ডিবিআইডি জনিত সমস্যা ও এর সমাধান প্রসঙ্গে

ডিবিআইডি জনিত সমস্যা ও এর সমাধান প্রসঙ্গে

ডিবিআইডি জনিত সমস্যা ও এর সমাধান প্রসঙ্গে
জাহাঙ্গীর আলম শোভন

বিগত ২০২২ সালের ০৬ ফেব্রুয়ারী ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের তালিকাভুক্তির লক্ষ্যে ডিবিআইডি চালু করা হয়। বিগত সময়ে এই বিষয়ে খুব বেশী সচেতনতা গড়ে উঠেনি এবং আবেদনের হার উদ্যোক্তার হারের চেয়ে নগন্য। তদুপুরি আবেদনকারীদের মধ্য থেকে ১৫% আবেদন গৃহিত হয়েছে বাকী ৮৫% আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। অনেকে ৬ থেকে ৭ বার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বলে জানিয়েছে। জানা যায় ক্রটিপূর্ণ আবেদন এর কারণে এই সমস্যা হয়েছে। এছাড়া যেসব আবেদন গৃহিত হয়েছে সেসবের ৫-৭% এর মধ্যে নানারকম অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছে। একদিকে ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন, এনআইডি এবং অন্যান্য শর্তপূরণ করার পরও ই-ক্যাবের সদস্যরা ডিবিআইডি পাচ্ছেননা বলে প্রতিনিয়ত ই-ক্যাবের নিকট অনুযোগ করছে অন্যদিকে এমএলএম কোম্পানী ও নানারকম অসঙ্গতিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ডিবিআইডি পেতে সক্ষম হয়েছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে যেমনি ধোঁয়াশা তৈরী হয়েছে তেমনি তৈরী হয়েছে হতাশা। এভাবে চলতে থাকলে ডিবি আইডি উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক হওয়ার পরিবর্তে একটি প্রতিবন্ধকতায় রুপ লাভ করবে।

সমস্যা ১: ডিবিআইডি আবেদন সংখ্যা
দেশে ক্ষুদ্র ও ই-কমার্স উদ্যোক্তাসহ প্রায় ২ লাখ অনলাইন উদ্যোক্তা রয়েছে। কিন্তু ডিবিআইডির জন্য গত দেড় বছরে আবেদনকারীর সংখ্যা ১০ হাজারের কম। এর কারণ হিসেবে যেসব বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে:
ক) ডিবিআইডি ছাড়াও অনলাইন ব্যবসা করা যায়।
খ) ডিবিআইডি রেজিস্ট্রেশন করলে তেমন কোনো উপকার হয়না।
গ) ডিবিআইডি আবেদন প্রক্রিয়া বাহ্যিকভাবে সহজ বলা হলেও ধাপে ধাপে নানা জটিলতা রয়েছে।
ঘ) ব্যাপক হারে আবেদন বাতিল হওয়ার কারণে উদ্যোক্তাদের আগ্রহের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

সমাধান
ক) ডিবিআইডি প্রদান প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করার আগে এটি বাধ্যতামূলক করা ঠিক হবে না। বাধ্যতামূলক করার জন্য জটিলতাসমূহ নিরসন করা জরুরী।
খ) ডিবিআইডি’র মাধ্যমে কিছু সুবিধা পাওয়া নিশ্চিত করা যায়।
গ) আবেদনপ্রক্রিয়ায় জটিল শর্তগুলো প্রত্যাহার করা।
ঘ) আবেদন বাতিলের হার কমানোর জন্য যেসব ইস্যুতে আবেদন বাতিল হয় সেসব ইস্যু ঠিক আছে কিনা একটি হ্যাঁ/না প্রশ্নমালা আবেদনপত্রের শুরুতে যুক্ত করা যায়।

সমস্যা ২: ডিবিআইডি বাতিলের হার
ব্যাপকহারে ডিবিআইডি বাতিল হওয়া একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ইতোমধ্যে এই বিষয়ে পত্র-পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ৮৫% ডিবিআইডি বাতিলের বিষয়টি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।

সমাধান:
ক) এজন্য ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ আবেদন যেন গৃহিত না হয়। সেভাবে আবেদনপত্র তৈরী করতে হবে।
খ) আবেদনটিতে কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে ফোন করে বা মেসেজ দিয়ে আবেদনকারীকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেটি ঠিক করার জন্য সময় দিতে হবে।
খ) ই-ক্যাবসহ ৫টি আইসিটি এসোসিয়েশন এর সদস্যদেরকে ৩ ধাপের যাচাই প্রক্রিয়ার পরিবর্তে ১ ধাপের যাচাই প্রক্রিয়ায় ৭ দিনের মধ্যে ডিবিআইডি দেয়ার ব্যবস্থা করা।
খ) ই-ক্যাবসহ ৫টি এসোসিয়েশনের সদস্যদেরকে যাচাই করার সুযোগ এসোসিয়েশনকে প্রদান করা।
সমস্যা: ৩: নন ডিজিটাল বিজনেসকে ডিবিআইডি প্রদান
ডিবি আইডি তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে ৬টির বেশী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যাদের কোনো ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেইজ না থাকা সত্বেও তাদেরকে ডিবিআইডি দেয়া হয়েছে।

সমাধান:
ক) যারা ডিবিআইডি দিচ্ছেন তাদের জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করতে হবে।
খ) একটি গুরুত্বপূর্ণ কলাম পূরণ ব্যতিত কিভাবে ডিবিআইডি দেয়া হচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে হবে।

সমস্যা ৪: ডিবিআইডি তালিকায় ডিবিআইডি প্রদর্শণ না করা
ডিবিআইডির ওয়েবসাইটে যে তালিকা প্রকাশিত হয় তাতে ডিবিআইডি নাম্বার প্রদর্শণ করা হয়না। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিবিআইডি ক্রেতা বা অন্যকেউ যাচাই করতে পারে না।
সমাধান: ডিবিআইডি তালিকায় ডিবিআইডি নাম্বার প্রদর্শণ করতে হবে।
সমস্যা ৫: ডিবিআইডি ক্রম
ডিবি আইডি যে তালিকা প্রদর্শণ করা হয় তাতে যে ক্রম প্রদর্শন করা তা শুরুর ক্রম থেকে নয়। শেষের ক্রম থেকে। ফলে প্রতিবার নতুন কেউ যুক্ত হলে পুরো ক্রমিক নাম্বার বদলে যায়। এতে করে বিভ্রান্তি তৈরী হয়।
সমাধান:
অনুমোদনের ক্রম অনুসারে ক্রমিক নাম্বার থাকা উচিত। এই বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ডিবিআইডি সংক্রান্ত কমিটিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে তা বাস্তবায়ন করা জরুরী।

সমস্যা বা ত্রুটি-৬: ব্যক্তি নামে ডিবিআইডি
প্রথম ১ হাজারের মধ্যে কমপক্ষে ২ টি ডিবিআইডি পাওয়া গিয়েছে যাদেরকে ব্যক্তি নামে ডিবিআইডি দেয়া হয়েছে। ব্যক্তি নামে ডিবিআইডি দেয়া হলে ডিবি আইডি যেমন প্রশ্ন বিদ্ধ হবে। তেমনি এর অপব্যবহারও হতে পারে।
সমাধান: কাউকে ব্যক্তি নামে ডিবিআইডি দেয়া হবে কিনা এটা নির্দেশিকায় না থাকলেও এটি যেহেতু মূলনীতির সাংঘর্ষিক তাই এই বিষয়ে সংশোধন করতে হবে। তা না হলে ডিবিআইডি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরী হতে পারে।

ত্রুটি ৭: বাংলা নামের জায়গায় ইংরেজী নাম
আবেদন ফর্মে ইংরেজী নামের পাশাপাশি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নাম বাংলাতে থাকার শর্ত রয়েছে। অথচ অন্তত ৩০টির বেশী প্রতিষ্ঠানকে ডিবিআইডি দেয়া হয়েছে যারা বাংলা বানানে প্রতিষ্ঠানের নাম লিখেনি।

সমাধান:
বিষয়টি খুব বড়ো না হলেও যেহেতু এটি একটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত তাই বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। এজন্য আবেদন করার পর অনুমোদন এর আগে পর্যন্ত ৩০ দিন যাবত সংশোধন এর সুযোগ রাখা যেতে পারে।

ত্রুটি ৮: এমএলএম কোম্পানীকে ডিবিআইডি প্রদান
এই বিষয়টি খুব স্পর্শকাতর। জনগনের কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে জেলে রয়েছে এবং নিউজ প্রকাশিত হয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানকে ডিবিআইডি প্রদান করা হয়েছে। শুধু তাই নয় এসব প্রতিষ্ঠান ডিবিআইডিকে এমএলএম এর লাইসেন্স হিসেবে প্রকাশ করে জনগনকে বিভ্রান্ত করছে।
সমাধান:
অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের ডিবিআইডি বাতিল করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
ত্রুটি ৯: অনলাইন ফার্মাসীকে ডিবিআইডি প্রদান
দুই এর অধিক প্রতিষ্ঠান তালিকাতে পাওয়া গিয়েছে যারা অনলাইনে ঔষধ বিক্রি করার জন্য ডিবিআইডি দেয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ‘‘অনলাইন ফার্মাসি লাইসেন্স’’ ব্যতিত অনলাইনে ঔষধ বিক্রি করা বেআইনি।
সমাধান
যেহেতু এটি আইনের লঙ্গন তাই এসব বিষয়ে অনুমোদনের দায়িত্ব থাকা ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব ব্যবসার ক্ষেত্রে বিশেষ লাইসেন্স প্রয়োজন। সেসব ব্যবসার ডিবিআইডির ক্ষেত্রে রক্ষলশীলতার প্রয়োজন রয়েছে।

ইস্যু ১০: কোম্পানী নাম এবং ওয়েবসাইট নামে ভিন্নতা
ই-ক্যাবের কাছে থাকা তথ্যমতে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের ডিবিআইডি আবেদন খারিজ করা হয়েছে। কারণ তাদের কোম্পানী নাম ও ওয়েবসাইট নাম এক নয়। কিন্তু ৬% এর বেশী ডিবিআইডি পাওয়া গিয়েছে যাদের নামের ভিন্নতা সত্বেও ডিবিআইডি দেয়া হয়েছে। এ ধরনের দ্বৈত আচরণ পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সমাধান: এক্ষেত্রে যেসব প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইটে মালিকানার প্রমাণক প্রদর্শণ করবে তাদেরকে ডিবিআইডি প্রদান করা উচিত। যাদের প্রমাণক থাকবেনা তাদের ক্ষেত্রে কোনোমতেই সমীচিন হবে না।

সমস্যা ১১: দারাজের নামে অন্য ব্যক্তিকে ডিবিআইডি প্রদান
দারাজ একটি মার্কেটপ্লেস। এখানে কমপেক্ষ ৫০ হাজার বিক্রেতা রয়েছে। যেহেতু দারাজের সব ধরনের লাইসেন্স রয়েছে তাই এখানকার বিক্রেতাদের ডিবিআইডি প্রয়োজন নেই।

সমাধান ও করনীয়
এ ধরনের সুযোগ থাকা উচিত নয়। তাহলে দারাজের নামে এমন অনেকে ডিবিআইডি নিয়ে যাবে কিন্তু কোনো অপরাধ সংগঠিত হলে তাদের অনলাইন প্লাটফর্ম সম্পর্কে জানার সুযোগ থাকবেনা।
ভুল ১২: ই-ক্যাবের নামে ডিবিআইডি
ই-ক্যাব হচ্ছে ই-কমার্স খাতের বাণিজ্য সংগঠন। ই-ক্যাব অলাভজনক সমিতি তাই তার এ সংক্রান্ত ব্যবসা নেই। তাছাড়া ই-ক্যাব থেকে আবেদনও করা হয়নি। কিন্তু ই-ক্যাবের নামে অন্য কেউ ডিবিআইডি নিয়েছে।

সমাধান
স্পর্শকাতর বিষয়সমুহে আরো সতর্ক হতে হবে। অনুমোদনকারী কর্মকর্তাদের সাথে নিয়মিত ই-ক্যাবের সভার আয়োজন করা যেতে পারে। প্রয়োজনী নির্দেশিকা হালনাগাদ করা যেতে পারে।

অন্যান্য
০৬ ফেব্রুয়ারী ১২জন উদ্যোক্তাকে ডিবিআইডি দেয়ার জন্য সচিবালয় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এমনকি তাদের নামও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তথাপি কারিগরি সমস্যার কারণে তাদের ৫ জন পরবর্তীতে আরো ৩ জন ডিবিআইডি পেলেও বাকীরা এখনো ডিবিআইডি পাননি। তাই তাদের ডিবিআইডি নিশ্চিত করতে হবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply