তিব্বতে যেভাবে অহিংস ধর্ম প্রচার করেছেন বাঙালি সন্ন্যাসীরা
ভারতীয় উপমহাদেশের বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনের ইতিহাস গভীরভাবে প্রোথিত বাংলার মাটিতে। প্রাচীন বাঙালি সন্ন্যাসীরা বৌদ্ধধর্মের মহাযান ও তান্ত্রিক শাখা প্রচার করে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে মানবতার আলো ছড়িয়েছেন। সপ্তম থেকে অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত বাংলা ছিল বৌদ্ধধর্মের অন্যতম কেন্দ্র। এখান থেকেই বাঙালি সন্ন্যাসীদের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়, যা তিব্বতের সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যে গভীর প্রভাব ফেলে।
পাল সাম্রাজ্যের বৌদ্ধ পৃষ্ঠপোষকতা
বাংলার পাল সাম্রাজ্যের শাসকগণ (গোপাল, ধর্মপাল, এবং দেবপাল) বৌদ্ধধর্মের মহান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তারা নালন্দা ও বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বৌদ্ধধর্মের জ্ঞানচর্চাকে প্রসারিত করেন। পাল সাম্রাজ্যের ধর্মীয় এবং শিক্ষাগত পৃষ্ঠপোষকতায় মহাযান বৌদ্ধধর্মের বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তীতে তিব্বতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিলো পা: বাঙালি সাধকের তিব্বতীয় সংযোগ
তিলো পা, চট্টগ্রামের একজন বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। জীবনে জ্ঞানার্জনের জন্য তিনি গৃহত্যাগ করেন। কঠোর সাধনা এবং তপস্যার মাধ্যমে তিনি নির্বাণ বা সিদ্ধি লাভ করেন। তিলো পা তার শিষ্য নারো পা-কে দীক্ষা দেন, যিনি পরে বৌদ্ধ ধর্মের তত্ত্ব ও দর্শন তিব্বতে প্রচার করেন।
নারো পা’র অন্যতম শিষ্য মার পা, তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের তান্ত্রিক শাখার প্রবর্তন করেন। এই ধারাটি তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের কেন্দ্রীয় শাখায় পরিণত হয়। তিলো পা থেকে মার পা পর্যন্ত এই জ্ঞান চক্রের যাত্রা বৌদ্ধধর্মের অহিংস বার্তা তিব্বতে পৌঁছে দেয়।
নারো পা: বাঙালি সাধক থেকে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের প্রাণপুরুষ
নারো পা, মূল নাম সামন্তভদ্র বা অভয়কীর্তি, ছিলেন একজন বাঙালি তান্ত্রিক বৌদ্ধ সাধক এবং মহাসিদ্ধ। রাজপরিবারে জন্ম নেওয়া এই জ্ঞানান্বেষী ব্যক্তি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে একজন পণ্ডিত হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ডাকিনীর আহ্বানে তিনি তার গুরু তিলো পা’র সন্ধানে বের হন। তিলো পা’র শিষ্যত্ব গ্রহণের পর গুরু তাকে জ্ঞানার্জনের জন্য ১২টি কঠিন এবং ১২টি সহজসাধ্য কাজ দেন। নারো পা অধ্যবসায় ও কঠোর সাধনার মাধ্যমে সেগুলো পূর্ণ করেন এবং তিলো পা’র দর্শন আয়ত্ত করেন। নারো পা’র শিষ্য মার পা এই তত্ত্ব ও জ্ঞান তিব্বতে প্রচার করেন, যা তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
নারো পা, যিনি সামন্তভদ্র বা অভয়কীর্তি নামেও পরিচিত, ছিলেন একজন বাঙালি বৌদ্ধ সাধক এবং তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। তার জন্ম হয়েছিল একটি সম্ভ্রান্ত রাজপরিবারে। স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি সন্ন্যাস জীবনে প্রবেশ করেন এবং নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা এবং ধর্মতত্ত্বের মতো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন। তিলো পা তাকে জ্ঞানার্জনের জন্য কঠিন পরীক্ষা দেন, যেগুলো পাস করার পর নারো পা সিদ্ধিলাভ করেন। তার শিষ্য মার পা’র মাধ্যমে নারো পা’র দর্শন তিব্বতে পৌঁছে যায়। তিব্বতিরা তাকে বৌদ্ধধর্মের অন্যতম মহাসিদ্ধ হিসেবে সম্মান করে।
অতীশ দীপঙ্করের অহিংস বার্তা
বাঙালির ইতিহাসে সর্বজনবিদিত আরেক নাম হলেন অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। মুন্সিগঞ্জের বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মহাপুরুষ সারা জীবনে অহিংসা, সহনশীলতা এবং জ্ঞানের প্রচার করেছিলেন। বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় তিব্বতি রাজার আমন্ত্রণে তিনি তিব্বতে যান।
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (৯৮২-১০৫৪ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন একজন বাঙালি বৌদ্ধ পণ্ডিত, যিনি তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের পুনর্জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে তিব্বতে গমন করেন। তিব্বতে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান শাখার প্রচার ও সংস্কারে নিবেদিত ছিলেন। তিব্বতীরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাঁকে ‘অতীশ’ উপাধিতে ভূষিত করে, যার অর্থ ‘শান্তি’। তিব্বতে অবস্থানকালে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞান, কারিগরি বিদ্যা এবং বৌদ্ধ ধর্ম ও শাস্ত্র সম্পর্কে তিব্বতীয় ভাষায় গ্রন্থাদি রচনা করেন| তাঁর প্রচেষ্টায় তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের পুনর্জাগরণ ঘটে এবং তাঁর প্রভাব আজও তিব্বতী সমাজে প্রতিফলিত হয়।
তিব্বতে অতীশ দীপঙ্কর “দ্বিতীয় বুদ্ধ” নামে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি বৌদ্ধধর্মকে সুসংগঠিত করার পাশাপাশি বহু শিষ্য তৈরি করেন। তার প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মে শান্তি এবং মানবিকতার বার্তা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
তিলো পা, নারো পা, মার পা এবং অতীশ দীপঙ্করের মাধ্যমে তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্ম পেয়েছিল একটি শক্তিশালী ভিত্তি। তাদের প্রচারিত তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম এবং মহাযান দর্শনের প্রভাব আজও তিব্বতের ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোতে দৃশ্যমান। বাঙালি সন্ন্যাসীদের অহিংস ধর্ম প্রচার শুধু তিব্বতের ধর্মীয় কাঠামোকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং এই অঞ্চলের মানুষের জীবনে শান্তি, মানবতা এবং সহানুভূতির বীজ বপন করেছে। তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মের জ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনে বাংলার ভূমিকা আজও ইতিহাসের আলোয় উজ্জ্বল।
লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
সূত্র: রোয়ার বাংলা ও অন্যান্য

