নেপাাল, বাংলা, লংকা

কেন নেপালে তরুন প্রজন্ম সফল হলো আর বাংলাদেশে ব্যর্থ

বিদ্রোহের উত্তরসূরি হিসেবে বাংলাদেশ বনাম নেপাল

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা একটি রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৭ বছরের শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটায়। বিশ্বের নজর কাড়া এই অভ্যুত্থানের পর স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠেছিল- এই বিপ্লবী তরুণেরা কি নিজেরা রাজনৈতিক দল গঠন করে দেশের ক্ষমতায় আসবে? কিন্তু ২০২৬ সালের  জাতীয় নির্বাচনে সেই প্রত্যাশা পূর্ণ হয়নি। জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়া জেএনজির মতো সংগঠনগুলো ৩০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে মাত্র ৬টিতে জিতেছে (২০% সাফল্যের হার)।

নেপালে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির সরকারের বিরুদ্ধে জেএনজি (JNG)-র সেই তীব্র আন্দোলন এবং তার পরবর্তী অস্থিরতা নেপালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। সেই গণবিক্ষোভের মুখেই অলির পতন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের পথ প্রশস্ত হয়েছিল। বিশেষ করে তরুণদের সেই নতুন দল গঠন এবং নির্বাচনে তাদের অভাবনীয় জয় ছিল সেই বিদ্রোহেরই ফসল।

২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচন নেপালের ইতিহাসে একটি ‘রাজনৈতিক বিপ্লব’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই নির্বাচনে প্রথাগত বড় দলগুলোর (কংগ্রেস বা ইউএমএল) একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে দিয়ে তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দলগুলো অভাবনীয় সাফল্য পায়। শিক্ষিত এবং বিদেশে ফেরত তরুণদের নিয়ে গঠিত এই দলগুলো সুশাসন, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মন জয় করে নেয়।

  নেপাল: অ-ঔপনিবেশিক স্বাধীন কাঠামো

নেপাল কখনো সরাসরি ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল না। ১৮১৪-১৮১৬ সালের অ্যাংলো-নেপালি যুদ্ধের পর সুগৌলি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির শর্তগুলো ছিল: নেপালকে তার এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড (সিকিম, কুমায়ুন, গাড়োয়াল) ব্রিটিশদের দিতে হয়। কাঠমান্ডুতে একজন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট (প্রতিনিধি) নিযুক্ত হয়। নেপালের পররাষ্ট্রনীতিতে ব্রিটিশদের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, নেপালের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও আইন কাঠামো ব্রিটিশরা তৈরি করেনি। এখানে: হিন্দু রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও নিজস্ব আইন (মুলুকি আইন) বহাল ছিল। জনগণের অধিকার হরণ করে এমন কোনো ব্রিটিশ-শৈলীর পেনাল কোড আরোপ করা হয়নি। আমলাতন্ত্র রাজার কাছে জবাবদিহি থাকলেও তা ছিল নেপালি ধাঁচের, ব্রিটিশ ধাঁচের নয়।

 বাংলাদেশ: ঔপনিবেশিক আইনের অভিশাপ

বাংলাদেশের (তৎকালীন বঙ্গদেশ) মানুষের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে ওঠে ১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধের পরপরই। ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষে এক কোটি মানুষ মারা যায়। এই দুর্ভিক্ষ ব্রিটিশ শাসনের নৃশংসতা সম্পর্কে বাঙালিকে সচেতন করে তোলে।

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার সরাসরি ভারতীয় উপমহাদেশের শাসনভার গ্রহণ করে। তখন থেকে তারা একটি চিরস্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করে যার মূল লক্ষ্য ছিল: যত বিপ্লব বা বিদ্রোহ হোক না কেন, প্রকৃত ক্ষমতা যেন আমলাদের (ব্রিটিশ রাজের প্রতিনিধি) হাতে থাকে। আইন ও বিচার ব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো যাতে সরকারের বিরুদ্ধে যাওয়া কঠিন হয়। জনগণের কোনো জবাবদিহিতা যেন না থাকে।

১৮৬১ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় পেনাল কোড প্রণয়ন করা হয়। এটি ছিল একটি মাস্টারপিস দমনমূলক আইন। আজ অবধি বাংলাদেশের সকল আইন এই ১৮৬১ সালের কোডের সাথে সমন্বয় করে প্রণয়ন করা হয়। অর্থাৎ: সে যতই প্রাণ দিক না কেন, ঘুরে ফিরে একই কাঠামো। জনগণের অধিকার নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আমলাতন্ত্র ও পুলিশ বাহিনীকে অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ব্রিটিশ আমলের সেই পেনাল কোড ও প্রশাসনিক কাঠামো বহাল রাখা হয়। শুধু কিছু শব্দ ও নাম পরিবর্তন করা হয়। ফলে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র আজও: জবাবদিহিতার বাইরে অবস্থান করে। কোনো পরিবর্তন বা বিপ্লব এলে তা প্রতিহত করার জন্য সক্রিয় হয়। নির্বাচন বাহ্যিকভাবে স্বাধীন মনে হলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকে।

 কেন বাংলাদেশের তরুনরা ব্যর্থ হলো?

 জনগণের অগ্রাধিকার:

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বিগত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার এত ব্যাপক হারে খুন, গুম, হত্যা, হামলা, মিথ্যা মামলা ও লুটপাট চালিয়েছে যে, সাধারণ মানুষের প্রথম ও প্রধান চাওয়া ছিল এই দলটির ক্ষমতা থেকে মুক্তি পাওয়া। তারা সেই মুক্তি পেয়েছে। এর পরপরই নির্বাচন এলে পুরনো অন্যান্য দল (বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত) নিজেদের ভোট ব্যাংক তৈরি করে ফেলে। কারণ:

  • আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ ছিল, তা বিএনপির পক্ষে ভোট হিসেবে চলে যায়।

  • মানুষ নতুন দলকে ততটা চেনে না বা বিশ্বাস করে না।

  • পুরনো দলগুলোর নেতাকর্মীরা গ্রাস-মূল পর্যায়ে সক্রিয় থাকে।

নেপালের প্রেক্ষাপট: নেপালের মানুষ পুরনো সব রাজনৈতিক দল (নেপালি কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টির পুরনো ধারা) থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। তারা চেয়েছিল সম্পূর্ণ নতুন নেতৃত্ব। তাই মাওবাদীরা সেই নতুন নেতৃত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়।

 রাজনীতির ধরন:

বাংলাদেশে চর দখলের সংস্কৃতি: বাংলাদেশের রাজনীতি হলো মাঠ দখলের রাজনীতি। প্রতিটি দল ও সংগঠনের: পাড়া-মহল্লায় কমিটি থাকে। প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতা চলে। প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে শারীরিক সংঘাত, ভাঙচুর ও মামলা জড়ানোর সংস্কৃতি গভীরভাবে প্রোথিত।

এমন পরিস্থিতিতে একটি দলের পতন ঘটলেও বাকি দলগুলোর এই প্রভাব বলয় এত শক্তিশালী যে, নতুন কোনো রাজনৈতিক দল সহজে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। তাদের মাঠ দখলের মতো কর্মী, অর্থ বা পেশিশক্তি নেই।

নেপালের রাজনৈতিক সংস্কৃতি: নেপালে রাজনীতি জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থনের ভিত্তিতে গঠিত। সেখানে ‘চর দখল’ বা ‘মাঠ দখল’-এর সংস্কৃতি নেই। রাজনৈতিক দল ও নেতাদের জনগণের কাছে নিজেদের কর্মদক্ষতা ও আদর্শ দিয়ে প্রমাণ করতে হয়। ফলে নতুন দলের জন্য সেখানে সুযোগ বেশি।

 কৌশলগত ভুল:

বাংলাদেশের ভুল কৌশল: অভ্যুত্থানের পরপরই বাংলাদেশের বিপ্লবী তরুণেরা অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। তারা উপদেষ্টা পদ, কমিশন ইত্যাদিতে বসে। এর ফলে: তাদেরকে আর ‘বিপ্লবী’ না দেখিয়ে ‘শাসকশ্রেণির অংশ’ হিসেবে দেখা শুরু হয়। পতিত সরকারের পোষা মিডিয়া ও তাদের প্রতিপক্ষরা সারাক্ষণ তাদের বিতর্কিত করার চেষ্টা করে। নানা দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপারগতার অভিযোগ আনা হয়। প্রশাসনিক জটিলতায় জড়িয়ে তারা জনগণের কাছ থেকে দূরে সরে যায়।

নেপালের সফল কৌশল: নেপালের বিপ্লবী তরুণেরা অন্তর্বর্তী সরকারে যায়নি। তারা নির্বাচন পর্যন্ত মাঠে ছিল, জনগণের সাথে ছিল, সংগঠন শক্তিশালী করেছে। ফলে নির্বাচনের সময় তারা একটি পরিষ্কার ইমেজ নিয়ে হাজির হয়।

 নেতৃত্বে বিভক্তি ও ঐক্যের অভাব

বাংলাদেশে বিভক্তি: বাংলাদেশের তরুণ বিপ্লবীদের মধ্যে নানা বিভক্তি ছিল: কেউ কেউ পুরনো দলের (বিএনপি-জামায়াত) সাথে জোটে বিশ্বাসী। কেউ কেউ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র থাকতে চেয়েছিল। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কে দেবে, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। একজন শক্তিশালী, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নেতা গড়ে উঠতে পারেনি। ফলে ভোটাররা বিভ্রান্ত হয়।

নেপালের ঐক্য: নেপালে বিপ্লবীদের মধ্যে ঐক্য ছিল। তারা একটি সুস্পষ্ট নেতৃত্ব (প্রচণ্ড, বাবুরাম ভট্টরাই) পেয়েছিল। সবাই সেই নেতৃত্বকে মেনে নিয়েছিল। ফলে ভোটাররাও সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল।

  প্রতিভা অপচয় ও প্রতিষ্ঠাতাদের আঁকড়ে থাকা

বাংলাদেশের ঘটনা: বাংলাদেশের তরুণদের দলে শত শত গ্রহণযোগ্য ও ইমেজসম্পন্ন ব্যক্তি যোগ দিতে চেয়েছিলেন। এমনকি যারা পরামর্শ দিয়ে তাদের উন্নত স্তরে নিয়ে যেতে পারতেন, তারাও এসেছিলেন। কিন্তু দলের প্রতিষ্ঠাতারা তাদের ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। কারণ: তাদের ভয় ছিল, এসব যোগ্য লোক এসে দল ছিনিয়ে নেবে। অথবা তাদেরকে অপাংক্তেয় করে ফেলবে।

ফলে এসব যোগ্য ব্যক্তিদের জেলা কমিটিতে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, অথবা তাদের নিরুৎসাহিত করা হয়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পদগুলো প্রতিষ্ঠাতারা নিজেদের আঁকড়ে রাখেন। ফলাফল: দলটি ছোট ও দুর্বল থেকে যায়।

নেপালের পন্থা: নেপালে বিপ্লবী দলগুলো যে কাউকে সাদরে গ্রহণ করেছে, যদি তারা যোগ্য হয়। প্রতিভার মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে দল বড় হয়েছে ও শক্তিশালী হয়েছে।

 দলীয় কাঠামো:

পুরনো রোগের পুনরাবৃত্তি: সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: তরুণরা নতুন দল গঠন করলেও তাদের আদর্শ, উদ্দেশ্য ও উপস্থাপনা যত ইতিবাচকই হোক না কেন, তাদের দলীয় কাঠামো বাংলাদেশের অন্যান্য ও পুরনো দলগুলোর মতোই। এখানে: কমিটি ভোটের মাধ্যমে হয় না। বরং নেতাদের সিলেকশনের মাধ্যমে (উপর থেকে বসিয়ে দেওয়া) হয়। সাধারণ সদস্যদের কোনো মতামত থাকে না।

ফলে তরুণরা যেখানে আন্দোলনে সাড়া দিয়েছিল (কারণ সেখানে তারা নিজেদের মালিক ছিল), সেখানে ভোটের মাঠে সাড়া দেয়নি। কারণ ভোটের মাঠে তাদের আবার পুরনো সিলেকশনের রাজনীতি মোকাবিলা করতে হয়েছে।

 অর্থ ও পেশিশক্তির রাজনীতি

বাংলাদেশের বাস্তবতা: বাংলাদেশের রাজনীতি হলো পেশিশক্তি ও অর্থের রাজনীতি। কাগজে কলমে একজন এমপির নির্বাচনী খরচ ২৫ লাখ টাকা হলেও বাস্তবে: একটি আসনে শতকোটি টাকা খরচ হয়। প্রার্থীদের টাকার কুমির ও বুর্জোয়া ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা দরকার হয়। ভোটারদের প্রভাবিত করতে টাকা, জিনিসপত্র, ভোজ ইত্যাদি বিতরণ চলে।

এত টাকা ছোট বা তরুণ দলের পক্ষে খরচ করা সম্ভব নয়। ফলে তারা পিছিয়ে পড়ে। আর সেই টাকার মালিকরা বুর্জোয়া দলগুলোর পেছনে পয়সা ঢালে, এবং সেসব দলের এজেন্টরা মাঠে নানাভাবে সক্রিয় থাকে (ভোট কিনতে, ভোটারদের ভয় দেখাতে ইত্যাদি)।

নেপালে নির্বাচনী ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম। সেখানে প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, আদর্শ ও কাজের মূল্যায়ন হয়, টাকার বস্তা নয়। এগুলো মুল কারণ হলোও ভোটের মাঠে আছে আরো নানা গুঞ্জন।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান ছিল ঐতিহাসিক। এটি প্রমাণ করেছে যে জনগণ চাইলে স্বৈরাচারকে হারাতে পারে। কিন্তু স্বৈরাচার পতনের পর নির্মাণের কাজটি আরও কঠিন। নেপাল ও শ্রীলঙ্কার তরুণ বিপ্লবীরা সফল হয়েছে কারণ তারা ঐতিহাসিক, প্রশাসনিক ও কৌশলগত দিক থেকে সঠিক পথ বেছে নিয়েছিল। বাংলাদেশের তরুণ বিপ্লবীরা এখনো সময় পায়নি বললে ভুল হবে; বরং তারা ভুল পথ বেছে নিয়েছিল। তবে ইতিহাসের চাকা সবসময় এক দিকে ঘোরে না। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনে তারা যদি সংশোধিত কৌশল নিয়ে মাঠে নামে, তবে হয়তো একদিন তারা নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো সাফল্যও দেখতে পাবে।