রাজনৈতিক দলের জন্য প্রেস বিজ্ঞপ্তি লেখা
প্রেস রিলিজ রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এটি শুধুমাত্র কোনো বার্তা প্রচারই নয়, বরং একটি দলের অবস্থান, নীতি ও কার্যক্রম সংবাদমাধ্যম ও জনগণের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দেয়ার একটি কৌশলগত মাধ্যম। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি সুচিন্তিত ও নিয়ম মেনে লেখা প্রেস রিলিজ দলের ইতিবাচক ইমেজ তৈরিতে, সমালোচনার জবাব দিতে এবং জনসমর্থন গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
প্রতিটি প্রেস রিলিজ আসলে একেকটি সংবাদ। মানে সংবাদের উপাদান হলোতে যাতে মানুষের আগ্রহ ও প্রয়োজন থাকে। ঠিক প্রেস রিলিজেও এমন কিছু থাকতে যা মানুষের আগ্রহ ও দরকারী। এছাড়া সেটি এমন কাঠামোতে লিখতে হবে যাতে মানুষের আগ্রহ পূরণ হয় এবং সেটি অনুধাবন করে এবং পুরোটা পড়ার জন্য পাঠককে তাড়িত করে। তাই কিছু এদিক সেদিক থাকলেও মূলত প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও সংবাদের কাঠামো প্রায় একই। তবে প্রেস বিজ্ঞপ্তি সংবাদের চেয়ে আকর্ষনীয় করে লিখতে হয় আবার প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হয়।
আমরা সবাই জানি, একটি সংবাদের ভেতর ৬টি প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই থাকতে হয়।
১. কি ঘটেছে বা ঘটবে? বা আপনি কি বিষয়ে জানাতে চান?, সাধারণ ভবিষ্যতের অনেক বিষয় নিয়ে দল থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রেস করতে হয়। আবার কখনো ঘটে যাওয়া বিষয়ের উপর বিবৃতি দিতে হয়।
২. কে ঘটিয়েছে বা ঘটাবে? বা আপনি কার বিষয়ে জানাতে চান? এখানে বিভিন্ন মাত্রা থাকে। নিজেদের কোনো ঘটনার বিষয় হলে তাতে এক ধরনের ভঙ্গি থাকে, প্রতিপক্ষের জন্য থাকে ভিন্ন ধাঁচ।
৩. কখন ঘটিয়েছে বা ঘটাবে ? বা আপনি যা জানাতে চান তার সময় কখন? ( হবে বা হয়েছে) সময়টি গুরুত্বপূর্ণ হোক সেটা নির্দিষ্ট কিংবা অনিদিষ্ঠ।
৪. কোথায় ঘটিয়েছে বা ঘটাবে ? বা আপনি যা জানাতে চান তার স্থানের নাম? স্থানের নাম কোনোভাবে বাদ দেয়া যাবে না।
৫. কেন ঘটিয়েছে বা ঘটাবে ? বা আপনার দাবীর যৌক্তিকতা বা কারণ? যদি কোনো তথ্যগত বিষয় হয় তাহলে তা নির্দিষ্ট হবে আর তাত্বিক বিষয় হলে তা যৌক্তিকতা সম্পন্ন হতে হবে।
৬. ঘটনার ফল কি হয়েছে? বা ঘটনার কারণে কি ভাল বা মন্দ হয়েছে অথবা সর্বশেষ অবস্থা কি? রাজনীতির ক্ষেত্রে এখানে মূলত আসল খেলা। এই জায়গাটা যতটা মুন্সিয়ানার সাথে উল্লেখ করা হবে। খেলা তত জমবে।
সূচনা মূল সংবাদটি সংক্ষেপে এ অংশে লিখতে হয়। সংক্ষেপ করার সূত্রটি হলো ‘ষড় ক’। ইংরেজীতে বলে 5ডবিউ1এইচ (5W1H)। এই কাঠামো ঠিক রেখে অন্যান্য অনেক কিছুই কমবেশী করা যায়।
প্রেস রিলিজের কাঠামো ও প্রয়োজনীয় উপাদান
রাজনৈতিক প্রেস রিলিজও মূলত সংবাদ লেখার সাধারণ কাঠামোই অনুসরণ করে, তবে বিষয়বস্তু ও জোর দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু কৌশলগত পার্থক্য রয়েছে।
১. শিরোনাম (Headline): আকর্ষণীয়, সংক্ষিপ্ত এবং মূল বিষয়বস্তু প্রতিফলিত এমন শিরোনাম থাকতে হবে। শিরোনাম দেখেই যেন পাঠক বা সাংবাদিক বুঝতে পারেন রিলিজটির গুরুত্ব ও দলের অবস্থান কী।
২. ডেক/উপশিরোনাম (Sub-head/Deck): শিরোনামের পর একটি সংক্ষিপ্ত বাক্যে প্রেস রিলিজের সারমর্ম তুলে ধরা যায়।
৩. ভূমিকা/লিড (Lead): প্রথম অনুচ্ছেদেই সংবাদের ‘ষড়ক’ বা ৫W1H (কি, কে, কখন, কোথায়, কেন, কিভাবে)-এর উত্তর স্পষ্ট থাকতে হবে। ২৫-৩০ শব্দের মধ্যে মূল বার্তাটি সংক্ষেপে উপস্থাপন করতে হবে।
৪. মূল বিষয়বস্তু (Body):
* প্রেক্ষাপট ও কারণ উল্লেখ: কোন প্রেক্ষিতে বা কেন এই বিবৃতি দেয়া হচ্ছে, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা।
* বিস্তারিত বিবরণ: দলের সিদ্ধান্ত, কর্মসূচি, অবস্থান বা অভিমতের বিস্তারিত। তথ্য ও যুক্তি দিয়ে সমৃদ্ধ করতে হবে।
* কর্তাব্যক্তির উদ্ধৃতি (Crucial): রাজনৈতিক প্রেস রিলিজের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দল প্রধান, মহাসচিব, মুখপাত্র বা সংশ্লিষ্ট নেতার সরাসরি উদ্ধৃতি থাকলে তা বিশ্বাসযোগ্যতা ও গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। উদ্ধৃতিটি সুস্পষ্ট, প্রাসঙ্গিক এবং জনগণের আবেগ বা চিন্তায় স্পর্শ করতে সক্ষম এমন হতে হবে।
* লক্ষ্য ও প্রত্যাশা: এই বিবৃতির মাধ্যমে দল কী জানাতে বা অর্জন করতে চায়, তার উল্লেখ।
৫. সমাপ্তি (Conclusion/Boilerplate):
* দলের সংক্ষিপ্ত পরিচয় (যা সব রিলিজের শেষে স্থায়ীভাবে থাকে)।
* যোগাযোগের তথ্য: প্রেস রিলিজ যিনি ইস্যু করছেন, দলের মুখপাত্র বা প্রেস উইং-এর নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম, পদবী, ফোন নম্বর ও ইমেইল ঠিকানা অবশ্যই দিতে হবে। সাংবাদিকদের অতিরিক্ত তথ্যের প্রয়োজন হলে যেন সহজেই যোগাযোগ করতে পারেন।
রাজনৈতিক প্রেস রিলিজ লেখার বিশেষ কৌশল
১. স্পষ্টতা ও জরুরিত্ব: বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং হালনাগাদ হতে হবে। রাজনৈতিক বক্তব্যে অস্পষ্টতা বা দ্ব্যর্থতা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করতে পারে।
২. লক্ষ্যভিত্তিক ভাষা: প্রেস রিলিজটি কি সাধারণ জনগণ, সমর্থক, বিরোধী দল, নীতিনির্ধারক না আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে লেখা হচ্ছে? শ্রোতাভেদে ভাষা ও কৌশল পরিবর্তন করতে হয়।
৩. তথ্যনির্ভরতা: কোনো দাবি বা অভিযোগ করার সময় যথাযথ তথ্য, পরিসংখ্যান বা রেফারেন্স ব্যবহার করতে হবে। ভিত্তিহীন বা অতিরঞ্জিত বক্তব্য দলের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করে।
৪. নেতিবাচকতা এড়ানো: বিরোধী দল বা ব্যক্তিকে সরাসরি আক্রমণাত্মক ভাষায় উল্লেখ না করে, দলের নিজস্ব নীতি, পরিকল্পনা ও ইতিবাচক দিকগুলোর উপর জোর দেয়া বেশি ফলদায়ক। সমালোচনা করতে হলে তা যুক্তি ও প্রমাণ সহকারে এবং শালীন ভাষায় উপস্থাপন করতে হবে।
৫. সময়নিষ্ঠা: সময়মতো প্রেস রিলিজ জারি করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ঘটনা বা বিবৃতির পর দেরি করে প্রতিক্রিয়া জানালে তার প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব হারায়।
৬. সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা বুঝা: প্রেস রিলিজ এমনভাবে লিখতে হবে যাতে সাংবাদিকের জন্য সেটি থেকে সরাসরি সংবাদ তৈরি করা সহজ হয়। সংবাদমাধ্যম কী ধরনের বিষয় পছন্দ করে, কোন কোণ থেকে খবর করলে তাদের আগ্রহী করবে – তা বোঝা জরুরি।
যা অবশ্যই পরিহার করতে হবে
-
অপ্রয়োজনীয় ও দীর্ঘভাষণ করা।
-
অত্যাধিক রাজনৈতিক জargon বা কাঠামোবদ্ধ ভাষা ব্যবহার যা সাধারণ পাঠকের বোধগম্য নয়।
-
ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অশালীন ভাষা।
-
বানান ও ব্যাকরণগত ভুল। বাংলা একাডেমী নির্দেশিত বানানরীতি মেনে চলা আবশ্যক।
-
অসত্য বা সন্দেহজনক তথ্য উপস্থাপন।
রাজনৈতিক প্রেস রিলিজ কেবল একটি প্রচারপত্র নয়, এটি দলের আনুষ্ঠানিক ও দায়িত্বশীল কণ্ঠস্বর। এটি পরিকল্পনা, সততা ও কৌশলের সমন্বয়ে লিখতে হয়। একটি ভালো প্রেস রিলিজ সংবাদমাধ্যমে কভারেজ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়, পাবলিক ন্যারেটিভ গঠনে ভূমিকা রাখে এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে।
লেখাটি জাহাঙ্গীর আলম শোভনের ‘প্রেস রিলিজ গাইডলাইনস’ বইয়ের আলোকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উপযোগী করে প্রস্তুত।

