কেমন সময় পার করছে ইরান

কেমন সময় পার করছে ইরান

কেমন সময় পার করছে ইরান?

ইরান বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতাগুলোর একটি। সাইরাস-দারিয়ুসের সাম্রাজ্য থেকে সাফাভি শিল্প, পাশার আধুনিকতা, খোমেনির ইসলামী বিপ্লব পেরিয়ে এখন ইরান এক জটিল সমাজ — যেখানে শিয়া ইসলাম, পারস্য জাতীয়তাবাদ, আধুনিকতা আর অর্থনৈতিক সংগ্রাম মিলেমিশে রয়েছে।

নেপথ্য কথা

ইরান এক প্রাচীন সভ্যতার দেশ। প্রায় ৬,০০০ বছর ধরে এখানে মানুষের বসবাসের প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু বিশ্বের ইতিহাসে ইরানের নাম ছড়িয়ে পড়ে পারস্য সাম্রাজ্য নামে। খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে, আচার্য্যারি জনগোষ্ঠী (Aryan tribes) পারস্যের (Fars) অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। এখান থেকে “Persia” নামের উদ্ভব। মূলত মদ, পার্থিয়ান, এবং পার্সিয়ান এই তিনে মিলেই গড়ে ওঠে ইরানের প্রাচীন বুনন।

খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ সালে, মহান শাসক Cyrus the Great (Cyrus II) প্রথম পারস্য সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। এটি পরিচিত আকেমেনিড সাম্রাজ্য (Achaemenid Empire) নামে।

এটি ইতিহাসের প্রথম মাল্টি-ন্যাশনাল, মাল্টি-কালচারাল সাম্রাজ্য, যা তৎকালীন বিশ্বের বিশাল অংশ – আধুনিক তুরস্ক, মেসোপটেমিয়া (ইরাক), মিশর, আফগানিস্তান, উত্তর-পশ্চিম ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। সাইরাস মানবাধিকারের প্রথম ঘোষণাপত্র Cyrus Cylinder জারি করেন, যা অনেকেই প্রথম মানবাধিকার দলিল বলে মনে করেন।

পরবর্তী শাসক দারিয়ুস ও জেরেক্সিস বিখ্যাত হয়ে ওঠেন গ্রীসের সাথে যুদ্ধের জন্য। এথেন্স ও স্পার্টার সাথে তাদের দ্বন্দ্বের কাহিনী এখনও গ্রিক ট্র্যাজেডির অংশ।

ইসলামের আগমন

৭ম শতকে আরব মুসলিম বাহিনী পারস্য দখল করে। তৎকালীন সাসানিড সাম্রাজ্য ভেঙে যায়, এবং পারস্য ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর থেকে পারস্য ইসলামী সভ্যতার একটি প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১১-১৩ শতকে তুর্কি সেলজুক এবং মঙ্গোলদের আক্রমণ পারস্যের চেহারা পাল্টে দেয়। মঙ্গোল নেতা হালাকু খান বাগদাদ দখল করেন এবং পারস্যে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।

১৫০১ সালে সাফাভি সাম্রাজ্য rise করে। শাহ ইসমাইল সাফাভি পারস্যে শিয়া ইসলামের আনুষ্ঠানিক প্রচলন করেন। পারস্য তখন থেকে শিয়া ইসলামের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, যা আজও ইরানের রাষ্ট্রধর্ম। সাফাভিরা শিল্প, স্থাপত্য ও পারস্য সাহিত্যে নতুন সুবাস আনে। ইসফাহান শহর হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম সুন্দর নগরী।

 উপনিবেশ ও আধুনিকতা

 কাযার রাজবংশ (Qajar) বলতে গেলে ১৮-১৯ শতকে কাযার রাজারা শাসন করেন। তখন ব্রিটেন ও রাশিয়া ইরানের তেল ও ভৌগলিক অবস্থানের কারণে দখল ও প্রভাব বাড়াতে থাকে। পারস্য ক্রমে “গ্রেট গেম”-এর অংশ হয়। পরে আসে  পাশা ও পহলভি (Pahlavi)। ১৯২৫ সালে রেজা শাহ পহলভি ক্ষমতা নেন। আধুনিক সেনাবাহিনী, রেল, স্কুল, নতুন শহর পরিকল্পনা করেন। পারস্যের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে “ইরান” রাখা হয় ১৯৩৫ সালে।

তার ছেলে মোহাম্মদ রেজা শাহ (শেষ শাহ) পশ্চিমের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখেন। তেল সম্পদ কাজে লাগিয়ে দ্রুত আধুনিকতা আনেন। কিন্তু ধন-সম্পদের অসাম্য ও পশ্চিমমুখী নীতিতে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

 ইসলামী বিপ্লব ও নতুন ইরান

১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ঘটে ইসলামী বিপ্লব (Iranian Revolution)। শাহ দেশ ছেড়ে পালান। ইরান হয় একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র, যেখানে আলী খোমেনির মতো ধর্মীয় নেতা দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হন। পরের বছর ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ইরান আক্রমণ করেন। শুরু হয় ভয়াবহ ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০-৮৮)। এতে উভয় দেশ লাখ লাখ মানুষ হারায়।

 আধুনিক ইরান: সংকট ও সম্ভাবনা

প্রথমে আসে পরমাণু কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞার কথা। ২০০০ থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করে। বহুবার পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে আলোচনা হয়, চুক্তি হয় আবার ভেঙেও যায়। এর কারণে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানকে বিপর্যস্ত করে।

অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও গণআন্দোলন এখন আলোচনার বিষয়। একদিকে বিশাল তেল-গ্যাস সম্পদ, উন্নত শহর, বিশ্ববিদ্যালয় ও একগুচ্ছ প্রতিভাবান যুব সমাজ — অন্যদিকে অর্থনৈতিক সঙ্কট, বেকারত্ব, রাজনৈতিক দমনপীড়ন। ফলে ইরানে বারবার গণআন্দোলন হয়, যেমন ২০০৯ সালে “গ্রিন মুভমেন্ট”, ২০১৯ সালে জ্বালানি আন্দোলন, ২০২২ সালে মাহসা আমিনি আন্দোলন।

প্রাথমিক তথ্য

ইরানের মোট জনসংখ্যা: প্রায় ৮৮.৬ মিলিয়ন (২০২৫ আনুমানিক)। আয়তন  বা ক্ষেত্রফল: প্রায় ১,৬৪৮,১৯৫ বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যার ঘনত্ব: প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ৫৪ জন। যেখানে  বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কিমিতে ~১,৩৬৫ জন বসবাস করে, তাই ইরান অনেকটাই বিস্তৃত ও কম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ।

রাজধানী ও সর্ববৃহৎ শহর তেহরান। এখানে জনসংখ্যা প্রায় ৯.২ মিলিয়ন (মেট্রো এলাকা ~১৫ মিলিয়ন)। এটা ইরানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। পাহাড়ঘেরা, আলবোর্জ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত এই শহরে এখানে ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, তেহরান মেট্রো ও বহু মিউজিয়াম, পার্ক, বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।

এর পরে রয়েছে মাশহাদ (Mashhad), ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, জনসংখ্যা প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন। উত্তর-পূর্ব ইরানে, তুর্কমেনিস্তানের কাছে। ইসলামি বিশ্বের অন্যতম বড় ধর্মীয় নগরী; ইমাম রেজার মাজার (shrine) এখানে অবস্থিত। প্রতিবছর প্রায় ৩০ মিলিয়ন ধর্মীয় পর্যটক আসে।

ইসফাহান (Isfahan) শহরে জনসংখ্যা প্রায় ২.৩ মিলিয়ন। ইরানের “হাফ দুনিয়া” (Half of the World) নামে খ্যাত এই শহর ঐতিহাসিক স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত ।  নকশে জাহান স্কোয়ার, শাহ মসজিদ, খাজু সেতু এই শহরে রয়েছে।  ঐতিহ্যবাহী কার্পেট, টাইলস ও মিনিয়েচার চিত্রকলার জন্য পরিচিত।

 কারাজ (Karaj) শহর তেহরান থেকে ~২০ কিমি দূরে, আলবোর্জ প্রদেশের রাজধানী। জনসংখ্যা প্রায় ২ মিলিয়ন। তেহরানের উপশহর হিসাবেই দ্রুত বড় হয়েছে।

শিরাজ (Shiraz) ইরানের আরেক প্রধান শহর যার জনসংখ্যা প্রায় ১.৯ মিলিয়ন। ফার্স প্রদেশের রাজধানী, পারস্য সভ্যতার প্রাচীন কেন্দ্র। কবি হাফিজ ও সাদীর শহর। নাসির আল-মুলক মসজিদ (রঙিন কাঁচের জন্য বিখ্যাত), পার্সেপোলিস (Persian Empire-এর প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ) এখানেই।

তাবরিজ (Tabriz) শহর উত্তর-পশ্চিম ইরানে, আজারবাইজান প্রদেশের রাজধানী। জনসংখ্যা প্রায় ১.৬ মিলিয়ন। ঐতিহাসিক বাজার, ব্লু মসজিদ, সাদ্রা কালচারাল কমপ্লেক্স বিখ্যাত। সিল্ক রোডের গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল তাবরিজ।

ইরানের প্রধান পর্যটন কেন্দ্রসমূহের পার্সেপোলিস যা প্রাচীন পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ, UNESCO World Heritage Site। রয়েছে ইমাম রেজার মাজার (মাশহাদ) যেখানে সবচেয়ে বেশী শিয়া পর্যটক আসে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে। নকশে জাহান স্কোয়ার রয়েছে ইসফাহান শহরে। পাসারগাদ (Cyrus the Great এর সমাধি) ইতিহাসপ্রেমীদের গন্তব্য। কিশ দ্বীপ (Kish Island): ফ্রি-ট্রেড জোন, উপসাগরীয় পর্যটন ও শপিং-এর জন্য বিখ্যাত। ইরানের মরুভূমি (Lut ও Kavir Desert)। রঙিন মসজিদ (শিরাজ) অন্যতম ভ্রমণ গন্তব্য। 

সংক্ষেপে টেবিল আকারে

শহর আনুমানিক জনসংখ্যা বিশেষ পরিচিতি
তেহরান ৯.২ মিলিয়ন রাজধানী, প্রশাসনিক কেন্দ্র
মাশহাদ ৩.৫ মিলিয়ন ধর্মীয় শহর, ইমাম রেজার মাজার
ইসফাহান ২.৩ মিলিয়ন ঐতিহাসিক স্থাপত্যের শহর
কারাজ ২ মিলিয়ন তেহরানের উপশহর
শিরাজ ১.৯ মিলিয়ন কবিদের শহর, পার্সেপোলিস
তাবরিজ ১.৬ মিলিয়ন সিল্ক রোড বাণিজ্য শহর

অর্থনৈতিক চিত্র

 ইরানের  জিডিপি (GDP): ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে ইরানের মোট জিডিপি ছিল প্রায় $401.4 বিলিয়ন, যা ৩.৫% বৃদ্ধি পেয়েছে ২০২৩ সালের তুলনায়প্রতি‑জনে আয় (GDP per capita): ২০২৪ সালে আনুমানিক $৪,৪৩০; যা ২০২৩-এর $৪,১১৫ থেকে বৃদ্ধি পেয়েছেতেল ও গ্যাস খাত ইরানের প্রধান উপার্জন: এটি বৈদেশিক মুদ্রা ও সরকারের রাজস্বের বড় উৎসখামার (agriculture) গুরুত্বপূর্ণ – মোট জিডিপিতে ~৯–১০%, শ্রমশক্তির ১৭% নিয়োজিত থাকে। শিল্প ও সেবা খাতেও বড় অবদান, কিন্তু যে সব খাত উল্লেখযোগ্য তা হলো তেল, পেট্রোকেমিক্যালস, খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ, ধাতুবিদ্যা, নির্মাণ উপকরণ সহ অন্যান্য

রপ্তানির হিসেবে  প্রায় $101.4 বিলিয়ন (২০১৭ সালের হিসেবে), প্রধান রপ্তানি পণ্য – পেট্রোকেমিক্যালস, ইথিলিন পলিমার, পেস্তা বাদাম, লোহার খনিজ ও কপার রপ্তানি প্রধানত চলে যাচ্ছে চীন (৪৮%), ভারত (১২%), সাউথ কোরিয়া (৮%) ইত্যাদি

আমদানির কথা বলতে গেলে  প্রায় $76.4 বিলিয়ন (২০১৭), প্রধান আমদানীর মধ্যে রয়েছে চাল, মটকাজি, সম্প্রচার সামগ্রী, সয়াবিন, গরুর মাংস ।  গতকালের হিসেব (২৭ জুন ২০২৫) অনুযায়ী ভারসাম্য ইতিবাচক (surplus), তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল।

যাতায়াত, যোগাযোগ ও বন্দর ব্যবস্থা

রাস্তা  প্রায় 173,000 কিমি রাস্তাঘাট, যার ৭৩% পাকারেললাইন 11,106 কিমি, যেটা বাড়তে থাকা ব্যস্ততা বহন করে; freight ও passenger‑এর মধ্যে ≈৩০ ও ≈২৯ মিলিয়ন টন/জন পরিষেবা ছড়ায়বড় রেললাইন: Tehran–Bandar-Abbas (সমুদ্রপথ); নতুন সম্প্রসারণ চলছে

প্রধান বন্দর: Bandar Abbas (পাশ্চাৎ হরমুজ প্রট); অন্যান্য: Bandar-e Anzali (Caspian), Bandar-e Torkeman, Khorramshahr, Bandar-e Emam Khomeyni. 

বিমান ও মহানগর পরিবহনের কথা যদি বলি তাহলে শতাধিক বিমানবন্দর; Iran Air ডোমেস্টিক ও আন্তর্জাতিক হিসাবে কাজ করেটেহরানে মেট্রো রয়েছে, প্রতিদিন ৩ মিলিয়ন+ যাত্রী সেবা পায়; আঞ্চলিক বাস সেবা খরচে সাশ্রয়ী শর্তে

টেলিযোগাযোগে প্রায় ৭ কোটি মোবাইল-ইন্টারনেট ব্যবহারকারী; মোবাইলে উন্নতি, তবে ফিক্সড ইন্টারনেট ধীরগতির আর টেলিকম খাত প্রায় পুরোপুরি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণে (TCI)

খাদ্য  কৃষি ও   প্রাণী‑খাদ্য

ইরান কৃষিপণ্য প্রায় ৯০% স্বয়ংসম্পূর্ণ বলেই World Bank ও FAO রিপোর্টে উল্লেখ করে। তবে, প্রয়োজনীয় খাদ্যের কিছু (চাল, গম ও ময়দা, মধু, ভুট্টা, বার্লি) এখনও আমদানির ওপর নির্ভরশীল; আনুমানিক ২০–৭০% পর্যন্ত বিভিন্ন খাদ্যে আমদানিতে নির্ভরতা আছেপ্রাণী‑খাদ্যে (পোল্ট্রি ও গবাদি) প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ: ৬৪৫টি ফিড মিল, যার ২১ টি আধুনিক, এবং আমদানিভিত্তিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছেখামার খাদ্যের ৭০% মূল্য নির্ধারণ করে খাদ্য; তবে ব্যাংক ঋণ ও কর চাপ চ্যালেঞ্জও রয়েছে

 শিক্ষা ও  স্ব