়ালে ধর্মকে বিকৃত করার প্রবণতা ও কুসংস্কারও ইঙ্গিত করে।
সতীদাহ প্রথা
সতীদাহ প্রথা মানবসভ্যতার ইতিহাসে নারীর প্রতি অমানবিক আচরণের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। এটি কেবল নারীর স্বাধীনতা ও জীবনের অধিকার কেড়ে নেয়নি, বরং সমাজে নারীকে সম্পূর্ণভাবে পুরুষনির্ভর এক সত্তায় পরিণত করেছিল। সতীদাহ প্রথার বিলোপ কেবল একটি নিষ্ঠুর প্রথার সমাপ্তিই ঘটায়নি, বরং ভারতীয় সমাজে নারীমুক্তির পথে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রযাত্রার সূচনা করেছে।
সতীদাহ প্রথা কবে চালু হয়?
সতীদাহ (বা সতি প্রথা) মানে হলো: স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রীকে তার চিতায় জীবন্ত পুড়িয়ে দেয়া। প্রাচীন ভারতীয় কোনো প্রমাণিত বৈদিক যুগের শাস্ত্রে সতীদাহের উল্লেখ নেই।কিছু ক্ষীণ বিতর্কিত শ্লোক রয়েছে, কিন্তু প্রধানত এটি গুপ্ত-পরবর্তী (~৪০০–৫০০ খ্রিঃ) সময়ে প্রথম স্পষ্টভাবে দেখা যায়।তারপর মধ্যযুগে (~৯০০ খ্রিঃ থেকে) এটি উত্তর ও পশ্চিম ভারতের রাজপুত এবং উচ্চবর্ণের মধ্যে ব্যাপক হয়। মূলত জাতিপ্রথা ও ব্রাহ্মন্যবাদের বিস্তারের সাথে এর বিস্তার ঘটে।
সতীদাহের ভৌগোলিক বিস্তার
সতীদাহ মূলত ভারতবর্ষেই প্রচলিত ছিল, বিশেষ করে রাজপুত, ব্রাহ্মণ এবং উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে। উত্তর ভারত, রাজস্থান, পাঞ্জাব, বিহার, বাংলা এবং মধ্যভারতের অনেক স্থানে এই প্রথার চর্চা ছিল। দক্ষিণ ভারতে তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেলেও সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল না।
বাংলার ইতিহাসে সতীদাহ বিশেষভাবে কুখ্যাত। নদীর ঘাট, বিশেষত গঙ্গার তীরে বহু সতীদাহের ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে।
কোন কোন সম্প্রদায়ে সতীদাহ প্রচলিত ছিল
-
রাজপুত সমাজে সতীদাহ ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। রাজপুতানার ‘জহর প্রথা’য় নারীরা একসাথে আত্মাহুতি দিতেন, যখন তাদের রাজ্য শত্রুর হাতে পতনের মুখে পড়ত।
-
ব্রাহ্মণ সমাজে, বিশেষত উচ্চবর্ণের পরিবারে, সতীদাহ মর্যাদার প্রতীক ছিল।
-
তবে নিম্নবর্ণ ও দরিদ্র সম্প্রদায়ে সতীদাহ তুলনামূলকভাবে কম দেখা যেত। কারণ সেসব পরিবারে এত আচার-অনুষ্ঠান পালনের সামর্থ্য থাকত না।
হিন্দুদের সব উপদলে কি সতীদাহ ছিল?
না, সব উপদলে সতীদাহ ছিল না।
| উপদল/বর্ণ | সতীদাহের প্রবণতা |
|---|---|
| রাজপুত (ক্ষত্রিয়) | সবচেয়ে বেশি |
| ব্রাহ্মণ | কিছু ক্ষেত্রে |
| বৈশ্য-শূদ্র | খুবই কম, প্রায় শূন্য |
| দক্ষিণ ভারতের হিন্দু | প্রায় ছিল না |
| ভক্তি/তান্ত্রিক সম্প্রদায় | ছিল না বা নিন্দা করত |
কেন সতীদাহ চালু হয়েছিল?
সতীদাহ প্রথার পেছনে কয়েকটি মূল কারণ ছিল—
১. পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা: নারীকে পুরুষের সম্পত্তি হিসেবে দেখা হতো। স্বামী মারা গেলে নারীর আর কোনো অস্তিত্ব নেই—এই ধারণাই সতীদাহকে জোরদার করে।
২. অর্থনৈতিক কারণ: বিধবারা সমাজ ও পরিবারের কাছে ‘বোঝা’ মনে হতো। তাদের দেখাশোনার দায় এড়াতে পরিবার কখনো কখনো সতীদাহকে সমর্থন করত।
৩. ধর্মীয় বিশ্বাস: মোক্ষ, স্বর্গপ্রাপ্তি, পরিবারের মুক্তি ইত্যাদি বিশ্বাস সতীদাহের অন্যতম প্রেরণা ছিল।
৪. সম্মান রক্ষা: অনেক ক্ষেত্রে জমি বা বংশের মর্যাদা রক্ষার জন্য নারীকে আগুনে ঠেলে দেওয়া হতো।
কতদিন স্থায়ী ছিল?
আনুমানিক ৪র্থ–৫ম শতক থেকে উনিশ শতকের প্রথমভাগ (~১৮২৯) পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রায় ১,৩০০–১,৪০০ বছর ধরে প্রথাটি স্থায়ী ছিল, তবে সবসময় সমান মাত্রায় নয়। মধ্যযুগে (১২০০–১৬০০) উত্তর ভারতে মুসলিম আক্রমণের সময় রাজপুতদের মধ্যে জওহর (সম্মিলিত সতীদাহ) আরও প্রচলিত হয় পন্ডিতদের ধারণা।
ঐতিহাসিকদের মতে, খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের মধ্যভাগে সতীদাহ সুসংগঠিত প্রথা হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। মধ্যযুগে মুসলিম শাসনের সময় এটি কমলেও বন্ধ হয়নি। মুঘল সম্রাট আকবর সতীদাহ নিরুৎসাহিত করেছিলেন, কিন্তু তার মৃত্যুর পর প্রথাটি আবারও মাথা তোলে।
অবশেষে, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮২৯ সালে গভর্নর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ‘সতীদাহ নিষিদ্ধ আইন’ প্রবর্তন করেন, যা সতীদাহ প্রথাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবৈধ ঘোষণা করে।
সতীদাহ রহিতকরণ
সতীদাহ বন্ধ করার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন রাজা রামমোহন রায়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে হিন্দু শাস্ত্রে কোথাও সতীদাহ বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তার নেতৃত্বে সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়।
১৮২৯ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক আইন পাশ করে সতীদাহ নিষিদ্ধ করেন। যদিও শুরুতে কিছু হিন্দু সমাজ এ আইন মানতে অস্বীকার করে, কিন্তু ধীরে ধীরে প্রথাটি বিলুপ্ত হয়।
সতিদাহে প্রাণের হানি
সতীদাহে কতজন প্রাণ হারিয়েছে তার সঠিক কিংবা আনুমানিক সংখ্যা পাওয়া যায় না। কারণ এটা সব গোত্রে ও এলাকায় সমান পরিমাণে ছিল না। আবার সব সময় একই রকম ছিল না। আবার সবক্ষেত্রে সমাজ ও মন্দিরপতিরা সফলও হয়নি। তবে একটা সময়ে এটা সামাজিক বা ধর্মীয় প্রথা হিসেবে সাধারণ ও ব্যাপক ছিল এটা ধারণা করা যায়। তবে যদি কি পরিমাণ পুরুষ স্ত্রীর আগে মারা যেত তাদের শতাংশ জানা গেলে সে অনুসারে কত শতাংশ সতীদাহ করা যেত তা অনুধাবন করা যেতো। সেরকম কোনো তথ্যও ইতিহাসে পাওয়া যায় না। বরং সন্তান জন্ম ও বিনা চিকিৎসায় নারীর মৃত্যুহার পুরুষের চেয়ে বেশী ছিল। মহামারী ও যুদ্ধে পুরুষ মৃত্যুর পরিমাণ বেশী থাকলেও। যুদ্ধকালীন অস্বাভাবিক মৃত্যুতে সতীদাহ কাযকর ছিল কিনা তার উল্লেখ বিরল। এছাড়া যুদ্ধে নারীদের ধর্ষণ ও হত্যা করা হতো। কারণ ধর্ষিতা নারীকে তখন সমাজে গ্রহণ করা হতো না।
আমরা যদি ভারত বর্ষের জনসংখ্যা দেখি তাহলে চিত্রটা কিছুটা এমন। দীর্ঘ সময় (৪০০ থেকে ১৮২৯) জনসংখ্যা বারবার পাল্টেছে। এই সংখ্যাটি সমর্থিত সূত্র নয়।
| সময়কাল | আনুমানিক জনসংখ্যা |
|---|---|
| ~৪০০ খ্রিঃ | ~৬-৭ কোটি |
| ~১২০০ খ্রিঃ | ~৭-৮ কোটি |
| ~১৫০০ খ্রিঃ | ~১০ কোটি |
| ~১৮২০ খ্রিঃ | ~২০ কোটি |
সতীদাহে কত নারী বলি হয়েছেন তার নির্দিষ্ট সংখ্যা বলা কঠিন। কারণ অনেক ঘটনা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়নি। তবে ইউরোপীয় ভ্রমণকারী, ব্রিটিশ রেকর্ড এবং স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায় যে হাজার হাজার নারী এই প্রথার শিকার হয়েছেন। ১৮১৫–১৮২৮ সাল পর্যন্ত বাংলায় বছরে গড়ে প্রায় ৬০০ সতীদাহের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছিল।অনুমান করা হয়, কয়েক শতাব্দী ধরে ভারতবর্ষে কয়েক লক্ষ নারী এ প্রথায় বলি হয়েছেন।
আধুনিক কালে সতীদাহ
আইনি ও সামাজিকভাবে বন্ধ হলেও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। ব্রিটিশ আইনের মাধ্যমে সতীদাহ বন্ধ হলেও, ২০শ শতাব্দীতেও বিচ্ছিন্নভাবে সতীদাহের ঘটনা ঘটেছে। যেমন— ১৯৮৭ সালে রাজস্থানের দেউরালিতে ‘রূপ কঁয়ার সতী’ কাণ্ড ঘটে, যেখানে এক তরুণীকে সতীদাহে প্রায় জোর করে পুড়িয়ে মারা হয়। সেখানে রূপ কানোয়ার নামের এক তরুণীকে স্বামীর চিতায় দাহ করা হয়েছিল। এ ঘটনার পর সারা ভারত প্রতিবাদে ফেটে পড়ে এবং সরকার আরও কঠোর আইন প্রণয়ন করে।
সতীদাহ প্রথা মানবসভ্যতার ইতিহাসে নারীর প্রতি অমানবিক আচরণের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। এটি কেবল নারীর স্বাধীনতা ও জীবনের অধিকার কেড়ে নেয়নি, বরং সমাজে নারীকে সম্পূর্ণভাবে পুরুষনির্ভর এক সত্তায় পরিণত করেছিল। সতীদাহ প্রথার বিলোপ কেবল একটি নিষ্ঠুর প্রথার সমাপ্তিই ঘটায়নি, বরং ভারতীয় সমাজে নারীমুক্তির পথে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রযাত্রার সূচনা করেছে।

