বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত খুলনা বিভাগ ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। প্রশাসনিকভাবে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ বিভাগ। এর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গ (ভারত), উত্তরে রাজশাহী বিভাগ ও পূর্বে ঢাকা ও বরিশাল বিভাগ অবস্থিত।
খুলনা বিভাগে মোট ১০টি জেলা রয়েছে— খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মাগুরা, নড়াইল, মেহেরপুর এবং চুয়াডাঙ্গা। এসব জেলার মধ্যে খুলনা শহর বিভাগীয় সদর দপ্তর হিসেবে পরিচিত। খুলনা বিভাগের আয়তন প্রায় ২২,২৮৪ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি (সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী)।
অর্থনৈতিকভাবে খুলনা বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখানে কৃষি, মৎস্য ও শিল্প উৎপাদন সমানভাবে সমৃদ্ধ। বিশেষ করে চিংড়ি চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, পাটশিল্প, ধান-গম-ডাল উৎপাদন এবং আম, কাঁঠালসহ মৌসুমি ফলের জন্য এ অঞ্চল খ্যাত। যশোরের মাটি বিশেষভাবে উর্বর হওয়ায় এটি দেশের শাকসবজির ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত।
দর্শনীয় স্থান
খুলনা বিভাগ শুধু অর্থনীতির নয়, প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরও ভান্ডার। এখানে রয়েছে বিশ্বখ্যাত প্রাকৃতিক অরণ্য থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক নিদর্শন ও আধুনিক দর্শনীয় স্থান।
সুন্দরবন
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় বিস্তৃত। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমিরসহ নানা বন্যপ্রাণীর আবাস এ বন। ইউनेস্কো ঘোষিত বিশ্বঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত সুন্দরবন বাংলাদেশের জন্য গর্বের প্রতীক।
শাটগাম্বুজ মসজিদ (ষাটগম্বুজ মসজিদ), বাগেরহাট
ঐতিহাসিক খানজাহান আলী কর্তৃক নির্মিত এই মসজিদ মধ্যযুগীয় স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। ষাট গম্বুজ ও বাহাত্তর দরজার এই স্থাপনাটি বিশ্বঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত এবং পর্যটকদের কাছে প্রধান আকর্ষণ।
যশোরের শারদ উৎসব ও বেনাপোল সীমান্ত
যশোর শুধু শাকসবজি ও আমের জন্য নয়, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্যও বিখ্যাত। বেনাপোল স্থলবন্দর বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রধান প্রবেশদ্বার।
সাতক্ষীরার জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থান
সাতক্ষীরায় রয়েছে প্রাচীন প্রত্নস্থল ও ঐতিহাসিক নিদর্শন। এখানে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলা ও লোকসংস্কৃতির সমৃদ্ধ উপস্থাপন পাওয়া যায়।
নড়াইলের শিল্প ও সাহিত্য ঐতিহ্য
চিত্রশিল্পী এস. এম. সুলতান নড়াইলের সন্তান। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত শিল্পাঙ্গন এখনো পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়।
কুষ্টিয়ার লালন শাঁইয়ের আখড়া
কুষ্টিয়া জেলা বাউল সম্রাট লালন ফকিরের আখড়ার জন্য বিখ্যাত। প্রতিবছর এখানে লালন সাঁইয়ের স্মরণে আয়োজন করা হয় আন্তর্জাতিক লালন উৎসব।
ঝিনাইদহের মধুপুর ও ঐতিহাসিক স্থান
ঝিনাইদহে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিস্তম্ভ এবং বিভিন্ন লোকসংস্কৃতির কেন্দ্র।
বাগেরহাটের খানজাহান আলীর মাজার
মধ্যযুগীয় ইসলামি স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান।
খুলনা বিভাগ তার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, প্রাকৃতিক সম্পদ, ঐতিহাসিক নিদর্শন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে বাংলাদেশের একটি অনন্য অঞ্চল। সুন্দরবনের অরণ্য, বাগেরহাটের মসজিদ নগরী কিংবা কুষ্টিয়ার লালন আখড়া—সব মিলিয়ে খুলনা বিভাগ ইতিহাস, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির অসাধারণ সমাহার। তাই পর্যটন, শিক্ষা ও গবেষণার জন্য খুলনা বিভাগ নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ ভান্ডার।

