sismogrpah

ঝ্যাং হেং-এর বিস্ময়: বিশ্বের প্রথম ভূমিকম্প শনাক্তকারী যন্ত্র

ঝ্যাং হেং-এর বিস্ময়: বিশ্বের প্রথম ভূমিকম্প শনাক্তকারী যন্ত্র

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু আবিষ্কার আছে যেগুলো সময়কে অতিক্রম করে মহাজাগতিক বিস্ময়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। আজ যে পৃথিবী সিসমোগ্রাফ, রিখটার স্কেল, স্যাটেলাইটভিত্তিক ভূমিকম্প মনিটরিং-এর মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে, সেই প্রযুক্তির বীজ রোপিত হয়েছিল প্রায় দুই হাজার বছর আগে। বিস্ময়কর সেই পথচলার শুরু হয়েছিল প্রাচীন চীনে, ১৩২ খ্রিস্টাব্দে, এক অসাধারণ বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ—ঝ্যাং হেং (Zhang Heng)—এর হাতে।

ঝ্যাং হেং ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ, প্রকৌশলী, দার্শনিক ও সৃষ্টিশীল উদ্ভাবক—অন্যভাবে বললে, তিনি ছিলেন সেই যুগের এক ‘রেনেসাঁ মানুষ’। তাঁর বহু আবিষ্কারের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় এবং যুগান্তকারী সৃষ্টি হলো বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম ভূমিকম্প শনাক্তকারী যন্ত্র, যাকে বলা হয়—হৌফেং দিদং ই (Houfeng Didong Yi) বা সিসমোস্কোপ

যন্ত্রটির রূপ: বিজ্ঞান ও শিল্পের এক মহাকাব্যিক সংমিশ্রণ

সেই সিসমোস্কোপ দেখতে ছিল যেন এক শিল্পকর্ম। এটি ব্রোঞ্জের তৈরি বড়সড় গোলাকার পাত্র, আকৃতিতে মাটি-ভর্তি কোনো বিশাল কড়াইয়ের মতো। এর চারপাশে ছিল আটটি ড্রাগন, প্রতিটি মাথা খোলা—ঠোঁটের মধ্যে ধরা একটি করে ব্রোঞ্জের বল। ঠিক সেই ড্রাগনের মুখের নিচে ছিল বসে থাকা আটটি ব্যাঙ, মুখ উঁচু করে থাকা, যেন প্রতিটি ব্যাঙ অপেক্ষায় আছে উপরে ঝুলে থাকা বলটির জন্য।

এই নকশা শুধু নান্দনিকতার জন্য নয়—এটি ছিল যন্ত্রটির কার্যকর অংশ। ড্রাগন প্রতিনিধিত্ব করত আট দিককে—উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম এবং চারটি কর্ণদিক। আর ব্যাঙ ছিল বল ধরার রিসিভার। একটি বল পড়ামাত্র পুরো রাজদরবার বুঝত—এই দিক থেকে ভূমিকম্প এসেছে।

যন্ত্রটি কীভাবে কাজ করত?

ঝ্যাং হেং-এর সিসমোস্কোপ ছিল এমন এক গূঢ় যান্ত্রিক কৌশলের ফল, যার ভেতরের যান্ত্রিক কাঠামো সম্পর্কে আজও গবেষকরা সম্পূর্ণ একমত নন। তবে মূল ধারণাটি ছিল—
ভূমিকম্পের ফলে মাটির ভেতর যে তরঙ্গ ছড়ায়, তা যন্ত্রের অভ্যন্তরীণ সুক্ষ্ম পেনডুলাম বা রডকে সামান্য নড়িয়ে দিত। সেই নড়াচড়ার দিক অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিকের ড্রাগনের মুখ খুলে যেত, এবং বলটি পড়ে যেত সংশ্লিষ্ট ব্যাঙের মুখে।

এটি শুধু ভূমিকম্প হয়েছে কিনা তা বলত না—
বলার সঙ্গে সঙ্গে দিকও নির্দেশ করত।

এমন প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছিলেন একজন মানুষ, যখন পৃথিবীতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এখনও শৈশব পেরোয়নি।

সন্দেহ ও প্রমাণ

ঝ্যাং হেংের সমসাময়িকরা প্রথমে এই যন্ত্রকে নিছক ‘খেলনা’ বলেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল—দূরের ভূমিকম্প যন্ত্রে ধরা সম্ভব নয়—এটি তো অবিশ্বাস্য!

কিন্তু ইতিহাস বদলে যায় এক ঘটনাতেই।

একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে পশ্চিম দিকের ড্রাগন তার বল ফেলে দেয় ব্যাঙের মুখে। তখনো কোনো ভূমিকম্পের খবর আসেনি। সবাই ভাবল—এবার ভুল ধরা পড়েছে, যন্ত্রটি নিশ্চয়ই অসার।

কিন্তু কয়েক দিন পর খবর আসে—রাজধানী থেকে বহু দূরে, ঠিক পশ্চিম দিকে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল। খবর পৌঁছাতে সময় লেগেছিল, কিন্তু যন্ত্রটি কম্পনের প্রথম সিগন্যালটাই ধরে ফেলেছিল।

যারা আগে ঠাট্টা করেছিল তারা নীরব হয়ে যায়। আর রাজদরবার বুঝতে পারে—এটি কেবল যন্ত্র নয়, এটি বিজ্ঞানসম্মত দূরদৃষ্টি

আজকের সিসমোগ্রাফের পূর্বপুরুষ

আধুনিক ভূমিকম্পবিজ্ঞান যন্ত্র—সিসমোমিটার বা সিসমোগ্রাফের আবিষ্কার হয়েছিল উনবিংশ শতকে। কিন্তু তার প্রায় ১,৮০০ বছর আগে, ঝ্যাং হেং গড়ে তুলেছিলেন এমন একটি যন্ত্র, যা শুধু ধারণাতেই নয়, কার্যকারিতায়ও ছিল ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির পূর্বাভাস।

আজকের প্রযুক্তিবিশ্বে আমরা মেশিন লার্নিং, স্যাটেলাইট ডেটা, সেন্সর নেটওয়ার্ক দিয়ে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ করি—কিন্তু আমাদের এই যাত্রার ভিত্তি ছিল সেই প্রথম পদক্ষেপ, যেদিন ঝ্যাং হেং তাঁর সিসমোস্কোপ দাঁড় করিয়েছিলেন।

এক মানবমস্তিষ্কের সীমাহীনতা

ঝ্যাং হেং আমাদের শেখান—
মানুষ যদি কল্পনাকে যুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে কাজ করে, তবে সময়ের দেয়াল কোনো বাধা নয়।

তিনি ছিলেন এমন এক উদ্ভাবক, যিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন—প্রাচীন যুগ মানেই অজ্ঞতার যুগ নয়; বরং তখনও মানবমস্তিষ্কের দীপ্তি আধুনিকতার মতো উজ্জ্বল হতে পারত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply