ই-কমার্স ট্রেড লাইসেন্স

ট্রেড লাইসেন্স আইনের সংশোধন কি থমকেই থাকবে?

ট্রেড লাইসেন্স আইনের সংশোধন কি থমকেই থাকবে?

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

বর্তমানে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে ব্যবসার অনুমতিপত্র বা বৃত্তি লাইসেন্স বা পেশার লাইসেন্স বা ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। স্থানীয় সরকার যথা ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন থেকে এই সনদ গ্রহণ করতে হয়। বর্তমানে ‘‘ট্রেড লাইসেন্স অ্যাক্ট ২০১৬’’ এর অধীনে এই বৃত্তি সনদ দেয়া হয়। মানে এই আইনে যে যে পেশায় সনদ দেয়ার বিধি রয়েছে সে সব পেশার উপর সনদ পাওয়া যায়। কোন ব্যবসায় কত টাকা ট্রেড লাইসেন্স সেটাও আইনে উল্লেখিত রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো সব ব্যবসায়িক উদ্যোগের কথা কি এই আইনে আছে? উত্তর হলো –না নেই? স্বভাবতই প্রশ্ন আসে যে, তাহলে যাদের ব্যবসার কথা এই আইনে উল্লেখিত নেই। তারা কি করেন? তারা কি সে ব্যবসা থেকে বিরত থাকেন নাকি তারা ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা করেন নাকি তারা অন্য ক্যাটাগরিতে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে কর্ম সম্পাদন করেন। এর উত্তর হলো, ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবসা ক্যাটাগরি না থাকলে সে ব্যবসা না করার ঘটনা কমই আছে। প্রচলিত আচরণ হলো- অন্য ব্যবসার নামে ট্রেড লাইসেন্স নেয়া। যেমন ধরেন, সিমি কন্ডাক্টর প্রস্তুতকারক। এই নামে ট্রেড লাইসেন্স করা যায়না। তাই এই খাতের উদ্যোক্তারা যে ক্যাটাগরি নির্বাচন করেন সেটা হলো কম্পিউটার হার্ডওয়ার। তবে বর্তমানে ব্যাপক সংখ্যক উদ্যোক্তা বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা রয়েছেন যারা আসলে ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াই অতিক্ষুদ্র ও আবাসিক উদ্যোগগুলো পরিচালনা করেন। তবে তারা শুধুমাত্র লাইসেন্স জটিলতার জন্য বৃত্তি সনদ গ্রহণ করেন না তা নয়। ব্যবসায়িক ঠিকানা, বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্র বছর বছর টাকা খরচ করে নবায়ন করার ঝামেলাও রয়েছে।

এই কমার্স খাতে এতো প্রসার সত্বেও এই খাতে বৃত্তি সনদ বা ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু না করা অবাক করা ব্যাপার বটে। আর এর কারণ হলো ট্রেড লাইসেন্স অ্যাক্ট সংশোধন বা হালনাগাদ না করা। সরকার এই বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পৌরসভা ও স্থানীয় সরকার থেকে যেসব নতুন লাইসেন্স এর প্রস্তাব এসেছে তার সংখ্যা সাড়ে ৩শ এর বেশী। এর মধ্যে কিছু আছে কমন প্রস্তাব। সেসব বাদ দিলে অন্তত ২শ নতুন পেশা বা ব্যবসার লাইসেন্স দেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এটা কিন্তু ২০২০ সালের কথা। গত নতুন শতাধিক বছরে আরো শতাধিক ব্যবসার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বলাবাহুল্য বেশীরভাগই আইসিটি ও আইটিইএস (আইটি এনাবল সার্ভিসেস) ভিত্তিক। শুধুমাত্র ই-কমার্স সেক্টরেই অন্তত এক কুড়ি বৃত্তি সনদের প্রয়োজন আছে। যেমন

১. অনলাইন শপ: ওয়েবসাইট ভিত্তিক ই-কমার্স শপ

২. মার্কেটপ্লেস: বহু বিক্রেতার একটি অনলাইন সেলিং প্লাটফর্ম

৩. ক্লাসিফাউড এড সাইট: শ্রেণীভূক্ত বিজ্ঞাপনের সাইট

৪. এফডিএস (ফুড ডেলিভারী সিস্টেম): অনলাইনে তৈরী খাবার সরবরাহ সেবা

৫. ই-ট্যুরিজম: অনলাইনে ট্যুর অপারেটিং সেবা

৬. ই-লার্নিং/এডটেক: ডিজিটাল/অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম

৭. হেলথটেক/ স্বাস্থ্য প্রযুক্তি: ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বাস্থ্য সেবা

৮. অনলাইন ফার্মেসী/ই-ফার্মাসি: অনলাইন ঔষধ বিক্রয় ও সরবরাহ

৯. রাইড শেয়ার: অ্যাপ ভিত্তিক রাইড (বাইক/কার) শেয়ার

১০. ওএসপি (অনলাইন সার্ভিস প্লাটফর্ম) : সেবা ভিত্তিক অনলাইন পোর্টাল

১১. কনটেন্ট প্রোভাইডার: ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও বিক্রেতা (ওটিটিসহ)

১২. এছাড়া রিটেইল ও চেইনশপ, অনলাইন সুপারশপ, অনলাইন টিকেট পোর্টাল, রিভিউ সাইট, অনলাইন পেমেন্টে গেটওয়ে (ফিনটেক), ডিজিটাল কুরিয়ার সেবাসহ আরো অনেক ব্যবসা রয়েছে যেগুলো অনলাইন লেনদেন ভিত্তিক পণ্যসেবাকে উপস্থাপন করে।

বিগত ২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মোট ৩টি সভা অনুষ্ঠিত হয় স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে। এই সভাসমূহে মোট ১৬৭ টি নতুন ট্রেড লাইসেন্স এর বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়। হয়তো আরো ২/১টি সভার মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্ত করা যেত। এমনকি জুম মিটিং বা অনলাইন সভা আয়োজন করেও সংশ্লিষ্ঠ দপ্তর ও প্রস্তাবকারীদের মতামত নিয়ে এই বিষয়টি দ্রুত চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।

আমাদের যতো ব্যবসায়িক বহুমাত্রিকতা আসবে ততবেশী কর্মসংস্থান এর সুযোগ তৈরী হবে। প্রতিটি ব্যবসা আলাদা আলাদা পরিচিতির মাধ্যমে সামাজিক ও আইনগত স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেকের পেশা সনদ হলে তারা পেশাদার ও নথিগতভাবে এর পরিচয় দিতে পারবেন। আলাদা পরিচিতির মাধ্যমে খাতগুলো বিস্তৃত ও বিকশিত হবে।

ই-কমার্স সেক্টরে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেসব প্রতিষ্ঠানে একজন মালিক বা উদ্যোক্তা ছাড়াও কর্মী নিয়োজিত আছেন। তাদের মোট সংখ্যা সাড়ে ৩ লাখ। মজার ব্যাপার হলো এই খাতে আরো দেড় লাখ ব্যক্তি রয়েছেন যারা শুধুমাত্র উদ্যোক্তা। যারা নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থান এর ব্যবস্থা করেছেন।

এছাড়া কিছু নীতি পলিসিগত বিষয় রয়েছে যেগুলোর জন্য খাত ও উপখাত ভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন স্বীকৃতির প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে এই বিষয়ে একটি ঘটনা আমরা জানি।

এসআরও নং-১৮৬-আইন/২০১৯/৪৩-মূসক। তারিখ- ১৩ জুন, ২০১৯ এখানে ই-কমার্সের যে সংজ্ঞা ছিল তাতে মার্কেটপ্লেসকে প্রকাশ করা যাচ্ছিলনা। কারণ এখানে বলা হয়েছে। অনলাইনে পণ্য বিক্রয়” অর্থ ইলেকট্রনিক নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে সেই সকল পণ্য ও সেবার ক্রয়-বিক্রয়কে বুঝাবে যা ইতিপূর্বে কোনো উৎপাদনকারী বা সেবা প্রদানকারীর নিকট হতে মূসক পরিশোধপূর্বক গৃহীত হইয়াছে এবং যাহাদের নিজস্ব কোনো বিক্রয়কেন্দ্র নাই।’’ এজন্য দীর্ঘদিন ধরে এই খাত থেকে মার্কেটপ্লেকে সংজ্ঞায়িত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরবর্তীতে ৪ জুলাই ২০২১ সালে প্রকাশিত ডিজিটাল কমার্স পরিচালনায় নির্দেশিকায় সর্বপ্রথম মার্কেটপ্লেস এর সংজ্ঞায় বলা হয়- – ‘‘মার্কেটপ্লেস অর্থ ইন্টারনেটে এক ধরনের ডিজিটাল কমার্স সাইট বা পোর্টাল যাতে এক বা একাধিক তৃতীয়পক্ষ কতৃক পণ্য সেবা সর্ম্পর্কিত তথ্যাদি সন্নিবেশ করা থাকে এবং লেনদেন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।’’ এবং পরে সম্প্রতি ২১ মে ২০২৩ এন এনবিআর প্রকাশিত এক এসআরতে সংজ্ঞাগুলো আলাদা করা হয়েছে। (১) অনলাইনে খুচরা বিক্রয় অর্থ:  ইলেকট্রনিক্স নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে সেইসব পণ্য সেবার ক্রয় বিক্রয় যা ইতোপূর্বে কোনো উৎপাদনকারী বা পণ্য সরবরাহকারী বা ব্যবসায়ির নিকট হতে মূসক পরিশোধপূর্বক ক্রয় করা হয়েছে এবং অনলাইনে খুচরা বিক্রেতা কতৃক উক্ত ক্রয়কৃত পণ্য মূসক প্রদানপূর্বক সরবরাহ করা হবে। যেক্ষেত্রে উক্ত অনলাইন খুচরা বিক্রেতার নিজস্ব কোনো (ভৌত) বিক্রয়কেন্দ্র নেই।

অনুচ্ছেদ (২) এর বলা হয়েছে ‘‘ মার্কেটপ্লেস অর্থ, ডিজিটাল মার্কেট প্লাটফর্ম যাতে এক বা একাধিক বিক্রেতা কতৃক তাদের পণ্য সেবা সংক্রান্ত তথ্যাদি সন্নিবেশ করা হয়ে থাকে এবং উক্ত প্লাটফর্মের মাধ্যমে সরবরাহ প্রদান হয়ে থাকে অর্থাৎ এক্ষেত্রে মার্কেটপ্লেস পরিচালনাকারী ব্যক্তি (ও প্রতিষ্ঠান) কতৃক কোনো পণ্য ক্রয় বা বিক্রয় করা হবে না এবং তাদের কোনো বিক্রয়কেন্দ্র থাকবেনা। ’’ (যদিও এটা হওয়া উচিৎ ‘‘অনলাইন মার্কেটপ্লেস’’ বা ‘‘ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস’’ কারণ মার্কেটপ্লেস বলতে ফিজিক্যাল মার্কেটপ্লেসও হতে পারে)।

যদিও এখানে মূসকের বিধান সংজ্ঞাতে যুক্ত করার কারণে নানা জটিলতার আশংকা রয়েছে। এই সংজ্ঞার সংশোধনীর জোরালো প্রস্তাব রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ই-কমার্সসহ অপরাপর নতুন পেশাসমূহের স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে আমাদের ব্যবসায়িক বৈচিত্র, কর্মসংস্থানে অনুপ্রেরণা এবং বিদেশী বিনিয়োগের সহায়ক ভূমিকা রাখা দরকার। আশা করি স্থানীয় সরকার বিভাগ বিষয়টি দেখবে।

 

 

 

 

 

 

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply