টেলিফোন ম্যানার্স,
ফোনে কথা বলার আদব

টেলিফোন ম্যানার্স: ফোনে কথা বলার আদব

টেলিফোন ম্যানার্স: ফোনে কথা বলার আদব

বাসের মাঝামাঝি একটি সিটে বসেছে আবিদ। তার পেছনের সিটে বসা একজনের ফোন বাজছে। অদ্ভুৎ এর রিংটোন। ‘ট্যাটু ট্যাটু ট্যাঁ টুঁ, ট্যাটু ট্যাটু ট্যাঁ টুঁ, ট্যাটু ট্যাটু ট্যাঁ টুঁ,’।
এবার তিনি ফোন ধরলেন। ‘কিরে কুদ্দুইচ্চ্যা হবেনি ফোন দিছত’ তার শব্দের যে গতি মনে হয় জানালার কাঁচ ভেঙ্গে পড়তে যাবে। অন্য সময় এই কাঁচভাঙ্গা পরিস্থিতি হলে গান ধরা যেত, ‘তোমার চুলবাঁধা দেখতে দেখতে ভাংল কাঁচের আয়না।’ এখানে গান গাওয়ার অবস্থা নেই। কানফাটা ফোন।
আবিধ বলল ভাই ‘আপনি ফোনটা বন্ধ করে কথা বলেন’’। লোকটি না বুঝে জানতে চাইল। ‘ক্যা ভাই, হোনের বিল আঁই দিছি, আর চার্জ বেইন্যা বাইত্তুম দি আইনছি। আমনের কি সমইস্যা?
আবিদ বলল, আপনি ফোন বন্ধ করে কথা বলেন, আপনার কথা এমনিই শোনা যাবে। লোকটি ফোন বন্ধ করে কুদ্দুসের সাথে আবার কথা বলার চেষ্টা করল কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে আবিদকে আবার বলতে যাবে। যে কোনো বন্ধ করে কথা বলা যাচ্ছে না। এর মধ্যে আবার ফোন খুঁজতে গিয়ে দেখ ফোন নেই, হাওয়া। বুঝেনতো পরিস্থিতিটা।
এটা ¯্রফে একটা গল্প এরকম বিভিন্নরকম পরিস্তিতি আমরা প্রতিনিয়ত সম্মুখীন হই হাটে ঘাটে মাঠে। ফোনের ব্যাপারে ভদ্রতার বিষয়গুলো এখানে বলা রইল। পড়ে রাখি, কথা বলার সময় যতটা সম্ভব মনে রাখব। পরে কয়দিন পর পর আবার যদি এই অধ্যায়টা পড়ি তাহলে আরোবেশী চর্চা করার সুযোগ পাওয়া যাবে।

* মার্জিত সুন্দর রিংটোন সেটা করুন। সেটা গান হলেও যেন রুচিসম্মত হয়। কলার টিউন শুধু যিনি কল করবেন তিনি শোনেন সেজন্য আমরা কতো গান বা মজার কথা সেট করি। আর রিংটোন যেহেতু আশপাশে আরো ২/৪জন শোনে তাই এটাও দশজনের রুচি পছন্দ ও সুবিধা অসুবিধার কথা ভেবে করতে হয়। আপনার গা থেকে আরেকজনের গায়ে ময়লা লেগে যদি পরিবেশ দূষণ হয় তাহলে আপনার শব্দের কারণে অন্যকারো স্বাভাবিক কাজে ব্যাঘাত ঘটালে সেক্ষেত্রে শব্দ দূষনের ব্যাকরণে পড়তে কতক্ষণ? টোনের সাউন্ড ভলিউম হবে মাঝারী বা মাঝারি থেকে কম করে রাখুন। আর মিটিং কিংবা নামাজের সময় বন্ধ করে রাখুন।
* কলার টিউনের ক্ষেত্রে গান বেশ জনপ্রিয়। তবে গান সবই পছেন্দর এবং বাছাইকরা ভিন্ন ভিন্ন দলের ক্রেতাদের জন। তবুও অন্যদের রুচি পছন্দ বিবেচনা করেই এটা করা উচিত। অন্যকোনো টোন বা শব্দের উৎস সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য।
* যখন অন্যের সাথে কথা বলবে তখন উচ্চস্বরে কথা বলার দরকার নেই। কারণ আপনি যেমন ফোনের সাথে মুখ রেখে আছেন সে লোকটিও কান দিয়ে আছে। তাই চিৎকার করার কিছু নেই। ‘চিল্লাইয়া মার্কেট ফাওন যাইবোনা’। বরং আস্তে ও মার্জিতভাবে কথা বলুন। কথা না বোঝার আশংকা থাকলে একটি নিরিবিলিতে কথা বলুন, গতি কমিয়ে স্পষ্ট করে বলুন।
* কাউকে ফোন করলে প্রথমে সালাম দিন। সালামটা যতটা সম্ভব স্পষ্ট করে দেন। যদি অপরিচিত হয় প্রথমে নিজের পরিচয় দিন। নামের সাথে অন্তত একটি ট্যাগ জুড়ে দিন। হতে পারে সেটা আপনার এলাকার নাম কিংবা পেশা। যেমন, রোমান বলছি খিলখেত থেকে। অথবা আমি জিসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলায় পড়ি। কি বলবেন সেটা নির্ভর করছে আপনি তার কাছে কি জন্য ফোন করেছেন সেটার উপর। যেমন আপনি যদি বিদ্যুৎ অফিসে ফোন করেন, তাহলে পরিচয় বলতে গিয়ে নামের সাথে অবশ্য এলাকা আর আপনি যে গ্রাহক সেটা বলতে পারেন।
* তারপর অবশ্যই অপর প্রান্তকে তার পরিচয় বলার সুযোগ দিন। আমাদের দেশে লোকজন নিজের পরিচয় বলতে অভ্যস্ত নয়। প্রয়োজনে বিনয়ের সাথে জানতে চান? ‘‘আমি মি. অমুকের সাথে কথা বলছি? অথবা, ‘আমি কি মি তমুকের সাথে কথা বলতে পারি। ‘‘আপনি কে বলছেন? এই প্রশ্নটা ভদ্রতাসূচক নয় বরং কিছুটা হকচক জাতীয়। এভাবে জিজ্ঞেস না করাই ভাল। বড়জোর এভাবে বলতে পারেন, ‘কার সাথে কথা বলছি আপনার পরিচয়টা জানলে আমি যে জন্য ফোন দিয়েছি কথা বলতে সহজ হতো’।
* যদি পরিচিত কাউকে কল করেন, সালামের পর অন্তত একটি কুশল বিনিয় করুন। কেমন আছে? কোথায় আছে? কাছের বন্ধু হলে দিনকাল কেমন চলছে? খাওয়ার সময় হলে খাবারের কাজ সেরেছে কিনা? এগুলো আমাদের দেশীয় আন্তরিক ভদ্রতার উপায়। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে হয়তো রাতে ফোনে কথা বলার সময় আপনার কাছে কেউ জানতে চাইবেনা ডিনার করেছেন কিনা? তারপর মূল কথা বলুন।
* যদি আপনার কাছে কল আসে, অপরপক্ষ থেকে পরিচয় বলুক আর না বলুক আপনি আপনার পরিচয় বলুন। মানুষ একে অন্যের কাছ থেকে শিখে। আপনি যদি আপনার কাছ থেকে শিখতে বলেন তাহলে হয়তো কেউ শিখতে আসবেনা। কিন্তু করে দেখালে নিজের অজান্তে মানুষ অভ্যাসকে আয়ত্ত করে। তাই আপনি করে দেখাতে পারেন। সালামের পর বলতেই পারেন, আমি সাবিত বলছি। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে আমরা পরিচয়তো বলিই না উল্টো আরো বলি। আপনি কি পরিচয় না জেনে আমাকে ফোন দিয়েছেন?
* কখনো দেখা যায় কণ্ঠশুনে যখন আমরা বুঝি ওপারের লোকটি ভদ্র ও শিক্ষিত তখন আমরা বিনীত গলায় কথা বলি। যখন বুঝি যে, ওপ্রান্তের লোকটি স্বল্প কিংবা অশিক্ষিত বা গ্রামের মানুষ তখন আমরা তার সাথে বিশাল এক ভাব নিয়ে ফেলি এবং তাকে লজ্জা দেই। বকা ঝকা করি। কেন সে সকাল ৭টায় ফোন দিল, তার জানা উচিত এসময় অনেকে ঘুম থেকে উঠে না।
* আসলে এমন অনেকে আছেন, যারা আসলে বোঝে না, কেন বারবার তিনটা কল করা ঠিক নয়। কারণ প্রথম কলটি না ধরা মানে তিনি ব্যস্ত রযেছেন, তাহলে তাকে অন্তত ১৫ মিনিট বা আধঘন্টা পর দ্বিতীয় কল করা উচিত।
* একজন শিক্ষিত ও ভদ্রলোকের দায় রয়েছে, একজন আনাড়ি মানুষ যদি রাত ১২টায় কল করে তাকে যদি আমি সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলে দেই। দেখুন, ভাই এখন রাত ১২টা বাজে। আমার অফিস ছুটি হয়েছে সন্ধ্যা ৬টা, আমি আমার পরিবারের সাথে সময় কাটাচ্ছি। আপনি কাল অফিস চলাকালীন কল করুন। সবসময় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে কল করতে চেষ্টা করবেন। আমি আপনার সমস্যা সমাধানের আপ্রাণ চেষ্টা করব। পরামর্শ দেয়ার সাথে সাথে আশ্বাসটি আপনাকে অনেক সহজ করে দেবে। সে লোকটাও ম্যানার্স শিখবে। সে খুশি অবস্থায় ফোনটা রাখবে। আর লোকটাকে না রাগানোর জন্য বা হ্যাপি এন্ডিং দেয়ার ফলে আপনার মধ্যেও একটা ভাল লাগা কাজ করবে। যেটা রাগারাগি করলে করবেনা।
* কখনো সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়োজনে কিংবা উত্তেজনা প্রশমণ করার দরকার হলে। অপরিচিত লোককেও কুশল জানতে চাইতে পারেন। অন্তত কেমন আছেন এইটুকু জিজ্ঞেস করাই যায়। কেউ খুব বেশী উত্তেজিত হয়ে গেলে তার নাম ধরে কথা বলুন। উত্তেজনা প্রশমণ হবে। যেমন, দেখুন কামাল ভাই, আপনাকে আমি খুব শ্রদ্ধা করি। অথবা দেখুন জামাল সাহেব, আপনি শুধু রাগ করছেন, আপনার কাজটা সময়মতো হবে। ইত্যাদি।
* ফোনে কথা বলার সময় অপরপক্ষ যাতে সময় নষ্ট না করে। সেজন্য হ্যালো সালাম বা কুশলের পর সরাসরি আলোচনায় চলে যেতে পারেন। যদি আগে থেকে জানা থাকে কি বিষয়ে কথা বরলেন, তাহলে সে প্রসঙ্গে টেনে কথা বলুন। যেমন, ট্রেড লাইসেন্স এর ব্যাপারে আমি আপনাকে সহযোগিতা করতে পারি। আপনি যদি…’’ অথবা যদি প্রসঙ্গ না জানা থাকে। সরাসরি বলুন, ‘‘আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি’’।
* খাওয়ার সময় কথা বলবেন না, রাস্তায় চলার সময় ফোনে কথা বলবেন না। ড্রাইভিং সিটে বসে ফোনে কথা বলবেন না। তখন ফোন এলে থামিয়ে কথা বলুন। একটি ছোট ভুল জীবন ও মৃত্যুর মাঝে ব্যবধান এনে দিতে পারে।
* ফোন করার সময় আশপাশে কেউ যেন জোরে কথা না বলে। রেডিও টিভি ও ল্যাপটপে সাউন্ড কমিয়ে রাখুন। একজনকে ওয়েটিং এ বা মিউটে রেখে দীর্ঘসময় অন্যকারো সাথে কথা বলবেন না। দুজনের সাথে একসাথে কথা বলবেন না।
* ফোন করে প্রথমে জেনে নিন তিনি ব্যস্ত কিনা? ফোনে অযথা দীর্ঘ আলাপ করবেন না। হাফাতে হাফাতে এসে ফোন ধরবেন না। জোরে বা উত্তেজিত হয়ে কথা বলবেন না। ফোন ধরামাত্রই কাউকে অভিযোগ করবেন না। যা বলার ধীরে সুস্থ্যে বলুন।
* জরূরী ফোন হলে কি কি বিষয়ে কথা বলবেন। সেটা লিষ্ট করে তারপর ফোনের সামনে বসুন। এবং আলোচন্য বিষয়গুলো একটি নোটবুকে টুকে রাখুন। এটা আপনি অপরপক্ষকে বললেও সমস্যা নেই। আপনি ভদ্রতার সাথে বলতেও পারেন। স্যার, আমি আমার মনে রাখার সুবাধে আপনার সাথে আলোচনার বিষয়গুলো নোট করে রাখছি।
* সকাল ১০ থেকে বিকেল ৫টা অফিসে এবং সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে বাসায় কল করুন। ফোনে অন্যকে কথা বলার সুযোগ দিন। কথার মাঝে কথা বলবেন না। কেউ ব্যস্ত আছে বললে কখন ফোন দিলে তিনি কথা বলতে পারবেন তা তার কাছ থেকে জেনে নিন। এবং সেসময় কল করুন।
* আগে থেকে কথা বলার সিডিউল করা না থাকলে যার সাথে কথা বলছেন তিনি ব্যস্ত আছে কিনা জেনে নিন। প্রয়োজনে সরাসরি কল না দিয়ে মেসেজে, ম্যাসেন্জারে বা হোয়াটসআপে আগেই অনুমতি নিয়ে তারপর কল করুন। আলোচনা ফলপ্রসু হবে।

* যেকলগুলো ধরতে পারবেন না, সেগুলো অবশ্যই সময় করে ৩ থেকে ৬ ঘন্টার মধ্যে ব্যাক করেন। তা না পারেন অন্তত ১২ ঘন্টার মধ্যে পরিচিত নাম্বারগুলো হলেও ব্যাক করুন। আপনি হয়তো মনে করবেন যে, যারা ফোন করেছে তাদের বেশী প্রয়োজন হলে তারাই আবার কল দেবে। কিন্তু নিয়মিত যদি আপনি কল না ধরেন এবং ব্যাকও না করেন। তাহলে ফোনের ব্যাপারে একজন খেয়ালী মানুষ হিসেবে আপনার ভাবমূর্তি গড়ে উঠবে। এতে করে পরিচিত ও বন্ধুরা কখনো কোনো বিজনেস প্লান বা ট্যুর প্লান করলে আপনাকে বাদ দিয়ে দেবে। তারা বলবে, ‘‘ও তাকে রেখে লাভ নেই সেতো ফোনই ধরে না। ’’
* ভুল নাম্বারে ফোন চলে গেলে। ক্ষমা চেয়ে নিন। আপনার কাছে কেউ ভুলে ফোন দিলে তাকে বকা দেয়ার প্রযোজন নেই। এমন ভুল কমবেশী যেকারো হতে পারে। ফোন রাখার সময় গুডবাই, থ্যাংক ইউ, সি ইউ্, আবার কথা হবে, ভাল থাকুন এসব বলে ফোন রাখুন।
* কথা বলতে বলতে ফোন কেটে গেলে। যিনি ফোন করেছেন তার দায়িত্ব আবার ফোন করা। তবে যেকেউ আবার ফোন করতে পারে। যিনি করলেন তিনি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিলেন।
* যখন যাকে ফোন দেয়ার কথা তখন তাকে ফোন দিন। কোনো কারণে ভুলে গেলে বা সময় পার হয়ে গেলে। প্রথমে মেসেজ দিয়ে ক্ষমা চান। এবং অনুমতি নিয়ে কল করুন।
* ফোনের সময় হাচি কাশি আসলে হাত দিয়ে ছেপে সামলে নিন। ১৫ সেকেন্ডের বেশী সময় ধরে সমস্যা হলে তার কাছে সময় চেয়ে নিন।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?