ak party

তুরস্কের একে পার্টি রাজনীতি ও সংগঠন

তুরস্কের একে পার্টি রাজনীতি ও সংগঠন

তুরস্কে ১৯৮০-এর দশক থেকে ৯০-এর দশকে ইসলামপন্থী (Islamist) বা ধর্মীয়-আকর্ষিত রাজনৈতিক দলগুলোর উর্ত্তান ও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। উদাহরণস্বরূপ Refah Partisi (Welfare Party) ১৯৯৫-এ বড় সাফল্য পায়।

কিন্তু সেক্যুলার (পার্থিব-ধর্মীয় পৃথকীকরণ) সংবিধান ও সেনাবাহিনীর এক সর্বোচ্চ অবস্থানের কারণে অনেক ইসলামপন্থী দল বাতিল হয় বা সঙ্কুচিত হয়। এই অবস্থায় ২০০১ সালের ১৪ আগস্ট (অন্যান্য উৎসে ১৬ আগস্টও বলা হয়) AKP প্রতিষ্ঠিত হয়।

দলটির নামেই “আদালেত ও ক্যালকিনমা” অর্থেই “ন্যায় ও উন্নয়ন” বোঝায়। নামে AK (“আক”) শব্দের অর্থ তুলনায় “শ্বেত”, “বিশুদ্ধ” (turkish “ak” = white / clean) রূপে ধরা হয়।

প্রতিষ্ঠার সময় দলের নেতৃত্বে ছিলেন রেসেপ তয়্যিব এরদোগান (চুক্তিতে প্রথমে দলীয় চেয়ারম্যান হন) ও আবদুল্লাহ গুল ছিলেন সংযুক্ত কার্যমূলে।

২. ইতিহাস ও উত্থান

AKP ২০০২ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিয়ে মাত্র দেড় বছরের মধ্যে বড় সাফল্য পায়। ৩ নভেম্বর ২০০২-এ নির্বাচনে দল অংশ নেয় এবং প্রায় ৩৪.২৮ % ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।

তার পর থেকেই AKP তুরস্কের রাজনীতিতে প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠে।

  • প্রথম সময়ে AKP “কনসারভেটিভ ডেমোক্রেসি” (conservative democracy) নামে নিজেকে স্থাপন করে — অর্থনৈতিকভাবে মুক্তবাজারপন্থী, সামাজিক উন্নয়নমুখী, ইসলামিক রুটের হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিপাদ্য রাখার চেষ্টা করে।

  • দলটি সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা ও বুরোক্রেসি-সংক্রান্ত পুরনো “প্রতিষ্ঠান” (শাসক-বিভাগ)-এর বিরুদ্ধে একটি নতুন রাজনৈতিক ভেতরচিন্তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসে।

৩. আদর্শ ও কৌশল

আদর্শ

  • পার্টিটির মূল বক্তব্য হলো: ন্যায় (justice), উন্নয়ন (development) ও বদলে দেওয়া তুরস্ককে এক নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক দিক দেওয়া।

  • যদিও ইসলামিক রূট রয়েছে, তারা নিজেদের “ধর্মীয় দল” হিসেবে নয়, “ধর্মীয় রুটসহ একটি আধুনিক রীতি-সংগঠিত দল” হিসেবে উপস্থাপন করে।

  • বাজারমুখী অর্থনৈতিক নীতি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন-মুখী প্রবেশাধিকার, সামাজিক সেবা বৃদ্ধির দিকে নজর ছিল।

কৌশল

  • বহুভাষিক ও বহু-আঞ্চলিক ভোটার সাপোর্ট অর্জনের চেষ্টা: গ্রামীণ, শহরাঞ্চল, কনজারভেটিভ মুসলিম-বিহীন অংশ, নবউদ্যোক্তা-শ্রেণি — এসবের সমন্বয়ে “ব্রড কোঅ্যালিশন” গঠন।

  • রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে নতুন ভেতরচিন্তা ও সামাজিক প্রকল্প উদ্বোধন করে সেবামুখী ইমেজ গঠন।

  • পুরনো রাজনৈতিক কাঠামো (যেমন সামরিক এবং বিচারব্যবস্থা কর্তৃত্ব)-র বিরুদ্ধে ‘মিডল ক্লাস’, ‘উন্নয়ন’ ও ‘জনবিচার’-ভিত্তিক ভাষ্য গ্রহণ।

  • গণ-ভোট ও নির্বাচনে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার (চাকরি, আবাসন, স্বাস্থ্য) উপর বেশি জোর — ধর্ম বা মানসিকতা নয়, কার্যকর সেবা আরও বেশি।

৪. কর্মপদ্ধতি

  • নির্বাচনের আগে এবং পরে সেবা-প্রকল্প যেমন ইনফ্রাস্ট্রাকচার উন্নয়ন, আবাসন প্রকল্প, স্বাস্থ্য সেবা সম্প্রসারণ, সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে কাজ করা হয়।

  • সংগঠন-ভিত্তিক কাজ: কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি, প্রদেশীয় এবং জেলা-স্তরে শক্তিশালী পার্টি যন্ত্রনালিকা।

  • প্রচারভিত্তিক স্ট্র্যাটেজি: মিক্সড মিডিয়া (টিভি, স্থানীয় সংবাদমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া) ব্যবহার।

  • গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কল্যাণমূলক কাজের ওপর — যাতে সাধারণ মানুষের কাছে পার্টি “সেবামূলক” অভিনয়কারী হয়ে ওঠে।

  • সময় সময় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, মিডিয়া, বিচারব্যবস্থা ইত্যাদির সঙ্গে কূটনীতি ও সংলাপ/সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান সুনিশ্চিত করে চলেছে। উদাহরণস্বরূপ ২০০৮ সালে AKP-র বিরুদ্ধে বিচারিক বন্ধের মামলা হয়।

৫. সফলতা

  • ২০০২-এর নির্বাচনেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া এবং এরপর একাধিক নির্বাচনে জয়লাভ করা – এটি এতদিন ধরে তুরস্কে বিরল।

  • অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগের দৃষ্টিতে তুরস্কের উন্নয়নচিত্র বেশ চোখে পড়ার মতো হয় ২০০০-এর দশকে।

  • সামাজিক সেবা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ইনফ্রাস্ট্রাকচারে বেশ উদ্যোগ। — গ্রামীণ এলাকা, কম উন্নত অঞ্চলেও পার্টি-উদ্যোগ দেখা গেছে।

  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে AKP-র ভূমিকা অনেক পর্যায়ে প্রতীয়মান।

৬. টিকে থাকার কারণ

  • ব্রড ভোটার ভিত্তি গঠন: শুধুমাত্র ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ভোটার নয়, মধ্যবিত্ত, শহরাঞ্চল, নতুন ব্যবসায়ী শ্রেণি, গ্রামীণ উন্নয়নপ্রত্যাশী ভোটারও অন্তর্ভুক্ত।

  • সময়োপযোগী জনপ্রিয় প্রকল্প – দ্রুত সেবা-প্রদান, সমাজ-আধুনিকীকরণ, অর্থনৈতিক সুযোগ-সৃষ্টি।

  • শক্তিশালী পার্টি যন্ত্রনালিকা ও নেতৃত্ব (এরদোগান-গঠিত ব্যবস্থা)-র কারণে দলীয় অভ্যন্তরীণ সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে।

  • প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বলতা ও পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর ক্রমাগত জনপ্রিয়তা হ্রাস-পাওয়া।

  • “উন্নয়ন ও সেবা” ভোক্ (rhetoric) প্রচারমাধ্যমে শক্তিশালীভাবে ব্যবহার করা।

  • তবে টিকে থাকার ক্ষেত্রে একাধিক সামনে চ্যালেঞ্জও দেখা গেছে (নিচে)।

৭. কল্যাণমূলক কাজ

  • সরাসরি সামাজিক সেবা: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন প্রকল্প।

  • শোষিত বা আঞ্চলিকভাবে পেছনে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য সুযোগ সৃষ্টি।

  • স্থানীয় কর্মকাণ্ডে (মিউনিসিপ্যালিটি-স্তর) পার্টি-সংযুক্ত প্রশাসন সচল করে জনগণের সঙ্গে সংযোগ গঠন।

  • উদাহরণস্বরূপ, ২০০৪-এর ইস্তানবুল মেয়র নির্বাচনে AKP জয় পান; স্থানীয় প্রশাসনে সেবামূলক কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব সেখানে দেখা গেছে।

৮. চ্যালেঞ্জ ও টিকে থাকার বিপদ

  • সময়ের সঙ্গে সঙ্গে AKP-র স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সেক্যুলার নীতির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

  • কিছু সমালোচনায় বলা হয়, দল প্রথম সময়ে যে “উন্নয়ন ও খোলা বাজার” দৃষ্টিভঙ্গা নিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে অনেকটাই কংগ্রেসমূলক বা একনায়ক রাজনীতির দিকে গড়িয়েছে।

  • বিচারমূলক ও সংসদীয় স্বাধীনতা, মিডিয়া-স্বাধীনতা ইত্যাদিতে প্রশ্ন উঠেছে।

  • ভোটারদের নতুন প্রত্যাশা ও পরিবর্তনশীল সামাজিক মনোভাব (বিশেষ করে যুবসমাজ, নগরাঞ্চল) দলকে নতুন চ্যালেঞ্জ দিয়েছে।

  • অর্থনৈতিক মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক দেনা বৃদ্ধি এসব পরবর্তী সময়ে পার্টির জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

AKP-র উদয় তুরস্কের রাজনৈতিক ইকোসিস্টেমে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নিয়ে আসে — ধর্মীয় রুট থাকা সত্ত্বেও একটি নতুন ধরনের “উন্নয়নমুখী, বাজারমুখী, সেবা-প্রদানকারী” দল হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করে। সফলতা পেয়েছে দ্রুত নিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায়। তবে টিকে থাকার জন্য কেবল উন্নয়ন বা প্রচারই যথেষ্ট নয় — গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আলোচনা-সংলাপ, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ ও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা প্রয়োজন।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply