নতুন বাংলাদেশ তৈরীতে কেন সংস্কার প্রয়োজন?
বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ও উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সংস্কারের অভাব। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশের আইন, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত রয়ে গেছে দুর্বল ও অপ্রাসঙ্গিক। ফলে নাগরিকের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হওয়ার বদলে বারবার হতাশার সৃষ্টি হচ্ছে। নিচে বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলো—
১. ১৯৭২ সালের সংবিধানের দুর্বল ভিত্তি
বাংলাদেশের সংবিধান দেশটির মূল রাজনৈতিক দলগুলোর স্বপ্ন ও তৎকালীন বাস্তবতার প্রতিফলন হলেও, এতে মৌলিক ঘাটতি থেকে যায়। সংবিধানকে সময়োপযোগীভাবে সংস্কার করা হয়নি। ফলে সমাজ-অর্থনীতি বদলালেও সংবিধানের কাঠামো নাগরিকের প্রত্যাশা ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা মেলাতে পারছে না। মূল বিষয়টা হলো ব্রিটিশ আমলের আইনগুলো ব্যাপক ঘাটতি রাখা যাতে করে ব্রিটিশ আমলা ও বিচারকরা ইচ্ছেমতো রায় দিতে পারে এবং এজন্য তাদের কোনো জবাবদিহিতা না থাকে। আর সংবিধান আইনের সামঞ্জস্য রেখে তৈরী করা হয়েছে। এখানে গণমানুষের অধিকারের কথা নেই। ভাসা ভাষা ধারণার কারণে এটি কোনো কার্যকর কিছু হয়নি। তাই এই এর পরিবর্তন দরকার।
২. ব্রিটিশ আমলের পুরোনো আইন
বর্তমানে আমাদের অনেক আইন এখনো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের। উদাহরণস্বরূপ, ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC), দেওয়ানি কার্যবিধি (CPC), পুলিশ আইন—এসব পুরোনো আইনের ভিত্তিতে চলছে বিচার ও প্রশাসন। অথচ বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। ফলে আইন নাগরিক অধিকার রক্ষা করার বদলে জটিলতা তৈরি করছে।
প্রথমত আইনগুলো প্রচুর বয়স হয়েছে। এগুলো এখন আর উপযুক্ত নয়। দ্বিতীয়ত আইনগুলো এমনভাবে তৈরী করা যাতে সরকারী কর্মচারীদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এখান থেকেই বাংলাদেশের সকল অপরাধের মূল। পরের আইনগুলো আগের আইনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরী করা হয়েছে।
৩. অপরাধীকে রক্ষা ও নির্দোষকে ফাঁসানোর সুযোগ
আইন ও বিচারব্যবস্থা এমনভাবে গঠিত যে এখানে দক্ষ আইনজীবী ও ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর প্রভাবে অপরাধী মুক্তি পেতে পারে, আবার সাধারণ মানুষ সহজেই মিথ্যা মামলায় ফেঁসে যায়। এতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না, বরং অপরাধীরা উৎসাহিত হয়।
এটা বিগত দিনের আদালতের আচরণ দেখলে বুঝতে পারবেন। আজকের দিনেও পুলিশ যাকে খুশি ছেড়ে দিচ্ছে যাকে খুশি জেলে ভরছে। এজন্য না আছে কোনো জবাবদিহিতা না আছে শাস্তি। কোনো মনিটরিং সেল কিংবা তাদের থামানোর জন্য রাষ্ট্রের কাছে কোনো টুল নেই, হস্তক্ষেপ করা ছাড়া। আর রাষ্ট্র যখন হস্তক্ষেপ করে তখন রাষ্ট্রই হয়ে পড়ে ক্রীড়নক।
৪. ক্ষমতার একচ্ছত্রকরণ ও জবাবদিহির অভাব
রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ক্ষমতা একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত। কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যত অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না, জবাবদিহিতারও ব্যবস্থা নেই। এতে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নাগরিক আস্থা ভেঙে পড়ে।
একটি নির্বাচন হয়। সেখানে ৬৪ জেলার মধ্যে ৫০ জেলার প্রশাসক সরকারের হয়ে কাজ করে। নির্বাচন নামে প্রহসন হয়। তাতেই বোঝা যায় এই পদ্ধতি কতটা দূর্বল। এবং এজন্য তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করার নেই। তাহলে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই দেশ এভাবে চলবে নাকি এর থেকে উত্তরণ হবে।
৫. প্রশাসনে মেধার মূল্যায়নের অভাব
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে নয়, বরং রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং ঘুষের মাধ্যমে অগ্রগতি ঘটে। এতে মেধাবীরা হতাশ হয়ে পড়ে, রাষ্ট্র দক্ষতা হারায়।
প্রশাসনে পদোন্নতি বেতন কোনো কিছুই কর্মক্ষমতা, মেধা ও সততার ভিত্তিতে হয় না। একটা জাতি কতটা আত্মঘাতি হলে সে এ ধরনের সিস্টেম বহন করে। এখানে সব সিদ্ধান্ত হয় দালালী হয় দলীয় পরিচয়ের উপর। এই প্রশাসন সৎ থেকে কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এটাই কি স্বাভাবিকি নয়।
৬. অর্থনৈতিক দুর্নীতি ও অন্যায্য সুযোগ
সার্বিক ব্যবস্থায় এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে সৎ পথে ১০০ টাকা আয় করার চেয়ে দুর্নীতি করে ১ কোটি টাকা অর্জন করা সহজ। এতে সৎ মানুষ নিরুৎসাহিত হয়, অসৎরা প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট হয়, আর সাধারণ মানুষ দারিদ্র্যে ভোগে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন দেশে গিয়ে সততা ও পরিশ্রমের সাথে কাজ করছে। এর মানে দাঁড়ায় সমস্যাটা এদেশের মানুষের চরিত্রে নয়। সমস্যাটা হলো সিস্টেমে। যে সিস্টেমে শত শত কোটি টাকা লোপাট করা সহজ এবং তাদের কিছু হয় না। আর সারাদিন কেউ কেউ সৎভাবে ১শ টাকা কামাই করতে পারে না। সে সমাজে কেন দূর্নীতি সর্বত্র দখল করবে না। মানুষ কতদিন এসব দেখে দেখে ঠিক থাকবে। প্রতিটি মানুষেরেইতো দিনশেষে টাকা দরকার হয়। পরিবারের কথা চিন্তা করতে হয়।
৭. সরকার পরিবর্তনেও মৌলিক পরিবর্তনের অভাব
বাংলাদেশে বারবার রাজনৈতিক দল ও সরকার পাল্টালেও মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে। ফলে নীতি, শাসনব্যবস্থা বা নাগরিক কল্যাণে কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয় না। জনগণ শুধুই প্রতিশ্রুতির ভেলায় ভেসে যায়।
এটা পরীক্ষিত সত্য। বিগত ৫৪ বছরে ৩/৪টি দল মিলি ১২ বারের বেশী সরকার পরিবর্তন করেছে। দেশের উন্নয়ন ও ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি বরং দূর্নীদিত বেড়েছে বহুগুণ। সামাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। যা ডেকে আনতে পারে বড়ো কোনো বিপর্যয়।
৮. দুর্বল বিচারব্যবস্থা
দেশে বিচারব্যবস্থা কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল। মামলার জট, অদক্ষ বিচারক, রাজনৈতিক প্রভাব, ঘুষ—এসব কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। এতে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
মানুষ ভয়ে আদালত ও পুলিশে যেতে চায়না। অহরহ নিরীহ মানুষ হয়রানি হচ্ছে অপরাধীরা হেটে বেড়াচ্ছে। ছোট একটা কারণে মামলা করলে সেটা ৪০ বছর ধরে চলতে থাকে। মামলার কারণে কত মানুষ দরিদ্র হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। ১৬ লাখ মামলার জট বেধে আছে। বিনাবিচারে জেলখানায় পড়ে আছে লাখ লাখ মানুষ। এটা কি কোনো রাষ্ট্র নাকি দোযখ? কে এই প্রশ্নের জবাব দেবে।
৯. ব্যবসা–বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশের অভাব
বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং দেশীয় উদ্যোক্তারা এক নিরাপদ ও স্বচ্ছ ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ চান। কিন্তু দেশে আইন প্রয়োগ দুর্বল, দুর্নীতি প্রবল, প্রশাসনিক জটিলতা প্রচুর। তদুপরি, অর্থপাচারের অবারিত সুযোগ থাকায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।
বার বার বলা হয়। বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে। লোকজন হুন্ডি করছে। তরুনরা বিদেশে পালাতে চায়। বিদেশে টাকা না যাওয়ার জন্য বা বিদেশ থেকে টাকা আসার জন্য রাষ্ট্র কি কোনো কার্কর ব্যবস্থা নিয়েছে। একটা মানিলন্ডারিং আইন করেছে। সেটা ব্রিটিশ আিইনের ছায়া। সেখানে কতৃপক্ষ চাইলে কাউকে দোষী বানাতে পারবে। অথবা চাইলে কাউকে নির্দোষ বানাতে পারবে। আর এই কারণে মানি লন্ডারিং আইন হওয়ার পর দেশে সবচেয়ে বেশী মানি লন্ডারিং হয়েছে।
মূল বিষয়টা হলো ব্রিটিশ আমলের আইনগুলো বহাল রাখা। একটা জাতি কতটা স্ববিরোধী হলে সে এ ধরনের পুরনো এবং ভুল পদ্ধতিতে চলতে পারে এবং চালাতে পারে? “একটি জাতি কতটা আত্মভোলা হলে এমন অকার্যকর ব্যবস্থাকে যুগের পর যুগ বহন করতে পারে, সে প্রশ্ন এবং উত্তর দুটোই বের করতে হবে।
বাংলাদেশের মুক্তি, উন্নয়ন ও নাগরিক কল্যাণ নির্ভর করছে একটি সুশাসনভিত্তিক সংস্কার প্রক্রিয়ার ওপর। সংবিধান থেকে শুরু করে বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রে গভীর ও কার্যকর সংস্কার ছাড়া নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। “নতুন বাংলাদেশ মানে শুধু সরকার বদল নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র যেখানে আইন সবার জন্য সমান, মেধার মূল্যায়ন হয়, এবং নাগরিক আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।”
লেখা- জাহাঙ্গীর আলম শোভন, ছবি ইন্টারনেট

