Noakhali Union Bank

দি নোয়াখালী ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেড: নোয়াখালীয়ানদের গৌরব

দি নোয়াখালী ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেড: ইতিহাস ও বিবরণ

দি নোয়াখালী ইউনিয়ন ব্যাংক  সদর দফতর ছিল কলকাতায়—তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বাণিজ্য ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ব্যাংকটি তফসিলি (Scheduled) ব্যাংকের মর্যাদাপ্রাপ্ত ছিল, অর্থাৎ এটি তৎকালীন রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃত তালিকাভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (Managing Director) ছিলেন মিঃ এস. সি. পাল।

ব্যাংকটির শাখা নেটওয়ার্ক যথেষ্ট বিস্তৃত ছিল। বিশেষ করে শিলং (মেঘালয়), বহরমপুর (পশ্চিমবঙ্গ) এবং জামশেদপুর (বিহার) উল্লেখযোগ্য। এসব শাখার মাধ্যমে ব্যাংক স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, জমা–ঋণ কার্যক্রম এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

যদিও অনেক জায়গায় এই ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৪০ বলা হয়, কিন্তু ব্যাংকের একটি পুরনো চেকে যে “19 3 …” এমন তারিখের ঘর দেখা যায়, তা থেকে ধারণা করা যায়—এটি ১৯৪০ নয় বরং ১৯৩০-এর দশকেই প্রতিষ্ঠিত, এবং ১৯৩৯ সালের আগেই এর কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। চেকে তারিখের ঘর ১৯৩০–৩৯ এই দশকের জন্য নির্ধারিত থাকায় এটিই যুক্তিযুক্ত। সম্ভবত ১৯৪০ সালের যে বিজ্ঞাপনটি কলকাতার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল, সেখান থেকে ‘প্রতিষ্ঠার বছর ১৯৪০’ ধারণাটি ছড়িয়ে পড়েছে। সেই বিজ্ঞাপনে শিলং ও জামশেদপুরে শীঘ্রই শাখা খুলবে এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে ‘মি. এস. সি. পাল’ বা ‘সাধন চন্দ্র পাল’-এর নামও উল্লেখ ছিল।

১৯৪৯ সালে ব্যাংকটি আনুষ্ঠানিকভাবে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়। ধারণা করা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বৈশ্বিক মন্দা এবং বাজারের অস্থিরতায় কলকাতার শত শত ব্যাংক যেমন ভেঙে পড়েছিল—এই ব্যাংকটিও সেই প্রক্রিয়ার অংশ ছিল। তবুও লক্ষণীয় যে, এই ব্যাংকটি যুদ্ধ-পরবর্তী অস্থিরতা এবং দেশভাগের পরও প্রায় দুই বছর টিকে ছিল। দেশভাগের পর ‘নোয়াখালী’ নামটি যেহেতু পূর্ববঙ্গে পড়ে যায়, কলকাতায় এই নামে ব্যাংক চালানো উদ্যোক্তাদের জন্য জনপ্রিয়তা ও আস্থার দিক থেকে কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া নোয়াখালী ও কলকাতার দাঙ্গা–সংক্রান্ত সামাজিক প্রেক্ষাপটও ব্যাংকের প্রতি জনআস্থাকে প্রভাবিত করেছিল বলে ধারণা করা হয়।

ব্যাংক দেউলিয়া ঘোষণার পর এর দেনা–পাওনা ও সম্পদ বণ্টন নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা হয়—যার শিরোনাম ছিল “Kartik Chandra Pal & Anr. vs. Noakhali Union Bank Ltd.”। সেখানে ক্রেডিটরের শ্রেণিবিভাগ, প্রভিডেন্ট ফান্ড (PF), সিকিউরিটি ডিপোজিট, এবং ব্যাংকের ইস্যুকৃত ড্রাফ্ট/পে-অর্ডারের দাবি—এসব বিষয়ে আদালত সিদ্ধান্ত প্রদান করে। ব্যাংকের কর্মচারীদের PF ও সিকিউরিটি ডিপোজিটকে প্রাধান্যপ্রাপ্ত দাবি (privileged claims) হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে জনতা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময়, নোয়াখালী ইউনিয়ন ব্যাংক এবং তৎকালীন ইউনাইটেড ব্যাংকের পূর্ববাংলার শাখা ও সম্পদগুলো একত্রিত করা হয়। তবে কলকাতায় দেউলিয়া ঘোষিত একটি ব্যাংক কীভাবে পরবর্তীতে বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হল—এই বিষয়ে স্পষ্ট নথি এখনও পাওয়া যায়নি। অনুমান করা হয়, দেশভাগের পর পূর্ববাংলা অঞ্চলে থাকা শাখাগুলো আলাদাভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছিল এবং পরবর্তীতে সেগুলো জনতা ব্যাংকের কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বর্তমান সময়েও এই ব্যাংকের লিকুইডেশন সম্পর্কিত কিছু নথি আদালতের ইতিহাসের অংশ হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষ করে ১৯৬৮ সালে কলকাতা হাইকোর্ট ব্যাংকের লিকুইডেশন ও ক্রেডিটর শ্রেণিবিভাগ বিষয়ে চূড়ান্ত আদেশ দেয়। সাম্প্রতিককালে, জুন ২০২৫ সালে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংককে এই পুরনো দেউলিয়া ব্যাংকগুলোর অফিসিয়াল লিকুইডেটর হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে।

সেসময় বাংলার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে—‘Bank of Calcutta’ (১৮০৬), পরবর্তীতে ‘Bank of Bengal’, এবং ‘Bengal Bank’ (১৭৮৪)-এর মতো ব্রিটিশ পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। পূর্ব বাংলায়ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের গড়া কো-অপারেটিভ ও ইউনিয়ন ব্যাংকগুলো ছিল সক্রিয়। নোয়াখালীতেই প্রতিষ্ঠিত “নাথ ব্যাংক” (Nath Bank) ছিল এর একটি উদাহরণ।

নোয়াখালী ব্যাংক এর জন্য এতটুকু তথ্য যথেষ্ঠ নয়। কারা কোন প্রেক্ষিতে এই ব্যাংক চালু করেছিল। কি পরিমাণ গ্রাহক ও লেনদেন ছিল ইত্যকার বিষয় জানতে পারলে তৎকালীন ভারতের ব্যাংকিং জগতে এই ব্যাংকের প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেত।

সামগ্রিকভাবে, দি নোয়াখালী ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেড শুধু নোয়াখালীর নয়, বরং সমগ্র পূর্বাঞ্চলের ব্যাংকিং ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, শাখা নেটওয়ার্ক এবং পরিচালন নীতিমালা পরবর্তীতে জনতা ব্যাংকের ভিত্তি নির্মাণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। নোয়াখালীর লোকেরা যে পূর্বেই ব্যবসা বাণিজ্যে অগ্রসর ছিলেন এটা হলো তার একটি ঐতিহাসিক ও দালিলিক প্রমাণ।


সূত্র:
Noakhalipedia.com
International Gallery of Ephemera & Collectibles (Facebook)

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply