Politics Eletion, ‍ Cader, Admin

ক্যাডারভিত্তিক প্রশাসন ব্যবস্থাই কি সর্বনাশের মূল

“ক্যাডারভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা” কি?

“ক্যাডারভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা” বলতে সাধারণত বোঝায় এমন একটি শান্ত, নিয়ন্ত্রিত, শ্রেণিবদ্ধ সরকারি সেবাব্যবস্থা যেখানে প্রশাসনিক (ব্রহ্ম-) কর্মকর্তা (officers) একটি নির্দিষ্ট “ক্যাডার” বা সার্ভিসে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়, তারা সময়ের সঙ্গে পদোন্নতি পায়, বদলি হয়, কিন্তু সেই ক্যাডার বা সার্ভিসের মধ্যেই কাজ করে এবং সাধারণভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তন বা নির্বাচনের পরও একই সার্ভিস কাঠামো টিকে থাকে। এটি প্রায় একটি “permanent bureaucracy” বা স্থায়ী প্রশাসন গঠন করে, যাকে জন-নীতি বিধায়ক (policy maker) এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্ধারিত করলেও প্রশাসনিক বাস্তবায়ন ও নীতি ধারাবাহিকতার দায়িত্ব এই ক্যাডারকেই বহন করে।

শুধু ভারত–বাংলাদেশ–পাকিস্তানেই নয়; তবে “ক্যাডারভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা” যেভাবে আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় বুঝি (অর্থাৎ আজীবন নির্দিষ্ট সার্ভিস-ক্যাডারে যোগ দিয়ে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে অবসর নেওয়া) — সেইরকম কঠোর ক্যাডারভিত্তিক কাঠামো মূলত ব্রিটিশ উপনিবেশভুক্ত দেশগুলোর ঐতিহ্য।
ইউরোপ, আমেরিকা বা ল্যাটিন আমেরিকায় প্রশাসনিক কাঠামো ভিন্ন — সেখানে “position-based system” বা “open civil service system” প্রচলিত।

ক্যাডারভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল ঔপনিবেশিক আমলে —
ব্রিটিশ Indian Civil Service (ICS), ফরাসি Corps system, ও অন্যান্য ইউরোপীয় সাম্রাজ্যিক কাঠামোর উদ্দেশ্য ছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল “শাসন ধরে রাখা”, না যে “উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা” নয়।

ফলে এই কাঠামো তৈরি হয়েছিল স্থায়িত্ব, আনুগত্য, শৃঙ্খলা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার জন্য, কিন্তু এটি উদ্ভাবন, পরিবর্তন ও জনগণনির্ভর নীতির বিরোধী হয়ে পড়ে। সুতরাং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে “স্থিতিশীলতা” হয়ে যায় “স্থবিরতা”।

ইতিহাস: কবে কখন কিভাবে শুরু হয়?

“ক্যাডারভিত্তিক” ধারণার ভিত্তি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের প্রশাসনিক কাঠামোয়, বিশেষ করে ভারত (British India) জুড়ে।

  • ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময় প্রথম “covenanted” ও “uncovenanted” সেকশন তৈরি হয়েছিল, উচ্চ পদে ইংরেজদের নিয়োগ, নিম্ন পদের জন্য স্থানীয়দের নিয়োগ।

  • পরবর্তীতে বিভিন্ন কমিশন ও রেকমেন্ডেশন রিপোর্ট (যেমন Aitchison Commission, Lee Commission ইত্যাদি) ব্রিটিশ ভারতে “Imperial Civil Service / Indian Civil Service (ICS)” ও “Provincial Civil Services” তৈরি করে, বিভাগভিত্তিক ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক সার্ভিস ও প্রাদেশিক সার্ভিসের বিভাজন ঘটে।

  • স্বাধীনতার পর, ব্রেকআপ হলেও এই ক্যাডার সেবাপদ্ধতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত “All India Services” এর আইন ১৯৫১-তে পাস করে IAS, IPS, পরে IFS ইত্যাদি তৈরি করে, যা কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়ের অধীনে কাজ করে।

  • বাংলাদেশেও, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান যুগের পর স্বাধীনতার পর এই ক্যাডার সিস্টেম উত্তরাধিকারসূত্রে গৃহীত হয়। “Bangladesh Civil Service (BCS)” নামে ক্যাডার তৈরি হয়েছে, বিভিন্ন সাধারণ ও পেশাদার ক্যাডার আলাদাভাবে নিয়োগ ও দায়িত্ব পায়।

 

 কাঠামোগত জড়তা ও পরিবর্তনবিরোধিতা

ক্যাডার সিস্টেমে কর্মকর্তা একবার যে সার্ভিসে প্রবেশ করেন, তিনি পুরো ক্যারিয়ার সেখানে আটকে যান।
এই কাঠামোতে—

  • নমনীয়তা কম: কেউ নতুন খাত বা মন্ত্রণালয়ে নিজের দক্ষতা প্রয়োগ করতে পারেন না।

  • উদ্ভাবনের সুযোগ সীমিত: সিনিয়রিটির ভিত্তিতে পদোন্নতি হয়, ফলে “আইডিয়া” নয়, “সময়” মূল্যবান হয়।

  • প্রযুক্তিগত দক্ষতার অবমূল্যায়ন: যে যত দক্ষ, যদি জুনিয়র হন, তবুও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পান না।

ফলে, একটি “hierarchical inertia” তৈরি হয় — যেখানে নতুন চিন্তা বা সংস্কার প্রতিবারই ধীরগতিতে এগোয়।
যেমন, বাংলাদেশ ও ভারতের আমলাতন্ত্রে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন বা ই-গভর্নেন্স বাস্তবায়নও বহু বছর দেরিতে হয়েছে এই কাঠামোগত জড়তার কারণে।

 আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার কৃত্রিম দেয়াল

ক্যাডারভিত্তিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে “permanent bureaucracy”-এর হাতে।
তারা প্রায়শই “policy ownership” নিজেরা ধরে রাখে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা নাগরিক সমাজকে অংশগ্রহণে আগ্রহী হতে দেয় না।

ফলাফল:

  • রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হলেও বাস্তবে “নীতির দিক” অপরিবর্তিত থাকে।

  • আমলারা “দায়মুক্ত” থাকে, কারণ তারা সরকার নয়, “ক্যাডার”-এর প্রতি দায়বদ্ধ।

  • প্রশাসন জনগণের চেয়ে নিজস্ব স্বার্থের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ে — একে বলে “bureaucratic insulation.”

এ কারণেই আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে “good governance” ধারণা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে।

 উন্নয়ন প্রশাসনে উদ্যমের অভাব

উন্নয়নমূলক নীতি বাস্তবায়নে প্রয়োজন—

  • উদ্যোগী মনোভাব,

  • প্রকল্প ব্যবস্থাপনা দক্ষতা,

  • বহুখাতীয় সমন্বয়,

  • নাগরিক সম্পৃক্ততা।

ক্যাডার সিস্টেমে এর কোনোটিই মূল মূল্যায়নের মানদণ্ড নয়।
ফলে কর্মকর্তারা প্রকল্পে “ফরম পূরণ” করতেই দক্ষ, বাস্তব ফল দিতে নয়।

উদাহরণ:
বাংলাদেশে বহু উন্নয়ন প্রকল্প দেরিতে শেষ হয়, ব্যয় দ্বিগুণ হয়, গুণগত মান কমে — কারণ সিদ্ধান্ত নেয় একই ধরণের প্রশাসনিক মনোভাবের কর্মকর্তারা, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ বা বিশেষজ্ঞদের জায়গা দেয় না।

 আন্তঃক্যাডার বিভাজন ও ‘বাবু’ সংস্কৃতি

যেসব দেশে একাধিক ক্যাডার আছে (যেমন বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান), সেখানে তৈরি হয়—
“ক্যাডার-প্রাধান্যবাদ” (cadre elitism)

  • এক ক্যাডার (সাধারণত প্রশাসন) অন্য সব ক্যাডারকে নিচু মনে করে।

  • ফলে সমন্বয় কমে, সংঘাত বাড়ে।

  • উন্নয়ন প্রশাসন হয়ে যায় “office politics”-এর শিকার।

ভারতীয় প্রশাসনে IAS বনাম IPS বনাম IRS প্রতিযোগিতা,
বাংলাদেশে প্রশাসন বনাম শিক্ষা/স্বাস্থ্য/প্রকৌশল ক্যাডার দ্বন্দ্ব — এই সবই উন্নয়নকে ধীর করে দেয়।

 সময় ও প্রণোদনার বিপর্যয়

ক্যাডার সিস্টেমে প্রণোদনা থাকে চাকরির স্থায়িত্বে, পারফরম্যান্সে নয়।

দিক বাস্তবতা
পদোন্নতি সিনিয়রিটি অনুযায়ী
দায়িত্ব রোটেশনাল, স্থায়ী দক্ষতা নয়
জবাবদিহিতা দুর্বল
প্রণোদনা বেতন ও পদ, পারফরম্যান্স নয়

ফলে কর্মকর্তা এমনভাবে মানিয়ে নেন যেন কাজ না করেও পদোন্নতি পাওয়া যায়।
এতে প্রশাসন “risk-averse”, “innovation-shy”, ও “status quo-oriented” হয়ে পড়ে।

গণতন্ত্র ও প্রশাসনের মধ্যে দূরত্ব

ক্যাডারভিত্তিক প্রশাসন জনগণের নয়, “রাষ্ট্রযন্ত্র”-এর কাছে দায়বদ্ধ।
এতে জনগণ ও সরকারের মধ্যে একটি দৃশ্যমান ফাঁক তৈরি হয় —
যেখানে নাগরিক সেবা “service” নয়, “favor” হয়ে দাঁড়ায়।

ফলাফল:

  • জনগণের আস্থা কমে,

  • রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে,

  • নীতিনির্ধারণে “জনঅংশগ্রহণ” বাস্তবে অনুপস্থিত থাকে।

 উন্নয়নের ওপর সরাসরি প্রভাব

ক্ষেত্র কীভাবে বাধা সৃষ্টি করে
অর্থনীতি ব্যবসায়িক অনুমোদন ধীরগতি, “Ease of Doing Business” র‍্যাঙ্কিংয়ে নিম্ন স্কোর
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ ধীর, ক্ষেত্রভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের প্রভাব কম
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নতুন নীতির অনুমোদন ধীর, প্রণোদনা সীমিত
স্থানীয় সরকার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, বিকেন্দ্রীকরণ ব্যাহত
দুর্নীতি আমলাতান্ত্রিক প্রভাব ও দায়মুক্তি দুর্নীতি বাড়ায়

কোন কোন দেশ এই জড়তা কাটিয়ে উঠেছে

  • ফ্রান্স: ২০২১ সালে ENA বাতিল করে নতুন merit-based training structure (INSP) চালু করে।

  • সিঙ্গাপুর: ক্যাডারভিত্তিক নয়, performance-based civil service। উচ্চ বেতন, উচ্চ জবাবদিহিতা, কঠোর মূল্যায়ন।

  • নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য: “open competition” ও “contract-based top positions” চালু করে।

  • দক্ষিণ কোরিয়া: আমলাদের প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতি পারফরম্যান্স ও প্রকল্পফল নির্ভর করেছে।

এসব দেশে প্রশাসন এখন উন্নয়নের চালিকা শক্তি — বাধা নয়।

এই ধরণের ব্যবস্থা দ্বারা প্রভাবিত হয়:

  • নিয়োগ প্রক্রিয়া (competitive exams, নির্বাচিত সার্বিকতা)

  • পেশাগত ক্যারিয়ার ট্র্যাক ও ক্যাডার বিভাজন (Administrative / General / Technical / Specialist / State vs Central)

  • স্থানান্তর, বদলির নীতিমালা

  • রাজনৈতিক প্রভাব ও নিরপেক্ষতা

 

 দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার ব্রিটিশ উত্তরাধিকারভুক্ত দেশগুলো

ধরন: Cadre-based career system

উদাহরণ: ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, ঘানা, শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া ইত্যাদি।
মূল বৈশিষ্ট্য:

  • চাকরিতে ঢোকা মানেই পুরো ক্যারিয়ার একটি নির্দিষ্ট সার্ভিসে কাটানো।

  • বদলি হয়, কিন্তু “সার্ভিস” (cadre) বদলায় না।

  • পদোন্নতি সাধারণত সিনিয়রিটির সঙ্গে জড়িত।

  • প্রশাসন অনেকটা “স্থায়ী সরকার” হিসেবে কাজ করে।

  • উদ্ভব ব্রিটিশ Indian Civil Service (ICS) থেকে।

ইউরোপ — বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানির ধরন

ধরন: Hybrid — partly cadre, partly position-based

ফ্রান্স:

  • একসময় ভারতের মতোই “École Nationale d’Administration (ENA)” থেকে “Corps”-ভিত্তিক প্রশাসন চালু ছিল।

  • প্রত্যেক কর্মকর্তা এক একটি “Corps”-এর সদস্য (যেমন Corps préfectoral, Corps diplomatique)।

  • তবে ২০২1 সালে ফ্রান্স ENA বাতিল করে এবং “Institut national du service public (INSP)” তৈরি করেছে — উদ্দেশ্য, বেশি merit-based ও flexible প্রশাসন গঠন করা।
    অর্থাৎ ফ্রান্স “ক্যাডার” ধারনা থেকে বের হয়ে পারফরম্যান্স ও খোলা নিয়োগে যাচ্ছে।

জার্মানি:

  • “Beamte” (civil servant) ধারণা আছে, কিন্তু তারা নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় বা অঞ্চলে কাজ করেন, একক জাতীয় ক্যাডারে আবদ্ধ নন।

  • পদভিত্তিক নিয়োগ — যোগ্যতা থাকলে অন্য জায়গায়ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে স্থানান্তর সম্ভব।

 যুক্তরাজ্য (ব্রিটিশ মডেল নিজেই)

ধরন: