Democracy Politics

‘‘তুলনামূলক ভালো’’ তত্বে অজান্তেই আটকে আছে জাতি

‘‘তুলনামূলক ভালো’’ তত্বে আটকে আছে দেশ

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

 

‘‘তুলনামূলক ভালো’’ তত্ব এ আবার কি জিনিস?  নতুন আর ভাসা ভাসা ধারণা পরিষ্কার করার আগে একটি কৌতুক শোনাই।

গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হলে নতুন চেয়ারম্যান আসে। তিনি যাই করেন সেটা ‘‘আগের চেয়ারম্যান থেকে ভাল’’ এটাই তিনি জনগনকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। তিনি মেম্বার, সেক্রেটারি, চৌকিদার সবাইকে এমনটাই নির্দেশ দিয়েছেন। জনগন, প্রশাসনের লোক যেকোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি যেন বলেন, ‘‘সবকিছু আগের চেয়ে ভাল’’ মানে আগের চেয়ারম্যান থেকে ভাল।

তো গ্রামে একবার এক লোকের অপমৃত্যু হয়েছে। লাশ রাখা আছে যথাস্থানে। থানার ওসি এসে বলেন, চৌকিদার।

চৌকিদার একটা স্যালুট ছুড়ে বলল, ইয়েস স্যার।

ওসি জোর গলায় জানতে চাইলেন,  লাশের কি অবস্থা?

চৌকিদার বলল, আগের চেয়ে ভাল স্যার।

বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর শুধু কে কার চেয়ে ভাল সেটুকু করার আর বলার জন্য সবাই মরিয়া হয়ে যায়। দেশের মানুষ কেমন আছে। তাদের কতটা ভাল থাকা দরকার। সারা বিশ্ব এখন কোথায় গিয়েছে আমাদের যাওয়া দরকার সে ব্যাপারে সবাই বেমালুম চেপে যান।

শুধু যে রাজনীতির মাঠে তুলনামূলক ভাল তত্বে চলে তা নয়। আমলাতন্ত্রও এর মধ্যে শামিল। মানে শুধু চেয়ারম্যান নয় চৌকিদারও একই স্লোগান দেয়।

যখন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে। সরকারের মন্ত্রী এমপিকে সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরের আমলারা বিভিন্ন পরিসংখ্যান এবং তথ্য দিয়ে দেখান যে, সবকিছু আগের সরকারের চেয়ে ভালোর দিকে আছে।

পুলিশ দেখায়, খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ সব আগের চেয়ে কম।

রাজস্ব বোর্ড দেখায়, রাজস্ব আগের চেয়ে বেশী

বিনিয়োগ বোর্ড দেখায়, বিনিয়োগ আগের চেয়ে বেশী এসেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেখায়, দ্রব্যমূল্য আগের হারে বাড়ছে না।

এর মধ্যে নানা শুভংকরের ফাঁকিও আছে। একই আয় তিন বার গুনে তিন মন্ত্রণালয় সেটাকে ৩ গুণ বাড়ায়। অপরাধের তথ্য গোপন করে। এক ধরনের অপরাধকে অন্য ধরনের ক্যাটাগরিতে ফেলে পরিসংখ্যা ঠিক করে। কখনো কখনো পুরোটাই ভূয়া তৈরী করে দেখানো হয়।

যেমন, রাজস্ব বাড়ে কিন্তু দেশের অর্থনীতির সাথে সমানুপাতিক হারে বাড়ে কিনা সেটা দেখা হয় না। অপরাধ কম দেখানো হয় কিন্তু ডাকাতি চুরি বানানো হয়েছে কিনা সেটা চেপে যাওয়া হয়। বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিকে সফলতা হিসেবে দেখানো হয়। দ্রব্যমূল্য কমছে কিনা বা স্থিতিশীল আছে কিনা সেটা দেখানো হয় না। গত বছর মূল্যস্ফ্রিতি ছিল ১২%  এ বছর ৯% এরকম বিশ্লেষণ দিয়ে নিজেদের কাজকে মূল্যায়ন করা হয়। আর আমলাদের এই তথ্য উপাত্তের কাছে মন্ত্রী আর উপদেষ্ঠারা খুশিতে গদ গদ হয়ে তিনবার টাইয়ের নব ঠিক করে তারপর তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে চেয়ারে বসেন সকাল বিকাল।

চলতি বছর আইন শৃংখলা নিয়ে প্রশ্ন উঠায় এ ধরনের জবাব দিয়েছিল পুলিশ দপ্তর। ঠিক  এ ধরনের জবাব সব দপ্তরে পাবেন। বর্তমান নয় অতীতেও এসব হয়েছিল। আর সরকার ও প্রশাসনের কাঠামোগত পরিবর্তন না হলে এমনটা হতেই থাকবে।

এই ‘‘আগের চেয়ে ভাল’’ কেন শুভংকরের ফাঁকি সেটা একটু ব্যাখ্যা করা যাক-

প্রথমত- এর মাধ্যমে আমলারা এবং নেতারা মিথ্যা সাফল্য দেখান, এবং একই কারণে তাদের আরো ভাল করার যে চিন্তা সেটি নষ্ট হয়ে যায়। মিথ্যা আত্মতৃপ্তি তাদেরকে কাজ করতে পরোচিত করে না। পরিস্থিতি একসময় আগের চেয়ে খারাপ হয়ে যায়। তখন তারা অন্য কিছুকে দোষারোপ করেন। তারা যে সঠিক বিবেচনা ও সঠিক অগ্রগতি সাধন করতে পারেন নি। সেটা তারা বুঝতে পারেন না।

দ্বিতীয়ত, কখনো কখনো এই ‘‘আগের চেয়ে ভাল’’ দেখানোর জন্য নানারকম অনিয়ম ও তথ্য গায়েব হয়। কারণ আগের চেয়ে ভাল দেখানো একটা প্রতিযোগিতা সবক্ষেত্রে শুরু হয়। তখন মূল কাজ বাদ দিয়ে মিথ্যা প্রতিবেদন তৈরী আসল কাজ হয়ে যায়। আর এভাবে দেশ পিছিয়ে যেতে থাকে।

তৃতীয়ত, সবকিছু ‘‘আগের চেয়ে ভাল’’ দেখিয়ে নেতারা যেমন জনগনকে ঠকান। তেমনি আমলারা নেতাকে বিভ্রান্ত করেন। তারা নেতার প্রিয় হয়ে অযোগ্যরা বড় চেয়ার দখল করেন। এভাবে বছরের পর বছর অযোগ্যদের উপরে উঠার প্রতিযোগিতায় সবক্ষেত্রে ভারসাম্য নষ্ট হয়। আর রাষ্ট্র চলে উল্টো পিরামিড পদ্ধতিতে। যার মানে হলে উপরে চলে যায় ভার আর নিচে চলে আসে ধার। এরপর কোনো এক দিক থেকে ঠিকমতো ধাক্কা দিতে পারলে পড়ে যায়। আর না পড়লেও সঠিক অগ্রগতি হয় না।

যদি তুলনামুলক ভালো’র এই তেত্বে না চলে দেশ সঠিক, বাস্তব, প্রয়োজনীয় ও বৈশ্বিক চাহিদাকে ধারণ করতে তাহলে আমাদের সমস্যা আরো কমে আসতো। এখান থেকে অন্যান্য সমস্যাকেও সমাধান করা যেত।

আগের চেয়ে ভাল তত্ব ভুল নয়। কিন্তু এটাই একমাত্র তত্ব হতে পারে না। আগের চেয়ে ভাল হতে হবে। কিন্তু তার গতি ও পরিমাণ হতে হবে। বৈশ্বিক গতির বেশী বা সমান। সেটা অল্প  একটু ভাল হলে আমরাতো পিছিয়েই থাকবো।

কথায় কথায় আমরা সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দেই। আমি অতদূর যাবো না। আমরা যদি ভারতের কথাই ভাবি। আমাকে যদি ভারতের সমান উন্নতি করতে হয় তাতেও আমার গতি ভারতের চেয়ে ১০% বেশী থাকতে হবে। তাহলে ১০ বছর পর ভারতের সমান হবে। এমনকি ভারতের সমান থাকলেও আমরা সব সময় পিছিয়ে থাকতে হবে।

এছাড়া আমাদের নিজস্ব সমস্যাগুলো কি কি? কোনটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোন নীতি ও কাঠামোগত সমস্যার কারণে এসব সমস্যা বছরের পর বছর সমাধান হচ্ছে না। সেগুলো ধরে ধরে কাজ করতে হবে। বদলে নিতে হবে। সেটা একবার নয়। ক্রমশ পরিবরতনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আমেরিকার ভিসা নীতি বছরে কয়বার পরিবরতর আসে ? কেন আসে? সেগুলো বুঝতে হবে। একটা পরিবরতনে সবকিছু বদলে যাবে না। তবে শুরু করতে হবে।

জানি না কবে আমরা সে বাস্তবিক দেখতে পাবো।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply