লক্ষ্যে অবিচল থাকলে জয় ধরা দেবে
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
ত্রিশোর্ধ এক যুবক একটি স্ট্রলার নিয়ে ঘর্মাক্ত শরীর বয়ে হেঁটে চলেছে তো চলেছেই। রোদে পুড়ে তার ত্বক কালো হয়ে গেছে ওজন কমে গেছে তবু যেন কোনো ক্লান্তি নেই। চলছেতো চলেছেই।
দেখতে দেখতে একটি বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। গত বছর ১২ ফ্রেব্রুয়ারী থেকে ২৮ মার্চ এই সময়ের মধ্যে পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ গিয়েছিলাম।
ছাত্রজীবনে কাল্পনিক রহস্য কিংবা গোয়েন্দা গল্প পড়তাম বটে কিন্তু আমাকে টানতো বাস্তব সব রোমাঞ্চকর গল্পগুলো। যেমন উত্তর–দক্ষিণ মেরু অভিযান, আমাজান অরন্যে অভিযাত্রা, নায়াগ্রা জলপ্রপাত, নীলনদের উৎসমুখ আবিষ্কার, হিমালয় আর সাহারা অভিযানের রক্তহীমকরা সত্যিকার গল্পগুলো। এই সফর ছিলো ১১৭৬ কিলোমিটারের। পথটা হাজার কিলোমিটার হলেও আমার একটু বেশী হাঁটতে হয়েছিলো কারণ আমি চলার পথে পর্যটন স্থানগুলো দেখেছি। আর ২৫-৩০ দিনের মধ্যে এইটুকু পথ হাঁটা গেলেও আমার প্রায় দেড়মাস লেগেছে কারণ পুরো ভ্রমণটা ছিলো একটা সামাজিক কর্মসচূী।
তাই আমি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন স্কুল কলেজে গিয়েছি। ছাত্র, শিক্ষক শ্রমিক, পথচারী, গ্রামবাসী ও হাটবাজারের মানুষ মিলে ৫০ হাজারের বেশী মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলেছি। মত বিনিময় করেছি। কারণ আমার যে স্লোগান ছিলো দেখব বাংলাদেশ গড়ব বাংলাদেশ সেটা তাদেরকে বলেছি। তাদের মাঝে দেশগড়ার কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করার জন্য অনুপ্রেরণা দিয়েছি।
আমি চলার পথে ১৮টি জেলার মানুষকে বলতে চেয়েছি ‘‘এই দেশ আমাদের, এই দেশকে আমরাই গড়বো’’ আর দেশকে গড়ার জন্য আমাদের সকলেরই কিছু না কিছু করার রয়েছে।
ভ্রমণ শেষে হয়েছে কিন্তু স্বপ্ন দেখা শেষ হয়নি। শেষ হয়নি স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার মিশন। ভ্রমণের বিস্তারিত বিষয় নিয়ে আমার লেখা ‘দেখব বাংলাদেশ গড়ব বাংলাদে ‘ শিরোনামে বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালের একুশে বইমেলায়। ভালো লাগছে এজন্যযে সফরের মতো বইটিও সকলে প্রশংসা পেয়েছে।
আমার কথা হলো—এই দেশটা আমাদের, আমরাই এই দেশকে গড়ব। আমরা যার যার অবস্থান থেকে দেশের জন্য কিছু করব। এ ছাড়া তিনি শিশু নির্যাতন বন্ধ, লোকসাহিত্য সংরক্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, গাছ লাগানো, বাল্যবিবাহ রোধ ও মাদকবিরোধী জনমত গঠনে কাজ করেছেন।
দেশদেখা ইভেন্টের স্পন্সর প্রতিস্ঠান .tour.com.bd , ট্রাকিং সার্ভিস দিয়েছে dinratri.com,
লজিস্টিক সেবা দিয়েছে keenlay.com ও Cholbe.com, লজিস্টিক সহযোগিতা করেছে www.walletmix আর সার্বিক সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এর প্রতিও আমার কৃতজ্ঞতা থাকলো।
প্রথম থেকেই আমি আমার পদযাত্রাকে সাধারণ মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি। সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততার উপর জোর দিয়েছি। হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে গিয়ে আমি প্রায় বারোশ কিলোমিটার পথ পায়ে হেটেছি। আমার এই শ্রমসাধ্য পদযাত্রা থেকে যদি দেশ ও সমাজ উপকৃত হয় তবেই তা স্বার্থক।
কখনো কখনো খুব হতাশ হয়ে পড়ি এবং মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। যখন দেখি জঙ্গি নামক নরপশুরা হামলে পড়ছে আমার দেশের উপর। যখন দেখি রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অপরাধের চূড়ান্ত বিস্তৃতি কিংবা দূর্ণীতির কালো থাবা। এগুলোযে খবরের কাগজেই শুধু দেখি তা নয়। কখনো কখনো নিজেকেও এসবের সম্মুখিন হতে হয়। সেটা পুলিশ স্টেশান, ভূমি অফিস, বিআরটিএ কিংবা সরকারী কোনো দপ্তরে গেলে খুব কাছ থেকে দূর্ণীতির শিকার হতে হয়। যারা এসব জায়গায় গিয়ে থাকবেন তারা আমার সাথে একমত হয়ে থাকবেন। তখন নিজেকে খুব একা এবং অসহায় মনে হয়। কিন্তু পরক্ষণে আবার আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠি।
সমস্যাগুলো আছে বলেই আমাদের দায়িত্ব আরো বেড়ে গেছে। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে দেশগঠনে অংশ নেয়ার। কারণ এসব সমস্যা যতটা না রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক তারচেয়ে বেশী সামাজিক। কারণ সামাজিক মেলবন্ধন ও সামাজিক নৈতিকতাই ছিলো আমাদের দেশের জীবন কাঠামোর অংশ। আজ সামাজিক শৃংখলা ও নিরাপত্তা দূর্বল হয়ে যাওয়াই হচ্ছে ক্রমাগত সমস্যার মূল। আর এই সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার কিংবা আইনশৃংখলা বাহিনীর জন্য বসে না থাকে। একক বা সাংগঠনিকভাবে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে দেশকে বদলে দেয়ার শপথ নিই। বদলে দেয়ার মিশন শুরু করি। মনে রাখতে হবে আমরা যারা শান্তিপ্রিয় আমাদের সংখ্যাই বেশী। দূস্কৃতিকারীতো হাতে গোনা কয়েকজন। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হই আর লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থাকি জয় আমাদের হবেই।

