Shovon on the way
তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ ভ্রমণের সময় দাউদকান্দি ব্রিজ পার হচ্ছেন। জাহাঙ্গীর আলম শোভন

দুপায়ে দেশ জয়: অদম্য পদযাত্রীদের কথা

দুপায়ে দেশ জয়:অদম্য পদযাত্রীদের কথা

বাংলাদেশের মানচিত্রটি যেন এক অমিত সম্ভাবনার আঁচল। কেউ ভালোবাসার টানে, কেউ পরিবেশ রক্ষার ডাকে, কেউ আবার নিজেকে জানার অদম্য ইচ্ছায় হাঁটতে শুরু করেন—পায়ের তলায় মেখে নেন ধুলো, কাদা, বৃষ্টি, রোদ্দুর। তাঁরা একেকজন পথিকৃৎ, যাঁরা নিজেদের পায়ের শক্তিতে ভৌগোলিক সীমানাকে জয় করেছেন।

ওসমান গনি: বাংলা থেকে বিশ্বে ২১ হাজার কিলোমিটার

ওসমান গণি ছিলেন পায়ে হেঁটে পৃথিবী ভ্রমণকারী এক অসাধারণ বাঙালি পরিব্রাজক। কুড়িগ্রাম জেলার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি শৈশব থেকেই ভ্রমণের স্বপ্ন দেখতেন। ১৯৬৪ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত হেঁটে যাত্রা শুরু করেন এবং পরবর্তী প্রায় ৭ বছরে পায়ে হেঁটে ২২টি দেশ ভ্রমণ করেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে শুরু করে ইরান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, জর্দান, মিশর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, আফগানিস্তানসহ নানা দেশ পাড়ি দিয়ে তিনি প্রায় সাড়ে ২১ হাজার মাইল পথ অতিক্রম করেন। পথে ডাকাতি, ঝড়, অপহরণসহ নানা ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েও তিনি থেমে যাননি এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গেও সাক্ষাতের সুযোগ পান, যা তাকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে।

কিন্তু এত বড় অর্জনের পরও জীবনের শেষভাগে এসে তিনি অবহেলা ও দুঃখের মধ্যে পড়ে যান। প্যারালাইসিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে তিনি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার এক গ্রামে নিঃস্ব অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। তাঁর সংগ্রহ করা ভ্রমণ অভিজ্ঞতার পান্ডুলিপি আজও প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে, যা তিনি বুকের কাছে আগলে রেখেছেন। একসময় যে মানুষ বিশ্বজয় করেছিলেন পায়ে হেঁটে, আজ তিনি কেবল একটি স্বপ্নের পূরণের অপেক্ষায়—তাঁর ভ্রমণকাহিনী বই আকারে প্রকাশিত হয়ে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।

 দীর্ঘতম পথের পথিক: সাইফুল ইসলাম শান্ত (দূরত্ব: ৪,০৫০ কিলোমিটার)

ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ২০২২ সালের ১৪ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করেন সাইফুল ইসলাম শান্ত। তাঁর লক্ষ্য ছিল পায়ে হেঁটে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ৪,০৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া। তিন মাসের অভিযানে তিনি প্রতিটি জেলায় একটি করে গাছ লাগান এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা ছড়িয়ে দেন। তাঁর এই যাত্রা ছিল স্বাস্থ্য ও পরিবেশের পক্ষে এক অনন্য বার্তা। পরে তিনি বিশ্ব ভ্রমণে বের হোন।

দেশের ৬৪ জেলা ঘুরে শান্ত ২০২৪ সালের ২২ মার্চ পায়ে হেঁটে বিশ্ব ভ্রমণে বের হন। ১৯৩টি দেশ ঘুরে দেখার স্বপ্ন নিয়ে তিনি এখন পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা, উজবেকিস্তান, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াসহ একাধিক দেশ পাড়ি দিয়েছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাঁর বিশ্বপথচলার ৬০০ দিন পূর্ণ হয়

জাহাঙ্গীর আলম শোভন : দেশ ও দেশের মানুষ যার দেখার বিষয়

২০১৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু হয়েছিল জাহাঙ্গীর আলম শোভনের সেই ঐতিহাসিক পদযাত্রা। দেশের পর্যটন শিল্পকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে ভ্রমণের সংস্কৃতি ও ই-কমার্স উদ্যোগ ছড়িয়ে দেওয়ার মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি এই অভিযানে নামেন। টানা ৪৬ দিনে প্রায় ১১৭৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে পৌঁছান। তাঁর এই যাত্রা কেবল শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা ছিল না, বরং এটি ছিল প্রতিটি জনপদের মানুষের জীবনযাত্রা ও পর্যটন সম্ভাবনাকে খুব কাছ থেকে চেনার এক সুশৃঙ্খল গবেষণা।

এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার পথ হেঁটেছেন এবং পথে পথে স্থানীয় ঐতিহ্য ও লোকজ জীবন পর্যবেক্ষণ করেছেন। একজন লেখক ও অভিজ্ঞ সংগঠক হিসেবে তাঁর এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কেবল ব্যক্তিগত ডায়েরিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা ‘দেখব বাংলাদেশ গড়ব বাংলাদেশ’ বইয়ের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের পদযাত্রীদের জন্য এক অপরিহার্য দিকনির্দেশনা হিসেবে অমর হয়ে আছে। বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর এই অর্জন এদেশের অ্যাডভেঞ্চার ও পর্যটন সাহিত্যে একটি মাইলফলক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা প্রমাণ করে যে দৃঢ় সংকল্প থাকলে একজোড়া পা দিয়েই পুরো দেশকে জয় করা সম্ভব।

  শিশুশ্রম বন্ধের প্রতিজ্ঞা: নাসিম তালুকদার (সময়: সাড়ে ৩ মাস)

দিনাজপুরের নাসিম তালুকদার ‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’, ‘আর নয় শিশুশ্রম, এবার চাই শিক্ষা’ স্লোগান নিয়ে ২০১৬ সালের ২২ অক্টোবর পথে নামেন। ১০৮ দিনে ৬৪ জেলা ঘুরে তিনি ৭ ফেব্রুয়ারি নিজ জেলায় ফিরে আসেন। ব্যাকপ্যাকে ৮ কেজি বোঝা নিয়ে তিনি স্কাউটের ব্রত পালন করেন।

ফজলুল বারি: পায়ে হেঁটে ৩১৯ উপজেলা থেকে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহ

পেশায় ফজলুল বারী মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহের জন্য ১৮ মাস পায়ে হেঁটে বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছেন।  যিনি বর্তমানে সিডনিপ্রবাসী এই সাংবাদিক আশির দশকে ছাত্র জীবনে তার কর্মসম্পাদন করেন। দেশে থাকাকালীন তিনি কিছুদিন দৈনিক জনকন্ঠে কর্মরত ছিলেন।

৬৪ দিনে ৬৪ জেলা: ইকবাল মণ্ডল ইউসুফ (সময়: ৬৪ দিন)

২০২২ সালের ১০ নভেম্বর কক্সবাজারের জিরো পয়েন্ট থেকে পায়ে হেঁটে ৬৪ জেলার পথে রওনা দেন ইকবাল মণ্ডল ইউসুফ । তাঁর লক্ষ্য ছিল ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা ভ্রমণ। মাদকের ভয়াবহতা, রক্তদানের গুরুত্ব ও বৃক্ষরক্ষার বার্তা নিয়ে তিনি ৩,৩৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন। ৬৪তম দিনে নিজ জেলা রাজবাড়ীতে পৌঁছে তিনি সব জেলার মাটি সংগ্রহ করেন।

পেশায় ডাক্তার, নেশায় পথিক: ডা. বাবর আলী (ভ্রমণের বছর: ২০১৯)

পেশায় চিকিৎসক, নেশায় পাহাড়ি ও ট্রেকার—ডা. বাবর আলী ২০১৯ সালে পায়ে হেঁটে বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণ করেন। এই ভ্রমণ তাঁকে পরবর্তীতে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট জয়ের পথে প্রস্তুত করে । তিনি বাংলাদেশের পঞ্চম এভারেস্টজয়ী এবং একজন দিকপাল ট্রেকার হিসেবে সবার কাছে পরিচিত

 দুই সহোদরের পবিত্র ভ্রমণ: সিয়াম ও সায়েম (যাত্রা শুরু: ২৬ জানুয়ারি ২০২৫)

‘তোমরা আমার পৃথিবীতে ভ্রমণ করো’—পবিত্র কোরআনের এই বাণীকে সামনে রেখে মাদারীপুর থেকে পথ চলা শুরু করেন হাফেজ সিয়াম ও সায়েম উদ্দিন। জাতীয় পতাকা মাথায় বেঁধে তাঁরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন জেলা থেকে জেলায়। পথিমধ্যে মসজিদে রাত কাটিয়ে, সাধারণ খাবার খেয়ে তাঁরা প্রতিটি জেলা ঘুরে দেখার অঙ্গীকার করেছেন।

থ্যালাসেমিয়া সচেতনতার অগ্রদূত: শেখ জাহিদ হাসান (সময়: ৬১ দিন)

থ্যালাসেমিয়া রোগের ভয়াবহতা থেকে মানুষকে বাঁচাতে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির তরুণ শেখ জাহিদ হাসান বেরিয়ে পড়েন। কোনো টাকা পয়সা ছাড়াই, শুধু মানুষের ভালোবাসায় ভর করে ৬১ দিনে তিনি ৬৪ জেলা ভ্রমণ সম্পন্ন করেন। পথে তিনি হাজার হাজার মানুষকে থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সচেতন করেন।

 দৌড়বিদের অসাধ্য সাধন: মোহাম্মদ শামসুজ্জামান আরাফাত

মোহাম্মদ শামসুজ্জামান আরাফাত টেকনাফ থেকে দৌড়ে তেঁতুলিয়া পৌঁছে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পুরো বাংলাদেশ দৌড়ে পাড়ি দেওয়ার রেকর্ড গড়েন। ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি টেকনাফ থেকে যাত্রা শুরু করে তিনি প্রায় ১,০০৪ কিলোমিটার দৌড় শেষ করেন। যাত্রাপথে যমুনা সেতু পার হতে বাধা পেয়ে তিনি সাঁতরে নদী পাড়ি দিয়েছিলেন—এ যেন অদম্য ইচ্ছাশক্তির জয়গান।

 দক্ষিণ থেকে উত্তরের পথে একা নারীপদযাত্রী: তাহুরা সুলতানা (পথ: ১,০০১ কিলোমিটার)

টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে যাত্রা শুরু করে ২০২৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরোপয়েন্টে এসে থামেন তাহুরা সুলতানা। ৫১ দিনের পথচলায় তিনি ১,০০১ কিলোমিটার পাড়ি দেন। পথে পথে মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে অজানা বন্ধুরা সঙ্গ দিয়েছে। শেষ মুহূর্তে বিজিবির সহযোগিতায় তাঁর স্বপ্নপূরণ হয়।

হাঁটার রেকর্ড ভাঙার গল্প: সবুজ কুমার বর্মন প্রবাল (সময়: ১৭ দিন)

ফ্যাশন ডিজাইনার সবুজ কুমার বর্মন প্রবাল মাত্র ১৭ দিনে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পাড়ি দিয়ে রেকর্ড গড়েন। সপ্তাহে ৫ দিন অফিস করে বাকি দুই দিন হেঁটে তিনি এই অভিযান শেষ করেন। একই সঙ্গে তিনি ১৭ ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার হাঁটার জাতীয় রেকর্ডও গড়েন। তাঁর বার্তা ছিল: ‘হাঁটাকে হ্যাঁ বলুন, থেরাপিকে না বলুন’।

 মো. আকাশ আলীর  ১০০০ কিলোমিটার

মো. আকাশ আলী ২০২৪ সালে ৯৫ দিনে ৬৪ জেলা ভ্রমণ সম্পন্ন করেন। এক বছর পর ২০২৫ সালের নভেম্বরে তিনি ‘প্লাস্টিক দূষণ রোধ’ স্লোগানে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১০০০ কিলোমিটার পথ ২৫ দিনে পাড়ি দিয়ে অভিযান শেষ করেন। ব্যক্তিগত অ্যাডভেঞ্চারের পাশাপাশি পরিবেশ সচেতনতার বার্তা ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।

 ২০১৫ সালে এ জেড রহমান ‘এক্সপ্লোর বাংলাদেশ’ স্লোগানে একা পায়ে হেঁটে ৪৪ দিনে ১,০০৮ ঘণ্টায় এই পথ অতিক্রম করেন। তার সম্পর্কে এখন আর খুব বেশী তথ্য জানা যায় না। এছাড়া জায়েদ খালেদ ও তার ২ বন্ধুও ১৭ দিনে পাড়ি দিয়েছেন তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ তারা নদী কেন্দ্রীক সচেতনতা তৈরী করতে কাজ করছেন।

এঁদের প্রত্যেকের পায়ের চিহ্ন বাংলাদেশের মানচিত্রকে এক অনন্য গৌরবে ভাসিয়ে দিয়েছে। এই আয়োজনটি নিছক একটি তালিকা নয়; এটি স্বপ্নের এক বিস্তৃত আখ্যান। প্রতিটি গল্পে আছে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, প্রতিটি পদক্ষেপে আছে দেশের প্রতি ভালোবাসা, এবং প্রতিটি মাইলেজে আছে ‘পারবো’ এই দৃপ্ত প্রত্যয়।

আরো কিছু মানুষের গল্প রয়েছে যা অন্য লেখায় প্রকাশিত হয়েছে।