সেরা আত্মজীবনী, বিশ্বসেরা জীবনী, জীবন বদলে নেয়ার জন্য পড়ুন ১০টি আত্মজীবনী, জীবনী পড়ুন, কঠিন জীবন, বই পড়া, বই পড়ুন

জীবন বদলে নেয়ার জন্য পড়ুন ১০টি আত্মজীবনী

মাইন্ডব্লোয়িং বিশ্বের ১০টি সেরা আত্মজীবনী

আত্মজীবনী মানে শুধু বিখ্যাত মানুষের জীবনকথা নয়—এটা যেন এক অনাবিল আয়না, যেখানে লেখক নিজের সবটুকু উজাড় করে দেন। কেউ লেখেন ডায়েরির পাতায়, কেউ গ্রাফিক নভেলের ছবিতে, কেউ আবার কারাগারের ভেজা মেঝেতে বসে। বিশ্বসাহিত্যের এই আত্মজীবনীগুলো প্রতিটি পাঠকের মস্তিষ্কে এক মৃদু ভূমিকম্প আনে।

আজকের এই লেখায় থাকছে সেরা ৯টি আত্মজীবনী ও একটি অনবদ্য গ্রাফিক নভেল—সঠিক প্রকাশনার ইতিহাসসহ। কারণ, সত্যি বলতে কী, নজরুল কখনো আত্মজীবনী লেখেননি, তাই সেই ভুল এখানে নেই।

উইংস অব ফায়ার – এপিজে আব্দুল কালাম

প্রকাশনার তথ্য: ইংরেজি ভাষায় ১৯৯৯ সালে ভারতের হায়দ্রাবাদের ইউনিভার্সিটি প্রেস (ইন্ডিয়া) প্রাইভেট লিমিটেড থেকে প্রকাশিত। বইটির সহ-লেখক ছিলেন অরুণ তিওয়ারি।

রিভিউ: ভারতের মিসাইল ম্যান ও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালাম লিখেছেন এক সাধারণ তামিল মুসলিম পরিবারের ছেলের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প। রামেশ্বরমের দরিদ্র কুটির থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি ভবন পর্যন্ত—এই পথচলা যেন এক রূপকথার মতো বাস্তব। কালাম এখানে বলেন কীভাবে ব্যর্থতা তাঁকে বারবার নতুন করে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে যখন তাঁর তৈরি মিসাইল পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখন তিনি লিখেছেন, ‘ব্যর্থতা আমাকে শিখিয়েছে সাফল্যের আসল দাম।’

বইটি কেবল আত্মজীবনী নয়, এটি একটি প্রেরণার উৎস। তরুণদের জন্য অধ্যায়ে অধ্যায়ে লুকিয়ে আছে মন্ত্র—‘স্বপ্ন দেখো, স্বপ্ন দেখো, স্বপ্ন দেখো। স্বপ্নই বাস্তবে রূপ নেয়।’ সহজ বাংলায় বলা যায়, এই বই পড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে আনন্দে। কারণ কালাম যেন বড়ভাই হয়ে আপনার কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘তুই পারবি।’

মর্মকথা: উইংস অব ফায়ার ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার পদ্মবিভূষণপ্রাপ্ত কালামের সবচেয়ে বিক্রিত বই। এটি ইংরেজি, হিন্দি, তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, কন্নড় ও বাংলা—সহ ভারতের প্রায় সব ভাষায় অনূদিত হয়েছে।  কালাম ২০১৫ সালে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট শিলং-এ বক্তৃতা দেওয়ার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

 দ্য ডায়েরি অব আ ইয়াং গার্ল – অ্যান ফ্র্যাঙ্ক

প্রকাশনার তথ্য: মূল ডাচ ভাষায় Het Achterhuis শিরোনামে ১৯৪৭ সালের ২৫ জুন নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম থেকে প্রকাশিত । ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালে ।

রিভিউ: না, এটি সাধারণ ডায়েরি নয়। এটি না-ফেরার দেশে পা দেওয়া এক কিশোরীর মন-ভাঙানি আর আশার গল্প। অ্যান ফ্র্যাঙ্ক ১৯৪২ সালের ১২ জুন তার ১৩তম জন্মদিনে এই ডায়েরি উপহার পেয়েছিলেন । পরের দিনই তিনি লিখতে শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আট লুকোনো কক্ষের গন্ধ, না পাওয়ার যন্ত্রণা আর নাৎসি নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এই মেয়েটির বিশ্বাস অটুট ছিল। বই শেষ করলে মনে হয়, একজন অদেখা বোন যেন হাত ধরে বলে যাচ্ছে—‘মানুষের অন্তরে এখনও মঙ্গল আছে।’

মর্মকথা: ডায়েরিটি মূলত ‘কিটি’ নামের এক কাল্পনিক বন্ধুকে লেখা চিঠি। ৭০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত এই বই যুদ্ধসাহিত্যের একটি ক্লাসিক ।

 আই নো হোয়াই দ্য কেইজড বার্ড সিংস – মায়া অ্যাঞ্জেলো

প্রকাশনার তথ্য: ইংরেজি ভাষায় ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের র্যান্ডম হাউস থেকে প্রকাশিত ।

রিভিউ: মায়া অ্যাঞ্জেলো যেন আগুনের ফিনিক্স। ছোটবেলায় নির্যাতিত, আট বছর বয়সে ধর্ষণের শিকার হয়ে প্রায় পাঁচ বছর নির্বাক থাকা এক কিশোরী যে বড় হয়ে কাব্য আর সাহসে মোড়ানো এক বিদ্রোহী কণ্ঠ । এই বইয়ে তিনি বর্ণবাদ, যৌন হয়রানি আর মাতৃত্বের জটিলতাকে এত মর্মস্পর্শী করে লিখেছেন যে প্রতিটি বাক্য রক্তক্ষরণ করে। ‘কেইজড বার্ড সিংস’ মানে শুধু মুক্তি নয়, বরং নিজের ভাঙা গল্পকে জয়গান বানিয়ে ফেলা।

মর্মকথা: এটি অ্যাঞ্জেলোর সাত খণ্ডের আত্মজীবনী সিরিজের প্রথম বই। ১৯৭০ সালে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়েছিল ।

 লং ওয়াক টু ফ্রিডম – নেলসন ম্যান্ডেলা

প্রকাশনার তথ্য: ইংরেজি ভাষায় ১৯৯৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লিটল, ব্রাউন অ্যান্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত । বইটির সহ-লেখক ছিলেন সাংবাদিক রিচার্ড স্টেঙ্গেল ।

রিভিউ: দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী কারাগারের ২৭ বছর—ভাবতে পারেন? ম্যান্ডেলা এখানে লিখেছেন রোবেন দ্বীপের চুনাপাথরের ধুলো থেকে শুরু করে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদির ছোট্ট কুঠুরির ঠান্ডা পর্যন্ত। এটি আত্মজীবনী না, যেন এক বিপ্লবের নীরব মহাকাব্য। শেষ অধ্যায়ে যখন তিনি প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন, চোখ ভিজে যায়। ম্যান্ডেলা শেখান, ক্ষমা সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

মর্মকথা: বইটি ১৯৯৫ সালে অ্যালান প্যাটন অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। ২০১৩ সালে ম্যান্ডেলা: লং ওয়াক টু ফ্রিডম নামে চলচ্চিত্রায়িত হয় ।

 দ্য স্টোরি অব মাই লাইফ – হেলেন কেলার

প্রকাশনার তথ্য: ইংরেজি ভাষায় ১৯০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত। হেলেন কেলার মাত্র ২২ বছর বয়সে এটি লেখেন ।

রিভিউ: যিনি দেখতে পান না, শুনতে পান না, তিনিই কীভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে অনুপ্রেরণামূলক লেখক হলেন? হেলেন কেলারের ভাষা এত স্পর্শকাতর যে আপনি বোতলজাত জলের ছোঁয়াও অনুভব করবেন। তাঁর শিক্ষক অ্যান সুলিভানের ধৈর্য আর হেলেনের অদম্য চেষ্টা—এই বই পড়ে অনেকে কাঁদেন। এটি শিক্ষা দেয়, ‘আমার শারীরিক সীমাবদ্ধতা আমার মনকে থামাতে পারে না।’

মর্মকথা: হেলেন কেলার ১৮৮০ সালে আলাবামায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯ মাস বয়সে এক অসুস্থতায় তিনি দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি হারান ।

 মেমোয়ারস অব আ গেইশা – আর্থার গোল্ডেন

প্রকাশনার তথ্য: ইংরেজি ভাষায় ১৯৯৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে উপন্যাস হিসেবে প্রকাশিত। সতর্কতা: এটি আত্মজীবনী নয়, একটি উপন্যাস—কিন্তু অনেকেই গেইশা সংস্কৃতির এত সঠিক চিত্রায়নের জন্য একে আত্মজীবনীমূল্য দেয়।

রিভিউ: সায়ুরি নামের এক জাপানি মেয়ের চোখ দিয়ে দেখা গেইশা জগতের ভেতর-বাইরের কাহিনি। গোল্ডেন এত নিখুঁতভাবে জাপানি নারীর কণ্ঠশৈলী ধারণ করেছেন যে পড়তে বসলে মনে হবে কোনো বৃদ্ধা গেইশা নিজের জীবন বলছেন। কিয়োটোর গিয়ন জেলার চা-ঘর থেকে শুরু করে যুদ্ধের সময়কার কষ্ট—প্রতিটি অধ্যায় পাঠককে মুগ্ধ করবে।

মর্মকথা: গোল্ডেন এই বই লিখতে অবসরপ্রাপ্ত গেইশা মিনেকো ইওয়াসাকির সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। পরে ইওয়াসাকি বইটির কিছু অংশ নিয়ে মামলা করেন, কারণ তিনি মনে করেছিলেন তার জীবনকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে ।

 মাউস – আর্ট স্পিগেলম্যান

প্রকাশনার তথ্য: এটি একটি গ্রাফিক নভেল (কমিক বই) । প্রথম খণ্ড Maus I: My Father Bleeds History প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে, দ্বিতীয় খণ্ড Maus II: And Here My Troubles Began প্রকাশিত হয় ১৯৯১ সালে। ভাষা ইংরেজি, প্রকাশক প্যান্থিয়ন বুকস (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) ।

রিভিউ: হলোকাস্টের কাহিনি আপনি কখনো ইঁদুর-বিড়ালের ছবিতে পড়েছেন? স্পিগেলম্যান তার বাবার মুখে শোনা কাহিনি এঁকেছেন কমিকের ফ্রেমে—ইহুদিরা এখানে ইঁদুর, জার্মানরা বিড়াল, পোলিশরা শূকর । শুরুতে হাসবেন, তারপর কাঁদবেন, শেষে চুপ করে যাবেন। পুলিৎজার পুরস্কার জয়ী এই বই প্রমাণ করে, সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যও বলা যায় মায়াবী ছবির মাধ্যমে।

মর্মকথা: ১৯৯২ সালে এটি পুলিৎজার পুরস্কারের বিশেষ পুরস্কার অর্জন করে—যা কোনো গ্রাফিক নভেলের জন্য প্রথম ।

 যখন ছোট ছিলাম – সত্যজিৎ রায়

প্রকাশনার তথ্য: বাংলা ভাষায় ১৯৮২ সালে কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত ।

রিভিউ: বাঙালির চিরচেনা ‘মাণিকদা’ শুধু সিনেমা বানাননি, তিনি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথের ‘ছেলেবেলা’-র মতো এক আত্মজীবনী। শান্তিনিকেতনের বটতলা, পিসি ও মায়ের স্নেহ, সাদা-কালো ছবির জাদু—সব কথাই এত স্নিগ্ধ আর মায়াভরা যে ফুরোতে চায় না। বড় হয়েও সত্যজিৎ শিশু থেকেছিলেন বলেই এই বই পাঠককে নিজের শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বাংলা সাহিত্যে অনবদ্য।

মর্মকথা: বইটির নামের অর্থ ‘যখন আমি ছোট ছিলাম’। সত্যজিৎ এখানে কলকাতার সাধারণ এক বালকের চোখে তার শৈশব বর্ণনা করেছেন ।

 দ্য অটোবায়োগ্রাফি অব বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন

প্রকাশনার তথ্য: ইংরেজি ভাষায়। ফ্র্যাঙ্কলিন ১৭৭১-১৭৯০ সালের মধ্যে এটি লেখেন, কিন্তু মৃত্যুর পর ১৭৯১ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় (ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে)।

রিভিউ: আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের সবচেয়ে মজার ও বাস্তববাদী মানুষটি যদি নিজের জীবন লেখেন, তাহলে সেটা হবে ‘হাউ টু উইন অ্যান্ড হাউ টু ফল’–এর মাস্টারক্লাস। ফ্র্যাঙ্কলিন এখানে বলেন কীভাবে একজন মুদ্রণশালার শিক্ষানবিশ থেকে রাষ্ট্রদূত ও বিজ্ঞানী হয়েছেন। ‘আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ’–এর চেয়েও বড় শিক্ষা হলো—নিজের ভুল স্বীকার করতে কখনো লজ্জা পেয়ো না।

মর্মকথা: বইটি অসম্পূর্ণ, ফ্র্যাঙ্কলিন ১৭৫৭ সালের পরের ঘটনা লেখার আগেই মারা যান।

 বর্ণ ফর দ্য বডি – নিক্কি জিওভানি

প্রকাশনার তথ্য: ইংরেজি ভাষায় ২০০৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়াম মরো পেপারব্যাকস থেকে প্রকাশিত।

রিভিউ: কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদী কবির এই আত্মজীবনীটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। ছোট ছোট টুকরো স্মৃতি, প্রেমপত্র, চিকিৎসা রিপোর্ট আর কবিতার মিশেলে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন নিজের শারীরিক অসুস্থতা, হার্টের অপারেশন ও বাঁচার অদম্য ইচ্ছা। ‘আমার দেহের প্রতিটি রং আমার ইতিহাস’—একবার পড়লে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। ভাবুন, একজন মানুষ কীভাবে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও জীবনের গান গায়!

মর্মকথা: জিওভানি ছিলেন আমেরিকার বিখ্যাত ব্ল্যাক আর্টস মুভমেন্টের একজন নেতৃস্থানীয় কণ্ঠ।

এই নয়টি বই (এবং একটি গ্রাফিক নভেল) নয়টি আলাদা জগৎ। কেউ অ্যানের চিঠিতে কাঁদেন, কেউ মায়ার পাখির খাঁচায় বন্দি হতে চান না। কেউ ম্যান্ডেলার কারাগারের দেয়াল টপকান, কেউ সত্যজিতের ছেলেবেলায় হারিয়ে যান।

আত্মজীবনী আসলে একপ্রকার অস্ত্র—যেটা অহংকে সরিয়ে দেয়, যন্ত্রণাকে দীক্ষায় পরিণত করে। আপনার যদি কোনো একাকী বিকেল থাকে, তবে এই বইগুলোর যেকোনো একটি তুলে নিন। আপনি দেখবেন, আপনার ছোট্ট দুঃখ বড় হয়ে ওঠা ইতিহাসের সামনে ক্ষীণ হয়ে যায়।

আর সবচেয়ে বড় কথা—বিশ্বের সেরা এই আত্মজীবনীগুলো পড়ার পর মনে হবে, জীবনটা আসলে মরার আগে কয়েকটা ভালো গল্প বাঁচার নাম।

আপনি কোনটা পড়বেন?