গ্রাম বাংলায় ই-কমার্সের অগ্রযাত্রায় প্রয়োজনীয়তা ও করনীয়
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
এখনো দেশের দুই তৃতীয়াংশের বেশী মানুষ গ্রামে বাস করে। যখনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কোনো ছোয়া লাগে তখন তা গ্রাম বাংলার মানুষকে উপকারভোগী না করতে পারলে তার যথার্থ কার্যকারিতা থাকেনা এবং সফলভাবে বিস্তৃতি লাভ করে না। যথক্ষন পর্যন্ত না গ্রামের মানুষ মোবাইল ফোন এর উপকারিতা ভোগ করতে পারেনি ততক্ষন পর্যন্ত আমরা একে গণমানুষের প্রযুক্তি বলতে পারিনি। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং সাযোমা (সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম) এর ক্ষেত্রে একই বিশ্লেষণ প্রযোজ্য।
বিদ্যুৎ এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিগত বছরে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। শহর অঞ্চলে বসবাসকৃত সকল মানুষই চাইলে ই-কমার্সের সেবা নিতে পারে এবং গ্রাম অঞ্চলের অন্তত ৩০% মানুষ ই-কমার্স সেবার মধ্যে পড়েছে। যাদের স্মার্টফোন আছে, ইন্টারনেট আছে এবং পাকা সড়কপথে তারা দেশের মূল যোগাযোগের সাথে যুক্ত। কিন্তু এখনো ৭% মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করে যাদের তাদের মোট কেনাকাটার ৫% হয়তো অনলাইনে করে থাকেন। দেশের মোট অনলাইন কেনাকাটার ২৬% হয় গ্রাম থেকে। একসময় ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে ই-কমার্স কেনাকাটার হার সমান থাকলেও এখন ঢাকার চেয়ে দ্বিগুনের বেশী অনলাইন কেনাকাটা হয় ঢাকার বাইরে। যদিও এর ৭০ শতাংশ জীবনধারা পণ্য। ঢাকায় যেখানে নিত্যপণ্য ও তৈরী খাবারের বড়ো একটা বাজার রয়েছে।
সারাদেশে ই-কমার্সে এখন দৈনিক সাড়ে ৪ লাখ ডেলিভারী হয়। যার অর্ধেকই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দখলে এবং এক তৃতীয়াংশ ফেসবুক ভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে হয়ে থাকে। যদিও মোট উদ্যোগের ৯৫% ‘‘সিএসএমই’’ উদ্যোগ। এই উদ্যোক্তাদেরও একটা অংশ গ্রামীন জনগোষ্ঠি থেকে যুক্ত হয়েছে। ফেসবুক কেন্দ্রীক উদ্যোক্তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশই ঢাকার বাইরে এরমধ্যে অন্তত অর্ধেক রয়েছে গ্রামীণ এলাকা থেকে। ফেসবুকে পণ্য বিক্রির ২০ শতাংশের বেশী গ্রামীণ উদ্যোক্তারা করে থাকে এবং শহরের বিভিন্ন প্লাটফর্মে আরো ১৫% শতাংশ পণ্য গ্রামীণ সূত্র থেকে আসে। ই-কমার্সে দেশীয় পণ্যের দখল দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ই-কমার্সের মাধ্যমে এক জেলার বিশেষ পণ্য সেবা অন্য জেলার ক্রেতারা সংগ্রহ করছে। যেমন যশোরের খেজুরের গুড় সারাদেশে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের শুটকি পাচ্ছে অন্য জেলার মানুষ। সিলেটের কমলা কিংবা দিনাজপুরের চাল কোনোটাই ই-কমার্সের আওতা থেকে বাদ যাচ্ছে না। বিশেষ করে আম ও লিচুর মৌসুমে ব্যাপক পরিমাণ বিক্রি অনলাইনে হয়। এর সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে মাছ, হাস, গরু, গরুর মাংস, ডিম, পিঠা ও মিষ্টি। প্রতিদিন এসবের চাহিদা বেড়ে চলেছে।
এর মাধ্যমে শহরমুখী অর্থপ্রবাহের যে প্রবণতা তাতে কিছুটা ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে। শহরের ভোক্তার অর্থ গ্রামীণ উদ্যোক্তার কাছে যাওয়ার মাধ্যমে তার জীবন যাত্রা ও এলাকার উন্নয়নে এর বিশেষ অবদান থাকছে। এই সম্ভাবনাকে আমরা আরো কয়েকগুণ বা বাড়িয়ে নিতে পারি বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে। তার আগে আমাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানের পথ তৈরী করতে হবে।
গ্রামীণ ই-কমার্স বিস্তারে প্রয়োজনীয়তা
১। লাস্টমাইল ডেলিভারীর সুযোগ না থাকা। প্রান্তিক পর্যায়ে পণ্য সেবা ডেলিভারী করতে এখনো প্রচুর সময় লাগে।
২। সমন্বয় হীনতার অভাব। বিচ্ছিন্ন ভাবে ভিন্ন ভিন্ন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোগে ই-কমার্স প্রসারিত হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সমন্বয়হীণতা রয়েছে। শহর থেকে প্রতিদিনের যে পণ্য সেবা গ্রামীণ জনগোষ্ঠির কাছে যাচ্ছে তার কেন্দ্রীয় কোনো তথ্য ও সংযুক্তি নেই। ফলে এর অনেক সুবিধা ও সমস্যা আমরা জানতে পারিনি।
৩। মজবুত সাপ্লাই চেইন গড়ে না উঠা। আমাদের দেশে গ্রাম থেকে শহরে কৃষি ও কুটির শিল্পের যে পণ্য আসে তা প্রচলিত আড়ৎ ভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। এটি আধুনিক ও মানসম্পন্ন না হলেও প্রতিদিনের খাদ্য সরবরাহ চেইন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে চলছে। সেখানে ই-কমার্স খাতের কোনো সমন্বিত সাপ্লাই চেইন গড়ে উঠেনি। এলাকা ভিত্তিক হাব বা ফুলফিলমেন্ট সেন্টার এবং প্রান্তিক এলাকায় যুক্ত সেবা না হলে সাশ্রয়ীমূল্যে সময়মতো পণ্য পৌছানোর চ্যালেঞ্জ থেকেই যাবে।
৪। গ্রামীণ খাদ্য, কৃষি ও হস্তশিল্প কেন্দ্রীক উদ্যোক্তা, নারী ও আবাসিক উদ্যোক্তা, ছাত্র ও খন্ডকালীন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, ঋণ, বিনিয়োগ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। ফলে গ্রামে যেমন প্রচুর পণ্য রয়েছে তেমনি রয়েছে শিক্ষিত, বেকার ও উদ্যমী যুবক, যুবতী ও গৃহিনীরা। তাদেরকে যুক্ত করতে না পারলে ই-কমার্সের কাংখিত সাফল্য হোঁচট খেতে পারে।
গ্রামীণ ই-কমার্স বিস্তারে করনীয়
১। লাস্টমাইল ডেলিভারী নিশ্চিত করতে এলাকাভিত্তিক হাব প্রতিষ্ঠা ও হাব থেকে ঘরে ঘরে পণ্য পৌছানোর জন্য স্থানীয় উদ্যোক্তা ও কর্মজীবিদের যুক্ত করে প্রান্তিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।
২। যেসব ই-কমার্স উদ্যোক্তা বিচ্ছিন্নভাবে পণ্য সেবা গ্রাম থেকে শহরে দিচ্ছে কিংবা শহর থেকে গ্রামে নিচ্ছে তাদেরকে একটি লজিস্টিক মনিটরিং সিস্টেম এর মধ্যে নিয়ে আসলে। পণ্য সেবার প্রবাহ সহজ করা যাবে এ সংক্রান্ত তথ্য জানা যাবে এবং সময়মতো সঠিক সেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
৩। এলাকা ভিত্তিক হাব বা ফুলফিলমেন্ট সেন্টার এর সাথে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিবহন সেবাকে যুক্ত করে তা একটি সংযুক্ত সিস্টেমের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে সেবাকে সহজ ও বিস্তৃত করা যায়। এটি ডাক বিভাগের মাধ্যমেও হতে পারে। হতে পারে সরকারী ও বেসরকারী যৌথ প্রয়াসের মাধ্যমে।
৪। গ্রামীণ খাদ্য, কৃষি ও হস্তশিল্প কেন্দ্রীক উদ্যোক্তা, নারী ও আবাসিক উদ্যোক্তা, ছাত্র ও খন্ডকালীন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, ঋণ, বিনিয়োগ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে। গ্রামের আরো বেশী পণ্য শহরের মানুষের দ্বারগোড়ায় আসবে। ডিজিটাল অর্থনীতি মজবুত হওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক বাজারে দেশীয় পণ্যের বিস্তার ও প্রেরণ সহজতর হবে।
আমাদের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উৎপাদনকে শহরের মানুষ এবং বিশ্বের ভোক্তাদের কাছে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে আমরা আমাদের পণ্য সেবার সাথে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে গৌরবের সাথে তুলে ধরতে পারি। উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতিকে ই-কমার্স ট্রেড এর সাথে যুক্ত করার মাধ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়া গতি সঞ্চার করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের সমৃদ্ধ আনতে পারি। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি সেবা গ্রহণের মাধ্যমে একুশ শতকের জীবন ধারা গ্রহণ করে দেশকে করতে পারি ক্ষুধা ও দারিদ্রমূক্ত।
সরকার ঘোষিত স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়ন, এলডিসি গ্রাজুয়েশন অর্জন এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কাফেলায় শামিল হতে আমাদের রয়েছে প্রযুক্তি ও প্রজন্ম। আজকের তরুন বিশাল প্রজন্মকে কাজে লাগাতে গ্রামীন জনগোষ্ঠিকে যুক্ত করতে হবে প্রযুক্তি ভিত্তিক সেবার সাথে আর ই-কমার্স হতে সেজন্য সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।
লেখক: ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এর নির্বাহী পরিচালক
এবং বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন এর সাধারণ সম্পাদক।

